kalerkantho


শিবপুর

এতিমদের আড়াই কোটি টাকা হজম

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



এতিমদের আড়াই কোটি টাকা হজম

আবদুল জলিল

নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুমরাদী দারুল উলুম সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা ও কুমরাদী দারুল উলুম এতিমখানা। এই মাদরাসার অধ্যক্ষ আবদুল জলিল এতিমখানার ওয়াক্ফ সম্পত্তি ভোগ দখল করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠাতার মেয়ে সম্প্রতি শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির লোকজন জানায়, দুস্থ ও এতিম শিশুদের বাংলা, ইংরেজি, আরবি, কোরআন ও কারিগরি শিক্ষা দিতে স্থানীয় আবদুল আজিজ ১৯২৭ সালে কুমরাদী দারুল উলুম সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা ও ১৯৩৩ সালে কুমরাদী দারুল উলুম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এলাকা ও এলাকার বাইরের বিভিন্ন লোকজন এতিমখানার নামে দুই হাজার ৭৮৯ শতাংশ (৮০ বিঘা) জমি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে দেন। এতিমখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল আজিজ অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে ব্যারিস্টার আবু তাহের ও ইসমাইল হোসেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পরিচালনা করেন। এই সময় মাদরাসা ও এতিমখানায় প্রায় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ছিল। পরবর্তী সময় ব্যারিস্টার আবু তাহের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ও ইসমাইল হোসেন ঢাকায় স্থায়ী বসবাস করেন। এ সুযোগে কুমরাদীর মো. নজরুল ইসলাম, মো. মাইনউদ্দিন মৃধা, বাজনাবর আবদুল জলিল (১৯৯৩ সালে অধ্যক্ষ), মুনসেফেরচরের মনির হোসেন অন্যায় ও বেআইনিভাবে মাদরাসা ও এতিমখানার দায়িত্ব নেন। এর পর থেকে এ পর্যন্ত এতিমখানার সম্পত্তির ওপর নির্মিত বিভিন্ন দোকান ও স্থাপনার ভাড়া, এতিমদের কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, গাছপালা, পুকুর এবং বেসরকারি হিসাব মতে প্রায় দুই কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজের মেয়ে মোছলেমা খাতুন অভিযোগ করেন, হাজারো এতিমের এই প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এতিমের সংখ্যা ৪৪ জনে নেমে এসেছে।

তাঁর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পান। এদিকে অভিযোগে ক্ষিপ্ত হয়ে অধ্যক্ষ আবদুল জলিল এতিম ছাত্রদের বের করে দেন বলে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ছাত্রীসংখ্যা ১৭ থাকলেও কোনো ছাত্র নেই বললেই চলে। এ ঘটনায় এক অফিস আদেশের মাধ্যমে শিবপুর ইউএনও শীলু রায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আহ্বায়ক ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তাকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। রহস্যজনক কারণে প্রায় দুই মাস হলেও তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি ওই এলাকায় প্রবহমান পাহাড়িকাকে মডেল নদীতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নিয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর তীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা বাঁধ ও ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে। পাউবোর তত্ত্বাবধানে মারকো মনির জেবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সম্প্রতি কুমরাদী দারুল উলুম মাদরাসার অধ্যক্ষ আবদুল জলিল স্থানীয়দের নিয়ে এই কাজে বাধা দেন। এ ঘটনায় পাউবো শিবপুর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

মারকো মনির জেবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মনির উজ্জামান বলেন, ‘আবদুল জলিল বলেন, আমরা নাকি এই কাজ করে কোটি কোটি টাকা কামাইতেছি। এখন উনাদের চাহিদা পূরণ না করা পর্যন্ত কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। বিষয়টি আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। উনারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’

নরসিংদী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখার স্বার্থে আমরা অভিযোগ করেছি। এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।’

মাদরাসার অধ্যক্ষ আবদুল জলিল বলেন, ‘অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য।’

শিবপুর ইউএনও শীলু রায় বলেন, ‘তদন্ত কমিটি দুই পক্ষকেই ডেকেছিল। কোনো পক্ষই আসেনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


মন্তব্য