kalerkantho


নেপালে বাংলাদেশের বিমান ট্র্যাজেডি

এ্যানি জানেন না তাঁর স্বামী-সন্তান বেঁচে নেই

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কান্না থামছে না ফিরোজা বেগমের। একটু পর পর মূর্ছা যাচ্ছেন। সংজ্ঞা ফিরলেই বিলাপ করে ওঠেন, ‘আমার বুকের ধন আকাশে উড়ল আর আরাইয়া (হারিয়ে) গেল! কেউ রইল না আমার।’ এফ এইচ প্রিয়কের মা ফিরোজা বেগম।

গত সোমবার নেপালের কাঠমাণ্ডুতে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত হলে নিহত হয় প্রিয়ক ও তাঁর একমাত্র শিশুসন্তান তামাররা। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন তাঁর স্ত্রী আলমুন নাহার এ্যানি। প্রিয়কের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা গ্রামে। প্রিয়কের বাবা শরাফত আলী ২০১২ সালে মারা যান। তার আগের বছর বিয়ে করেছিলেন প্রিয়ক। তিনি ছিলেন কবি ও ফটোগ্রাফার।

স্বজনরা জানায়, জন্মের পর থেকে শিশু তামাররাকে সব সময় বুকে আগলে রাখতেন তার দাদি। প্রায় সময় রাতে তামাররাকে নিয়েই ঘুমাতেন। সব সময় চোখে চোখে রাখতেন শিশুটিকে। অনেক সময় শিশু সেজে তামাররার সঙ্গে খেলতেন ফিরোজা।

স্বজনরা আরো জানায়, গত বছর প্রিয়ক ও তাঁর মামাতো ভাই মেহেদি হাসান সপরিবারে নেপালে ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভ্রমণে যাওয়ার দুই দিন আগে মন খারাপ ছিল ফিরোজার। তা দেখে হেসে প্রিয়ক মাকে বলেছিলেন, ‘দুশ্চিন্তা করছো কেন? ছয় দিন পরই তো ফিরে আসব।’

প্রিয়কের ফুফাতো ভাই টি আই সানি জানান, দুর্ঘটনার আগের দিন তাঁর মামি শিশুটির সঙ্গে খেলছিলেন। ওই সময় বারবার বলছিলেন, ‘কাল তুমি আকাশে উড়বা।’ কিভাবে বিমান ওড়ে, তাও দেখাচ্ছিলেন শিশুটিকে। তা দেখে শিশু তামাররা খলখল করে হাসছিল।

সোমবার সকালে নাশতা সেরে তাঁর মামাতো ভাই, প্রিয়কের স্ত্রী, শিশুসন্তানসহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তার আগে তামাররাকে অব হোয়াইট টপস, জিন্স প্যান্ট ও গোলাপি জুতা পরিয়ে দেন তাঁর মামি। প্রাইভেট কারে ওঠার আগে তামাররা দাদিকে বারবার বলছিল, ‘টাটা-বাই বাই।’

গতকাল বিকেলে প্রিয়কের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, দোতলা বাড়ির সামনে অনেক মানুষের ভিড়। বাড়ির ভেতর থেকে থেমে থেমে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। থেমে থেমে বিলাপ করছেন ফিরোজা। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষজনও কাঁদছে।

প্রতিবেশীরা জানায়, শিশু তামাররাসহ প্রিয়কের পরিবারে চার সদস্য। সোমবার কাঠমাণ্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় প্রিয়ক ও তাঁর শিশুসন্তান মারা যায়। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান প্রিয়কের স্ত্রী এ্যানি। নেপালে এ্যানির চিকিত্সা চলছে। বাড়িতে প্রিয়কের মা একা। ফলে বারবারই ফিরোজা বিলাপ করছিলেন, ‘নেপাল আমার সব শেষ কইরা দিল।’

পরিবারের পক্ষ থেকে প্রিয়কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহাগ ইউএস-বাংলার একটি বিশেষ ফ্লাইটে গতকাল কাঠমাণ্ডু পৌঁছেছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি প্রিয়কের স্ত্রী এ্যানির সঙ্গে কথা বলেছেন। এ্যানি তাঁর স্বামী-সন্তানকে খুঁজছেন। কাঠমাণ্ডু থেকে সোহাগ কালের কণ্ঠকে জানান, কাঠমাণ্ডু মেডিক্যাল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিত্সা চলছে এ্যানির। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, এ্যানি শঙ্কামুক্ত। তবে এ্যানি এখনো জানেন না তাঁর স্বামী ও শিশুসন্তানটি বেঁচে নেই। প্রিয়ক ও তামাররার মরদেহ ওই হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মরদেহের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।

প্রিয়কের সঙ্গে একই বিমানে ভ্রমণে গিয়েছিল তাঁর মামাতো ভাই মেহেদি হাসান মাসুম দম্পতি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তারা।


মন্তব্য