kalerkantho

আমার প্রিয় লালন

১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি সামনে রেখে লালনের প্রিয় গান, শিল্পী এবং এ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন ওস্তাদ শফি মণ্ডল, চন্দনা মজুমদার ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আমার প্রিয় লালন

‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

লালনের গান তো অসংখ্য। এসব গানের তত্ত্ব এবং গভীরতা বুঝে উঠতেও কষ্ট হয়।

আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’। ছোটবেলা থেকেই শুনছি। তাঁর অন্য গানগুলোর তুলনায় এটি আমার কাছে কিছুটা সহজ মনে হয়। লালনের গান গাইতে গেলে সত্যি সত্যি অন্য রকম কণ্ঠ দরকার আছে। যে কণ্ঠ গাম্ভীর্যে ভরা এবং লালনকে ধারণ করার জন্য মানানসই। লালনের গানের ক্ষেত্রে অনেক নারী কণ্ঠকেও পুরুষের মতো করে গাইতে হয়। আর পুরুষকে গাইতে হয় আরো বেশি পুরুষালি ভাব নিয়ে। অর্থাত্ সেই রাগ এবং মেজাজ শিল্পীকে কণ্ঠে নিয়ে আসতে হয়। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে একজনের কথা বিশেষভাবে বলব, তিনি ফরিদা পারভীন। বলা যায় লালনকে তিনি হূদয়ে আঁকড়ে ধরে আছেন। লালনের গানের জন্য তিনি অনেক যুদ্ধ করেছেন। তাঁর কারণেই অনেকে লালনের গান সম্পর্কে জানতে পেরেছে, বুঝতে পেরেছে।

নতুনদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগে সালমার কণ্ঠ। তাঁকে আমার খুব পরিশুদ্ধ মনে হয়েছে। নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। শফি মণ্ডলের মতো একজন গুণী গুরুর কাছ থেকে এটা সে আয়ত্ত করেছে। আমার মতে, শুধু লালনের গানের চর্চা করলেও তার আরো বহু দূর যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। লালনের গানের সংগীতায়োজনে দেশীয় যন্ত্রই আমার পছন্দ। এর সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে অ্যাকুস্টিক গিটার, বেজ গিটার কিংবা কি-বোর্ডের ব্যাকআপ থাকতে পারে। কিন্তু যখন ইলেকট্রিক জিনিস চলে আসে তখন আর ভালো লাগে না। নিজের মতো করে গাওয়া, লালনকে ভেঙে ফেলা আমার পছন্দ নয়। একবার টেলিভিশনে দেখলাম ফরিদা পারভীন গিটার-ড্রামস নিয়ে লালনের গান গাইছেন। বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারিনি।  

লালনের গানের সুরের স্টাইলটা অনেকটা ভজন-কীর্তনের মতো। আমাদের দেশের যে পল্লীসংগীত তার মধ্যে কিন্তু লালন পড়ে না। ভজন-কীর্তন গাইতে যে সুরটা প্রয়োজন লালনের গানে তা আছে। ভজন-কীর্তনে আবার কলকাতার শিল্পীরা অনেক এগিয়ে। পূর্ণ দাস বাউল, পবন দাস বাউলরা কিন্তু ভজন-কীর্তনে ওপর সুর করে গান করেন। তাঁদের অন্য যে শিল্পীরা আছেন চর্চা করলে তাঁরা অনেক ভালো করবেন। তবে আমাদের দেশের শিল্পীরা লালনের গান অনেক বেশি ভালো করেন—এটা বলতেই হবে।

‘মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’

ওস্তাদ শফি মণ্ডল
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লালনের গান করছি। তাঁর এত এত গান আলাদাভাবে একটাকে নিরূপণ করা খুব কঠিন। রাসুলতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, গৌরতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, মানুষ তত্ত্ব—আরো কত তত্ত্বের গান তাঁর! এর মধ্যে মানুষতত্ত্বের গান আমাকে বেশি টানে। মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এই গানগুলোতে। একটির কথা যদি বিশেষভাবে বলতে হয় তাহলে বলব—‘মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থে আছে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই মানুষকে আমরা অনেক বড় করে ভাবতে পারছি না। বড় করে ভাবার সেই সাজেশন গানটির মাধ্যমে লালন ফকির দিয়ে গেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের মধ্যেই আল্লাহ বিরাজ করে। তাই মানুষকে ভালোবাসতে পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, তুমি ভালোবাসো কিন্তু কাউকে কাঁদিয়ে না। তুমি ভালো থাকো, কিন্তু আরেকজনের ক্ষতি করো না। লালনের গান যাঁরা করেন, অতীতে যাঁরা করেছেন, সবাইকে শ্রদ্ধা করি। সবার গানই ভালো লাগে। নিজে একজন শিল্পী হয়ে আলাদা করে কারো নাম বলাটা কঠিন। তার পরও শ্রোতা হিসেবে বলতে বললে শুরুতে বলব ফরিদা পারভীনের কথা। তাঁর গান আমার খুব ভালো লাগে। এরপর আছেন কিরণচন্দ্র রায়। দিলরুবা খান দুই-একটি করেছেন, সেগুলোও ভালো লেগেছে।  

লালনের গানের কোনো বাউন্ডারি নেই। নির্ধারিত কোনো সুর নেই। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর গানের মধ্যে একটু পাণ্ডিত্য থাকে, ক্লাসিক্যালের গন্ধটাও বেশি। তবে শেকড় এবং মাটির গন্ধ কম। আমাদের দেশের গানে শেকড়ের গন্ধ, মাটির গন্ধ বেশি। এটা থাকাটাও স্বাভাবিক। কারণ আমাদের বেড়ে ওঠা তাঁর আখড়া থেকেই।

‘আর কত দিন জানি’
চন্দনা মজুমদার

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই লালনের গান করছি। পরিবার থেকেই পরিবেশটা পেয়েছি। লালনের গানের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ‘আর কত দিন জানি’। এই গানটি জীবনে সবচেয়ে বেশি গেয়েছি। গানটি যখনই ধরি চোখের সামনে আমার গুরু খোদাবক্স সাঁইয়ের ছবিটি ভেসে ওঠে। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ শুনেই লালনের গানের প্রতি উত্সাহ পাই। এই প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে লালনের ভাব খুঁজে পাই রিংকুর মধ্যে। সেরাকণ্ঠ খ্যাত আশিকও ভালো গায়। নতুন মেয়েদের মধ্যে লালন ভালো গায় এমন কাউকে সেই অর্থে পাইনি, যারা গাইছে বেশির ভাগের গায়কিতেই আধুনিকতার ছোঁয়া চলে আসে। অর্থাত্ সত্যিকারের লালন অনুপস্থিত। তবে বিউটির গায়কিতে লালনকে কিছুটা খুঁজে পাই।

লালনের গানের একদম ভেতরের যে ব্যাপারটা, সেটা কলকাতার শিল্পীদের মধ্যে কম। তাদের ওখানে কথা, সুরেরও কিছুটা হেরফের ঘটে। তবে আমাদের দেখে দেখে তারাও এখন ভালোটা রপ্ত করছে। এটা লালনসংগীতের জন্য ইতিবাচকই বটে।


মন্তব্য