kalerkantho


অখ্যাত গাঁয়ের বিখ্যাত মমিন

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



অখ্যাত গাঁয়ের বিখ্যাত মমিন

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বুড়িরচর গ্রামের সেই কাঠের মসজিদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) বিশ্বের ৩০টি বিখ্যাত মসজিদ নিয়ে ৪০০ পৃষ্ঠার বই প্রকাশ করেছে। সেখানে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বুড়িরচর গ্রামের একটি কাঠের মসজিদ রয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের মসজিদ। এর প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন।

অখ্যাত পাড়াগাঁয়ের এই মসজিদের সঙ্গে বিখ্যাত হয়েছেন মমিন উদ্দিন। তাঁর মৃত্যুর ৬৫ বছর পর তাঁর এক ছবিও পাওয়া গেছে। এই ছবি দেখে দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী শেখ আফজাল হোসেন নতুন ছবি এঁকেছেন।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেছে, মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের গ্রাম বুড়িরচর। মমিনের দাদা ইদির হাওলাদাররা ছিলেন তিন ভাই। ইদির, খিদির ও ইছাব হাওলাদার। এই তিন ভাই ঝালকাঠির সুগন্ধিয়া গ্রামে বাস করতেন। ঝালকাঠিতে তখন বালকীশাহ্ নামে ব্রিটিশবিরোধী এক যোদ্ধা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তিন ভাই ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। ইংরেজ সেনাদের সঙ্গে না পেরে দেশীয় যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ইদির, খিদির ও ইছাব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে ১৭৯২ সালে বুড়িরচর গ্রামে এসে স্থায়ী বসতি গড়েন। এই গ্রামে আসার পর তাঁরা ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী মো. শরীয়তুল্লাহর অনুসারী হন। তুষখালী কৃষক বিদ্রোহ (১৮৩০-১৮৭১) ও সিংখালীর কৃষক বিদ্রোহে (১৮৫৮) তাঁরা নেপথ্যের নায়ক ছিলেন। মমিনের বাবা ইব্রাহীম আকন হাজী শরীয়তুল্লাহর ছেলে মহসীন উদ্দিন দুদু মিয়ার সমর্থক ছিলেন। মঠবাড়িয়ার তুষখালী কৃষক বিদ্রোহের নেত্বত্ব দেন। বিদ্রোহ শেষের পর সৈয়দপুর পরগনা থেকে তুষখালী এস্টেট পৃথক করা হয়। বৃহত্তর মঠবাড়িয়া থানা থেকে ভাণ্ডারিয়াকে পৃথক করা হয় ১৮৭১ সালে। ইব্রাহীম ছিলেন মহসীন উদ্দিন দুদু মিয়ার গ্রামভিত্তিক গাঁও খলিফা। মমিন উদ্দিন ১৮৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

১৮৮২ সালে শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে তৎকালীন বাংলার গর্ভনর লর্ড রিপন মুসলমানদের মাদরাসা শিক্ষার সম্প্রসারণ করেন। তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন জেলায় জেলায় মক্তব ও মাদরাসা চালু করার অনুমতি দেন। এসব মাদরাসায় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলমান ছাত্রদের পড়ার সুযোগ হয়। ছয় বছর বয়সে মমিন উদ্দিনকে বাকেরগঞ্জের অধীনে কোনো এক মাদরাসায় ভর্তি করানো হয়। ছেলের সাত বছর বয়সে তাঁর বাবা ১৮৯০ সালে মারা যান। তাঁর কবর ও তাঁর বাবা ইদির হাওলাদারের কবর মসজিদ আঙিনায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ সময় মা আয়েশা বিবি ও নানা দেবিপুর গ্রামের শিকদারবাড়ির মো. মুনার শিকদার তাঁর লেখাপড়ার খরচ বহন করেন। ওই মাদরাসা থেকে মমিন উদ্দিন আরবি, ফারসি ও বাংলা ভাষা শেখেন। মমিন শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। তখনকার দিনে মাদরাসাগুলোতে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে পাস করা মৌলভিরা শিক্ষকতা করতেন। মমিন মঠবাড়িয়া উপজেলার দক্ষিণ মিঠাখালী গ্রামের মো. সোনামদ্দিন খানের মেয়ে গোলবানুকে বিয়ে করেন।

তিনি অতি অল্প বয়সে অনেক ভূসম্পত্তির মালিক হন। ১৯০৫-১০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিট্রিশ সরকারের কাছ থেকে পিরোজপুর জেলার সব নদীপথ (জলমহাল) নিরানব্বই বছরের জন্য ইজারা নেন। পরে লোকবলের অভাব ও জলদস্যুদের অত্যাচারে শুধু মঠবাড়িয়ার নদীপথ (পোনারদোন নদী) অধীনে রাখেন। জলকর হওয়ার পর থেকে তাঁর আয় বাড়তে থাকে। পোনা নদীতে তাঁর অধীনে প্রায় ২০০টি বাঁধাজাল পাতার স্থান ছিল (জেলেদের মাছ ধরার স্থান)। প্রতিটি বাঁধায় আয় হতো ২০০ টাকার মতো। একবার মঠবাড়িয়া ও ভাণ্ডারিয়া থানার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা মিলে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। জলকর প্রথা মমিন উদ্দিনের কাছ থেকে নেওয়ার জন্য। মমিন বরিশাল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই এন ব্লান্ডির সঙ্গে কথা বলেন (১৯২৮)। কৌশলে তা নিষ্পত্তি করেন। পাকিস্তান শাসনামলে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে জলমহাল ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করেন। মমিনের প্রিয় খাবার ছিল দুধ। দই ছিল তাঁর প্রতিদিনের খাবার। তিনি জমিদার ছিলেন না; কিন্তু ১৯৪৩ সালে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের হিন্দু জমিদার স্বর্ণ কুমার সাহার সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে পড়েন। জমিদারকে তিনি মামলায় হারিয়ে দেন। মমিন ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবার রমজানের শেষ শুক্রবার মারা যান। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মসজিদের পশ্চিম পাশে তাঁর লাশ কবর দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, ১৯১৩ সালে ২১ জন কারিগর মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন। সাত বছরে এটি তৈরি হয়। কাঠের কারুকার্য ও ক্যালিগ্রাফিখচিত এই মসজিদে কোনো লোহা বা তারকাঁটা ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয়রা জানায়, সামান্য বৃষ্টি হলে মসজিদটির মেঝেতে পানি পড়ে। ফলে মেঝেতে লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। এ কারণে ফ্লোরম্যাট, কার্পেট, পাটি ও জায়নামাজ বিছানো যাচ্ছে না। মসজিদের টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে নাজুক অবস্থা। টিনের কার্নিশ ছোট, যে কারণে মসজিদের মূল ভবনে রোদ-বৃষ্টিতে সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মমিন উদ্দিনের নাতি আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে মসজিদটি দেখভাল করেন। তিনি বলেন, ‘সিডর-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ সাতজন কাঠমিস্ত্রি সংস্কার করেন। এ সময় মসজিদে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা পুরনো মসজিদের কারুকার্যের সঙ্গে মিল নেই। সংস্কারের কাঠ ঘুণে ধরেছে। সংস্কারের নামে লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয়েছে।’

ধানিসাফা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন তালুকদার বলেন, ‘মমিন মসজিদ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি সুরক্ষার জন্য সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নির্মাতা মমিন উদ্দিনের ছবি জাতীয় জাদুঘরে সুরক্ষার দাবি জানাই।’

 


মন্তব্য