kalerkantho


লাখাই

দেড় লাখ মানুষের দুজন চিকিৎসক

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বাসিন্দা দেড় লাখ। এসব মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দুটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র রয়েছে। এই সাত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক মাত্র দুজন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন বছর আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে মহসিনকে লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেন, কেন তাঁকে লাখাইয়ে পদায়ন করা হয়েছে? ফলে তাঁর বদলি স্থগিত হয়ে যায়। মামলা চলমান থাকায় তিনি এখনো শ্রীমঙ্গলে কর্মরত। আর লাখাই উপজেলায় মামলাজনিত কারণে পদ শূন্য। এখানকার সার্জারি কনসালট্যান্ট প্রদীপ কুমার দাশ ও গাইনি কনসালট্যান্ট আরশেদ আলী প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে। কনসালট্যান্ট মেডিসিনের বিপরীতে পদায়ন করা চিকিৎসা কর্মকর্তা অমিত কুমার রায় ২০১৩ সালের ১৯ মে থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অন্যদিকে মুড়িয়াউক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা রেজাউল ইকরাম শুভ্র ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তিনি সপরিবারে কানাডা থাকলেও তাঁর অফিসের কেউ জানে না। এ বিষয়ে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সুচিন্ত চৌধুরী বলেন, ‘এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

এ ছাড়া লাখাইয়ে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নেই। কর্মরত চিকিৎসা কর্মকর্তা এনামুল হক ও অপু কুমার সাহা। এর মধ্যে এনামুলক ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাসের বেশির ভাগ দিন বিভিন্ন সভা থাকায় তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়।

গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তা ইটের। এ কারণে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপনা থাকলেও সেগুলো নোংরা এবং অরক্ষিত। বহির্বিভাগ চলার সময় টিকিট ও ওষুধকক্ষ তালাবদ্ধ। চিকিৎসা সহকারী মিনহাজ উদ্দিন তাঁর কক্ষে বসা। তিনি জানান, সারা দিনে ১৯৬ জন রোগীকে তিনি সেবা দিয়েছেন। তবে কোনো চিকিৎসা কর্মকর্তা ছিলেন না।

জরুরি বিভাগে কয়েকজন রোগী এলে শিক্ষানবিশ করতে আসা ডিপ্লোমার শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার তাদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। দ্বিতীয় তলায় দুটি ওয়ার্ড। একটিতে পুরুষ এবং অন্যটি মহিলা ও শিশুদের। পুরুষ ওয়ার্ডে থাকা একমাত্র রোগী ধর্মপুর গ্রামের হোসেন আলী ডায়রিয়া আক্রান্ত। তিনি সেদিনই ভর্তি হয়েছেন।

মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি হন ভাদিকিরা গ্রামের শফি উদ্দিনের মেয়ে ফাহিমা। আর ওয়ার্ডে থাকা একমাত্র রোগী মানপুর গ্রামের মশ্বব আলীর স্ত্রী মিতাশ বেগম (৭০)। চার দিন চিকিৎসার পর তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাড়িতে যাওয়ার জন্য। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে তাঁকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।’ দুটি ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বশীল নার্স বা কাউকে পাওয়া যায়নি। মহিলা ওয়ার্ডে থাকা ভর্তি রেজিস্ট্রার থেকে দেখা যায়, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ৯ জন রোগী চিকিৎসা শেষে রিলিজ নিয়েছেন।

ডা. অপু কুমার জানান, এ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রেষণে অন্যত্র কাজ করেন। নার্সের চারটি পদ শূন্য। দুজন ডিপ্লোমা চিকিৎসকের জায়গায় আছেন একজন। চারটি ফার্মাসিস্টের সবকটি পদ শূন্য। ল্যাব টেকনিশিয়ান নেই। ওয়ার্ড বয়, আয়া এবং ঝাড়ুদারের তিনটি পদ শূন্য। রান্নার লোক নেই। এক্স-রে ১০ বছর ধরে বিকল। আলট্রাসনোগ্রাম ও ইজিসি বিকল।

সমস্যা সমাধানে লাখাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুশফিউল আলম আজাদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারের সুনজর কামনা করেন।

হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সুচিন্ত চৌধুরী জানান, ‘নতুন চিকিৎসক নিয়োগে পদায়ন হবে। আর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা পদ মামলার কারণে শূন্য। আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে পদায়ন করলে অবমাননা হবে।’

হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির বলেন, ‘লাখাই উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই হাসপাতালকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। নতুন ভবন ও অ্যাম্বুল্যান্স এনে দিয়েছি। এখন যে সংকট চলছে, তাও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’



মন্তব্য