kalerkantho


‘সে কথা বলতে গেলে বুক ভেঙে যায়’

চলে গেলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক আনিসুল হক। বন্ধুকে স্মরণ করেছেন বিখ্যাত জাদুশিল্পী ও উপস্থাপক জুয়েল আইচ

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘সে কথা বলতে গেলে বুক ভেঙে যায়’

আনিসুল হকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথা মনে পড়ে না। তবে তাঁর সঙ্গে ঘটনা, গল্প-কাহিনি অসংখ্য। আমরা একসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছি, একসঙ্গেআনন্দমেলাকরতাম। শুনতে একটু অবাক লাগবে, আনন্দমেলা একসঙ্গে কী করে সম্ভব? আমি আনিসুল হকের আনন্দমেলায় পারফর্ম করেছি

উপস্থাপনা ছাড়াও আমি ম্যাজিক দেখাতাম। সেই সুবাদে টেলিভিশনের যাঁরা ভালো উপস্থাপক যেমন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ফজলে লোহানী, আনিসুল হক, আফজাল হোসেনসবাই তাঁদের প্রগ্রামে আমাকে ডাকতেন। আনন্দমেলাএকজন উপস্থাপনা  করলেও আমরা সবাই মিলে অনুষ্ঠানটা করতাম। সবচেয়ে বেশি চেষ্টা থাকত রোজার ঈদের আনন্দমেলা নিয়ে। যিনি পর্দার সামনে আসছেন তিনিই যে সব করছেন বিষয়টা তেমন থাকত না। যেমন ধরা গেল, এবার আমি আনন্দমেলা করছি। বাইরের দর্শক জানবে এটা আমার একার আনন্দমেলা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত নানা রকম আইডিয়া দিতেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবেদ খান, আনিসুল হক, আফজাল হোসেন। এখনকার সময়ের কোনো উপস্থাপকই এটা চাইবেন না। কিন্তু আমাদের সময়টা ছিল বিচিত্র। আনিসুল অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছে বলে অন্যরা তাকে সাহায্য করবে না, তা নয়। কাজটা ভালো করতে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এতে আমাদের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ঈদের আনন্দের সেমাই-পায়েস আমরা সবাইকে দিতে পারতাম না ঠিকই, কিন্তু বিনোদনের মিঠাই-মণ্ডা এই আনন্দমেলার মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দিতাম

আনিসুল হক সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করতে পছন্দ করত। প্রতিটি আইটেমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগে থেকে সাজিয়ে নিত। সেগুলো আমাকে খুব সাহায্য করেছে। তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় লন্ডনে যাওয়ার আগে। খুব আড্ডাবাজ ছিল। প্রায়ই বাসায় আসর বসাত। অন্যকে আপ্যায়ন করতে খুব পছন্দ করত। একটা সুন্দর বাড়ি বানাল বনানীতে। সেই বাড়ির বেজমেন্ট বানিয়েছে থিয়েটারের মতো করে। এটা হয়তো এখনকার অনেক পয়সাওয়ালা ভাবতেই পারবে না। জায়গাটা তারা ব্যবহার করে গাড়ি পার্কিংয়ে। কিন্তু আনিসুল হকের বাসার পুরো বেজমেন্ট একটা লিটারালি থিয়েটার। সেখানে স্টেজ আছে, আছে বসা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত। এই থিয়েটার কিন্তু টিকিট করে অনুষ্ঠান করার জন্য নয়। কত ভালো ভালো শিল্পীর গান-বাজনা শুনেছি সেখানে! অজয় চক্রবর্তীর খেয়াল গান আমি একদম কাছে বসে শুনেছি আনিসের বাড়িতে, আড্ডা দিতে দিতে। সে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিল্পী নিয়ে আসত। সে যে আমাদের শুধু ভালো ভালো খাবার খাওয়াত তা নয়, এভাবে বিনোদনেও ভরিয়ে দিত। এখানে একজন মানুষের কথা বলা দরকাররুবানা [রুবানা হক, আনিসুল হকের স্ত্রী] একটা সুন্দর ডায়মন্ডের যেমন অনেক তল থাকে রুবানা সে রকম অসাধারণ ডাইমেনশনে গড়া মানুষ। অসাধারণ অতিথিপরায়ণ। কেউ তাদের বাসায় গেলে মনে হয় সে যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছে। প্রতিটি আড্ডার আসর সে নতুনভাবে সাজায়। অসাধারণ মেধাবী একটা মেয়ে। কখনো লেখাপড়ায় দ্বিতীয় হয়নি। আনিসের বাসার নিচে হয়তো গান হচ্ছে, আবার ওপরে ড্রয়িংরুমে আড্ডার আসর, বাইরের লনে কিংবা সুইমিং পুলের পাশে আরেক দল গল্পে মেতেছে। যে যার মতো করে সময় পার করছে। এটা আমাদের কাছে স্বর্গের মতো মনে হতো। আনিসুল হক কত বড় একজন উপস্থাপক সেটা সবাই জানি। কিন্তু রুবানাও যে কত বড় উপস্থাপক সেটা অনেকেই জানে না। হচ্ছে টেবিল উপস্থাপক। আনিস যখন মেয়র নির্বাচিত হয় তখন রুবানা বলল, তুমি মানুষের সেবায় নেমেছ, তোমার কাজ তুমি করো। সব ব্যবসা আমি দেখব এবং সে সেটাই করেছে।  
আনিসের মতো স্বপ্নবাজ মানুষের দেখা আমি খুব কমই পেয়েছি। ওর সঙ্গে আমার সর্বশেষ স্মৃতিটা মনে করতে চাই না। আনিস কফিনের মধ্যে শুয়ে আছে। এত স্ট্রাগলের পরও আমি সেই আনিসকেই দেখতে পাচ্ছিলাম। গায়ের রংটা পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি, শুধু চোখটা বন্ধ, নাকের মধ্যে দু-টুকরো তুলো দেওয়া। আমার একেবারে বুক ভেঙে যায় দৃশ্যটার কথা বলতে। এই স্মৃতিটা বোধহয় আমি আর কখনো ভুলতে পারব না।  

অনুলিখন : আতিফ আতাউর


মন্তব্য