kalerkantho


৩২ লাখ টাকার কাজ পেল পিআইওর মায়ের প্রতিষ্ঠান!

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



৩২ লাখ টাকার কাজ পেল পিআইওর মায়ের প্রতিষ্ঠান!

জিএম ওয়ালিউল ইসলাম। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে একজন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে একই সঙ্গে দায়িত্বে রয়েছেন বরগুনার পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলার। সম্প্রতি তাঁর দপ্তরে জমা দেওয়া শতাধিক ঠিকাদারের দরপত্র তিনি ঠুনকো অভিযোগে বাতিল করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তাঁর মায়ের নামে দাখিল করা দরপত্রটি তিনি রেখে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এই দরপত্রটি লটারিতে হয়েছে প্রথম বিজয়ী। জিতে নিয়েছে ৩২ লাখ টাকার একটি কাজ!

২০১৭ সালে পিআইও জিএম ওয়ালী উল্লাহ বরগুনা সদর উপজেলায় দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি জেলা প্রশাসক মো. মোখলেছুর রহমান ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আব্বাস হোসেনের স্বাক্ষর জাল করে বিভিন্ন গ্রামের সড়ক উন্নয়নের ভুয়া প্রকল্প বানিয়ে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ২৫০ টন চালের বরাদ্দ চেয়ে একটি ডিউ লেটার পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওয়ালিউল সরকারি ক্রয় নীতিমালাকে (পিপিআর) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শত শত ঠিকাদারকে বোকা বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকৌশলে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছেন বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ। গত মঙ্গলবার বিকেলে বরগুনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়ালিউলের এসব অভিযোগের তথ্য তুলে ধরেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। তাঁরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বরগুনার জেলা প্রশাসকসহ দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ‘গ্রামীণ রাস্তায় কমবেশি ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু/কালভার্ট নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলায় প্রায় এক কোটি টাকার তিনটি সেতু নির্মাণের জন্য গত ২৪ মে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব কাজের অনুকূলে বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলার দুই শতাধিক ঠিকাদার দরপত্র জমা দেন। ৯ জুলাই পৃথক তিনটি কাজের অনুকূলে দাখিলকৃত সব দরপত্রের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে তিনজন বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। বিজয়ী তিনজনের মধ্যে ‘মোসাম্মত কহিনুর বেগম’ নামের একটি লাইসেন্স রয়েছে। এটি পিআইও ওয়ালিউলের মায়ের নামে। ‘মোসাম্মত কহিনুর বেগম’ নামের লাইসেন্সটির স্বত্বাধিকারীর নাম গাজী আ. বারেক। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালী সদরের কালিকাপুরে। ওয়ালিউলের বাড়িও একই এলাকায়।

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন, কোটি টাকার তিনটি কাজের মধ্যে একজন বিজয়ী ঠিকাদারের লাইসেন্স পিআইও ওয়ালিউলের মায়ের নামে, বাকি দুজনও তাঁর পছন্দের ঠিকাদার। ভুয়া নিয়ম-কানুন দেখিয়ে নানা কৌশলে শতাধিক ঠিকাদারের দরপত্র বাতিল করেন ওয়ালিউল। অথচ পিপিআর-২০০৮ ও ২০০৯ অনুযায়ী তাঁর পছন্দের ঠিকাদারদের কাগজপত্র ও ব্যাংক স্টেটমেন্টে ঘাটতি থাকলেও তা আমলে নেননি তিনি। বেতাগী পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওয়ালিউলের মায়ের নামে যে লাইসেন্সটি বিজয়ী হয়েছে, পিপিআর-২০০৮ ও ২০০৯ অনুযায়ী এর কাগজপত্রে নানা ঘাটতি রয়েছে। 

মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হোসেন বিধি অনুযায়ী আবার লটারির দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে তৌহিদ মোল্লা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি রাজিব হাওলাদার, রহমান এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি বিকাশ সাহা, পলি কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম মিঠুসহ আরো কিছু ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন।

জিএম ওয়ালিউল ইসলামের দাবি, ‘সকল নীতিমালা অনুসরণ করেই লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু ঠিকাদার ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিলেও ব্যাংক ব্যবস্থাপকের প্রত্যয়নপত্র দেননি। এটিসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের জমাকৃত ফরম বাতিল করা হয়েছে।’ বেতাগীতে নিজের মায়ের নামে কাজ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না।’

বরগুনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা স্বপন কুমার ব্রহ্ম বলেন, ‘ব্যাংক প্রত্যয়নপত্রের চেয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্টই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যাংক স্টেটমেন্ট থাকলে ব্যাংক প্রত্যয়নপত্রের অজুহাতে ফরম বাতিল হওয়ার কথা না।’

বরগুনার জেলা প্রশাসক ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে একটি ভুয়া ডিউ লেটার পাঠানোর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিচুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জেলা প্রশাসক মো. মোখলেছুর রহমান অবগত রয়েছেন। তবে কে বা কারা এটি করেছে, এখনো জানা যায়নি।’

 



মন্তব্য