kalerkantho


পরিবেশবান্ধব মাছ ও সবজি চাষ

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পরিবেশবান্ধব মাছ ও সবজি চাষ

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বড়ডাঙ্গা গ্রামে পরিবেশবান্ধব মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী গ্রামবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ

এখন মাছ-সবজি মানেই বিষ। এসব খাবার শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ কারণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। অনেকেই এসব খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকছে। উৎপাদনকারীরাও এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। তারা বিষমুক্ত সবজি ও মাছ উৎপাদনের লড়াইয়ে নেমেছে। এমনই একটি লড়াইয়ের উদাহরণ হচ্ছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বড়ডাঙ্গা গ্রাম। এ গ্রামের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উৎপাদনকারী এখন বিষমুক্ত মাছ ও সবজি চাষ করছে। এতে তাদের আয় বেড়েছে, সুনামও হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের একটি গ্রাম বড়ডাঙ্গা। এই গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারের মাছ ও সবজির খামার আছে। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পুকুরের মতো খনন করে মাছ এবং স্থলভাগে সবজি চাষ করা হয়। বড়ডাঙ্গা গ্রামটিতে এখন এ ধরনের মাছ ও সবজি খামারের ছড়াছড়ি। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘ঘের’। এখানে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। কেউ-ই সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে না। উৎপাদন ভালো, তুলনামূলক দামও পাওয়া যায় বেশি। ইতিমধ্যে মাছ ও সবজি চাষের এই মডেলটি ‘বড়ডাঙ্গা মডেল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

জানা যায়, ২০১৩ সালে মাত্র ছয়জন কৃষক এই বিশেষ খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। প্রচলিত ঘেরগুলোর চেয়ে এগুলোর গভীরতা তিন ফুট বেশি। ঘেরে মাছ ছাড়ার আগে নার্সারিতে স্বাভাবিক পরিবেশে লালন-পালন করা, ভাইরাসমুক্ত পোনার ব্যবহার এবং সম্পূরক খাবার জোগান দেওয়া—এ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষকদের মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বছর শেষে উৎপাদন ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। বর্তমানে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে ২২৬ জন কৃষক।

বড়ডাঙ্গার এ খামারগুলোতে প্রধানত চিংড়ি উৎপাদন করা হয়। এ এলাকায় চিংড়ি সংগ্রহ কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে চাষিরা সরাসরি চিংড়ি বিক্রি করতে পারে। এই সংগ্রহ কেন্দ্র তৈরিতে ওয়ার্ল্ডফিশ ১০ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। মত্স্য বিভাগ উৎপাদনকারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে। একটি মত্স্যজীবী সমিতি গড়ে উঠেছে, যাদের সঞ্চয় বর্তমানে পাঁচ লাখ টাকা।

মত্স্য অধিদপ্তরের পরিবেশবান্ধব ও লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বড়ডাঙ্গা মডেলটি প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধির লড়াই। এখানে উৎপাদিত মাছ, চিংড়ি বা সবজিতে কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ বিষমুক্ত পরিবেশে নিরাপদ খাদ্য তৈরি হচ্ছে। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এফভিও অডিট টিম (খাবারের মান পরীক্ষাকারী দল) বাংলাদেশ সফরে এসে ডুমুরিয়া উপজেলা মত্স্য অফিস ও এখানকার চিংড়ি ঘের পরিদর্শন করে।

পুরুষের পাশাপাশি এখানকার নারীরাও চিংড়ি ও সবজির চাষ করে। সাহস গ্রামের নারী চিংড়িচাষি রীতা চৌধুরী বলেন, ‘আগে মনে করতাম, ভাত রান্না আর সন্তান লালন-পালন করাই আমাদের কাজ। বাইরের কাজ পুরুষের। কিন্তু প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা চিংড়ি চাষ করতে শিখেছি। আমরা সংসারে আর্থিক সাহায্য করতে পারছি। সংসারে আমাদের গুরুত্ব বেড়েছে। মত্স্য বিভাগ আমাদের নতুনভাবে পথচলা শিখিয়েছে। বর্তমানে এই গ্রামের ২৫ জন নারী চিংড়ি চাষ করছেন।’

রীতা চৌধুরী বাড়ির পাশে নিজেদের জমিতে আলাদা তিনটি মাছের খামার করেছেন। এর প্রতিটিতে খরচ বাদে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এ বছর এক বিঘা জমিতে সরকারের মত্স্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় কাঁকড়া চাষ করেছেন। সব খরচ বাদে ইতিমধ্যে আয় হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। আরো ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবেন। শুধু রীতা চৌধুরী নন, ডুমুরিয়া উপজেলায় পাঁচ শতাধিক নারী মত্স্যচাষি রয়েছেন, যাঁরা পুরুষের পাশাপাশি খামারে কাজ করেন।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা মত্স্য সম্পদে সমৃদ্ধ ও অপার সম্ভাবনাময় একটি জনপদ। উপজেলাবাসীর চাহিদার চেয়েও এখানে তিন গুণ বেশি মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। এ উপজেলার নদী, খাল ও বিলে প্রচুর দেশি প্রজাতির শিং, মাগুর, কই, টেংরা, টাকি, শোল ও পুঁটি পাওয়া যেত। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল। এই দেশীয় মাছকে রক্ষার জন্য পাঁচটি মত্স্য অভয়াশ্রম করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে অভয়াশ্রমগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করায় উল্লেখযোগ্য হারে মাছ উৎপাদন হয়েছে। এমনকি সংলগ্ন মরা নদীতে জাল ফেলে এখন টেংরা, পুঁটি, শিং, বেলেসহ নানা প্রজাতির মাছের দেখা মিলছে। মত্স্য অভয়াশ্রমগুলোর সুফল দেখে ব্যক্তি উদ্যোগে উপজেলার হাজিবুনিয়া নদীতে একটি মত্স্যজীবী সমবায় সমিতি গড়ে উঠেছে।

জানা যায়, গত এক বছরে ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস, টাউনঘোনা, গোলনা, বড়ডাঙ্গা, ভাণ্ডারপাড়া অঞ্চলের নারীদের দলগত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও উদ্বুদ্ধ করার ফলে প্রায় ৫০০ নারী সরাসরি মাছ চাষ করছেন। এর ফলে তাঁরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মত্স্য অফিসার সরোজ কুমার মিস্ত্রি জানান, উপজেলায় ২১ হাজার ৭০৮ হেক্টর (১ হেক্টর=২.৪৭ একর) জলাশয় রয়েছে। এসব জলাশয় মত্স্যসম্পদ উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। ডুমুরিয়া উপজেলার জনগোষ্ঠীর মাছের চাহিদা পাঁচ হাজার টন। ডুমুরিয়ায় গত অর্থবছরে (২০১৬-২০১৭) মাছ উৎপাদিত হয়েছে ১৫ হাজার ১৫৯ টন, যা চাহিদার তিন গুণ। সারা দেশে ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে গলদার চাষ হয়। এর মধ্যে ডুমুরিয়ায় চাষ হয় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর এ জমিতে গলদার উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার ১০৭ মেট্রিক টন, যা সারা দেশের উৎপাদনের ছয় ভাগের এক ভাগ। মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে গত বছর ডুমুরিয়ার ১২টি বৃহৎ জলাশয়ে এবং ১০৮টি পুকুরে ১১ টন মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। এ বছর আরো বেশি মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে।


মন্তব্য