kalerkantho


ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

বন্ধ স্মৃতিকেন্দ্রের দরজা!

মেহেরপুর প্রতিনিধি   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বন্ধ স্মৃতিকেন্দ্রের দরজা!

শেখ হাসিনা মঞ্চসহ মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। ছবি : কালের কণ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা (বর্তমান মুজিবনগর)। এখানে ৮০ একর জমিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। আরো ২৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রতিবছর প্রথম সরকারের শপথগ্রহণের দিন ১৭ এপ্রিল ঘিরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচে স্মৃতিকেন্দ্রের সংস্কারকাজ করা হয়। অথচ সমন্বয়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নির্মিত অনেক স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু স্থাপনায় ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী ও জেলা প্রশাসন।

মুক্তিযুদ্ধে সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্রসহ বেশ কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০১১ সালে শেষ হলেও উদ্বোধন করা হয়নি। মানচিত্রে পুরো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন চিত্র ফুটে উঠলেও মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার চিত্র স্থান পায়নি। মানচিত্রের বাইরে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যসহ অন্য ভাস্কর্যগুলো অতি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি এবং মূল নকশা অনুযায়ী না হওয়ায় সেগুলো ভেঙে নতুন করে তৈরির জন্য তিন কোটি টাকার প্রকল্প পাস করা হয়েছে। এদিকে মানচিত্রসহ শেষ হওয়া বেশ কিছু স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে কাজ শেষ করে বিল তুলে নিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মানচিত্র প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ভাস্কর্যগুলোকে মেরামতসহ পালিশ করা হয়েছে। মানচিত্রের বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ভাস্কর্যে এক পাকিস্তানি সেনার ডান হাতে মশাল থাকলেও সেটি ভেঙে পড়েছে। মেহেরপুরের স্থানীয় ১২ জন আনসার সদস্য বাংলাদেশের প্রথম সরকারের নেতাদের গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন। কিন্তু আটজন আনসার সদস্য দেখিয়ে ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় ১১ সেক্টর কমান্ডারের গোপন বৈঠক, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যগুলো বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রেস ক্লাব ও শহীদ মিনারে হামলার চিত্র যে কক্ষে তৈরি করা হয়েছে তার সবগুলো দেয়ালে ফাটল ধরেছে। কমপ্লেক্স ছাড়াও ঐতিহাসিক আমবাগানের অনেকগুলো গাছ পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে।

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে কাজ শুরু করে মাঝে প্রকল্প কাটাছাঁট করা হয়। ফলে কাজটি শেষ হয় ২০১১ সালে। অতি নিম্নমানের কাজ হওয়ায় ভাস্কর্যগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। প্রকল্পের অন্যান্য কাজ এখনো অসমাপ্ত। মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোকতার হোসেন দেওয়ান জানান, এবার ১৭ এপ্রিল ঘিরে ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাস্কর্যসহ মানচিত্র, স্মৃতিসৌধসহ বেশির ভাগ স্থাপনা মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্ট্রিট লাইট, মানচিত্রে লাইটসহ সংস্কার করা হয়েছে।

অরক্ষিত কেন্দ্র : মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাসহ প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ এখনো তাঁদের পদায়ন করা হয়নি। লোকবলের অভাবে স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর ঠিকমতো বাতি জ্বলে না।

স্মৃতিকেন্দ্রে যা আছে : ১১টি মন্ত্রণালয়ের টাকা বরাদ্দে গড়ে উঠেছে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। এর মধ্যে পর্যটক মোটেল, শপিং মল, শিশু পরিবার, ডাকঘর, হেলিপ্যাড, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ছয় দফাভিত্তিক গোলাপ বাগান, মসজিদ, বাংলাদেশের মানচিত্র, জাদুঘর ও মিলনায়তন। প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপের কাজ শেষ হলেও স্থাপনা উদ্বোধন করা হয়নি। তবে এখনো প্রশাসনিক প্লাজা, সংযোগ সড়ক, বিদ্যুৎ, জেনারেটর ক্রয় (১০০ কেভিএ), মানচিত্রে স্টেজে কাঠের কাজ, সিঁড়িতে এসএস রেলিং, জলছাদ র্যাম্প ও এসপিএমসিবি পাওয়ার সকেট, আন্ডারগ্রাউন্ড সার্ভিস লাইনের কাজ শেষ হয়নি। নতুন ২৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে পরিচালকের কার্যালয়, কর্মকর্তাদের বাসভবন, পার্কিং, লেক ও শিশু পার্ক তৈরির প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

যেভাবে ১৭ এপ্রিল : ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল এক ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়, যা মুক্তাঞ্চল মুজিবনগর থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিথিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৭ এপ্রিল সরকার শপথ নেয় বৈদ্যনাথতলার (মুজিবনগর) আমবাগানে। পরে মুজিবনগরকে অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি স্বাধীনতার ফরমান জারি করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল।

মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুস সালাম বাঁধন বলেন, ‘শুধু মুজিবনগর দিবসে নয়, আমরা কমপ্লেক্সটি বছরের সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দাবি জানিয়েছি। এ ছাড়া ১৭ এপ্রিলকে জাতীয় শপথ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানাব আমরা।’

মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, ‘স্মৃতিকেন্দ্রের বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। মাঝেমধ্যেই মন্ত্রণালয়কে কাজ শেষ করার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়। এবারও মন্ত্রীদের বিষয়টি জানানো হবে। এই কমপ্লেক্সে যে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাঁদের পদায়ন করলে স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে সুবিধা হতো।’

মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘১৯৯৮ সালে এই প্রকল্পের নকশা তৈরি ও অনুমোদন হয়। পরে জোট সরকার নকশা কাটছাঁট করে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস বাদ দেয়। যেগুলো বাদ পড়েছে সেগুলো সংযোজন করা হবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে গণপূর্ত বিভাগ স্কেচ তৈরি করছে। আমরা বারবার মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দিচ্ছি কাজটি শেষ করতে।’ তিনি বলেন, মুজিবনগর দিবস ‘খ’ শ্রেণির দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। মেহেরপুরবাসীর পক্ষ থেকে দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত করার দাবি জানানো হবে।

 



মন্তব্য