kalerkantho


গরিবের টাকা খেয়ে হজম

♦ জামালপুরে ঘর বরাদ্দের কথা বলে ‘টাকা নেওয়া হয়’
♦ অভিযোগ অস্বীকার ইউপি সদস্যের
♦ এক বছরেও মেলেনি ঘর

জামালপুর প্রতিনিধি   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গরিবের টাকা খেয়ে হজম

হতদরিদ্র রাশেদা বেগম। তাঁর ভাঙাচোরা ঘর। একটি ঘর দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা। ছবি : কালের কণ্ঠ

জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীরচর ইউনিয়নের খাসপাড়া গ্রাম। অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দের ঘর এনে দেবেন বলে এই গ্রামের গরিব ৯টি পরিবারের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নিয়েছেন লক্ষ্মীরচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্য। কিন্তু এক বছরেও তারা ঘর পায়নি। টাকাও ফেরত পায়নি। তবে পাচ্ছে হুমকি। সম্প্রতি তারা টাকা ফিরে পেতে জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য বলছেন, তিনি টাকা নেননি।

অভিযোগে জানা গেছে, এক বছর আগে সরকারি বরাদ্দের ঘর এনে দেওয়ার কথা বলে খাসপাড়া গ্রামের দিনমজুর মিস্টার আলী, হাফিজুর রহমান, শাহীন মিয়া, শহিদুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন, আল আমিন, আব্দুল কদ্দুছ, কুতুব আলী ও আব্দুল জব্বারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন লক্ষ্মীরচর ইউপির স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মো. দুলাল উদ্দিন। তাঁরা ঘর না পেয়ে কষ্টের টাকা ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

দুর্গম খাসপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দরিদ্র রিকশাচালক মিস্টার আলীর স্ত্রী রাশেদা বেগম তিন শিশুসন্তান নিয়ে একটি ছোট চালাঘরে থাকেন। রাশেদা জানান, স্বামীর দৈনিক আয়ের টাকায় তাঁদের সংসার চলে। একদিন রোজগার হলে খান, না হলে উপোস থাকতে হয়। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি বলেন, ‘দুলাল মেম্বর ঘর দিবার কইয়া ঘর দেয় না। ঘরের আশায় ১০ হাজার টেকা দিছিলাম। এক বছর অয়া গেল গা। ঘরও দেয় না, টেকাও দেয় না। ঝড়ের মধ্যে পুনাই (শিশুসন্তান) নিয়া চহির (চৌকি) নিচে পলায়া আছিলাম। ঘর হুদ্দা বৃষ্টি পড়ে। আমগর টেকা ফিরত চাই।’

হতদরিদ্র কৃষি শ্রমিক হাফিজুর রহমান শোলার বেড়া আর টিনের চালাঘরে স্ত্রী রূপালী এবং দুই মেয়ে ও এক ছেলে (শিশু) নিয়ে থাকেন। বৃষ্টির পানি জমে ভেতরে পড়ে। শোলার বেড়া দিয়েও পানি যায় ভেতরে। হাফিজুর রহমান বলেন, ‘দুলাল মেম্বরে ঘর দিবার চাইছিল। এক বছর আগে তারে ১০ হাজার টেকাও দিছি। ভিটি পাক্কা কইরা ১৬ হাত ঘর, টেবুল (টিউবওয়েল), লেপটিন (ল্যাট্রিন) সবই দিবার চাইছিল। আইজ দেয় কাইল দেয়, ঘর আর দেয় না। আশা ছাইড়া দিছি। টেকা চাই। টেকা ফেরত দেয় না। হুমকি দেয়। কয়, যে তালিকা দিছি এহনও পাস অয়া আহে নাই। ঘর দিয়া পানি পড়ে। পানির মধ্যেই কষ্ট কইরা থাকতাছি।’

বাকিরাও কুঁড়েঘরে বা চালাঘরে বাস করেন। তাঁরা দিন আনেন দিন খান। ঘর তোলার সামর্থ্য নেই তাঁদের। সরকারি ঘর পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাঁরাও একই অভিযোগ করলেন। তাঁদের অনেকেই চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে ইউপি সদস্য দুলাল উদ্দিনকে উেকাচ দিয়েছেন। দুলাল টাকা নেওয়ার পর এক বছর হয়ে গেলেও ঘর দিচ্ছেন না। টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। উপরন্তু টাকা চাইতে গেলে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়।

লক্ষ্মীরচর ইউপি সদস্য অভিযুক্ত মো. দুলাল উদ্দিন বলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে আমাকে হয়রানি করার জন্য চক্রান্ত শুরু করেছে। আমি তাদের তালিকা করিনি। ঘর দেওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে একটি টাকাও নিইনি।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীরচর ইউপির চেয়ারম্যান মো. আফজাল হোসেন বিদ্যুৎ বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য হতদরিদ্রদের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। সকল ওয়ার্ড থেকে একটি তালিকা করে দিয়েছি। কিন্তু এক বছর হয়ে গেল, এখনো কোনো ঘর বরাদ্দ আসেনি। যারা অভিযোগ করেছে তাদের নাম তালিকায় আছে কি না তাদের কাছ থেকে ঘর দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। এটা তাদের এলাকার ব্যাপার।’

জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘরের কথা বলে টাকা নেওয়ার কোনো প্রমাণ থাকলে বিষয়টিকে আইনের আওতায় আনা যেত। এসব ব্যাপারে টাকা নিয়ে কেউ প্রমাণ রাখবে না। তবে এ রকম অনেকেই করে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই হয়েছে। আমি ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির খোঁজ নেব।’


মন্তব্য