kalerkantho


গরিবের মুখে হাসি ফোটায় যে অনুষ্ঠান

উজ্জ্বল বিশ্বাস, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গরিবের মুখে হাসি ফোটায় যে অনুষ্ঠান

বছরের শুরুতে বাঁশখালীর বাহারছড়া-রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গরিব শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার বিতরণ এবং গ্রামবাসীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

উপকূলীয় গ্রাম বাহারছড়া ও রত্নপুর। সমুদ্র উপকূল আর জলকদর খালের কারণে এক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা ছিল ওই দুটি গ্রাম। বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে চলত জীবন-জীবিকা। এখনো প্রায় ৭০ ভাগ এলাকার এ অবস্থা।

১৯৮৫ সালে এ দুরবস্থা দেখে গ্রামটিতে স্থানীয় দানবীর মো. মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাহারছড়া-রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয়’। জলকদর খালের পাড়ে প্রায় ১০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলে এখন ছাত্রছাত্রী আড়াই হাজার। স্কুলটি কুসংস্কারে ঢাকা ও অনগ্রসর পল্লীতে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে। এখনো প্রায়ই স্কুলছাত্রীকে কুসংস্কারের জালে আটকে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়েতে বসতে হয়। তবে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি জানতে পারলে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করে।

বছর ঘুরতেই বাহারছড়া ও রত্নপুর গ্রামের গরিব-দুস্থ মানুষের মুখে একটি অনুষ্ঠান ঘিরে হাসি ফিরে আসে। গত ছয় বছর ধরে চলে আসছে এ আনন্দ উৎসব। এ হাসি আর আনন্দের আয়োজন হয় বাহারছড়া-রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে স্কুলের আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গরিবদের বাছাই করে ৩০০ জনকে স্কুলব্যাগ, শৌচাগারের রিং, খুঁটি ও টিন দেওয়া হয়। এছাড়া এলাকার সাত শতাধিক গরিব মানুষ বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসাসেবা পান। এ বছরও একই নিয়মে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

গত শনিবার স্কুল মাঠে এলাকার শত শত মানুষের উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে এলাকাবাসীর মিলনমেলা। বাহারছড়া-রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের গরিব, মেধাবী ও দুস্থ ২৭৩ ছাত্রছাত্রীর হাতে স্কুলব্যাগ, শৌচাগার রিং, খুঁটি ও টিন বিতরণ করা হয়। এছাড়া ৬৪০ জন গ্রামবাসীকে বিনা মূল্যে চক্ষু চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা হলেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. মুজিবুর রহমান। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল সাবের আহমদ মাস্টার ফাউন্ডেশন। অর্থায়নে ছিলেন ‘বাচাও (বাংলাদেশি আমেরিকান চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন) এর পরিচালক এ এইচ এম কুতুব উদ্দিন। চক্ষু চিকিৎসায় সহযোগিতা করে কক্সবাজার বায়তুশ শরফ হাসপাতালের মেডিক্যাল দল। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি দাশ।

রত্নপুর গ্রামের বৃদ্ধা রাবেয়া বেগম, মাহবুবা খাতুন, কুলসুমা বেগম, বৃদ্ধ জানে আলম ও শমসু মিয়া বলেন, এ স্কুল থেকে বিনা মূল্যে প্রতিবছর চিকিৎসাসেবা না পেলে আমরা চোখে দেখতাম না। প্রতিবছর আমরা এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করি।

স্কুলের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার, পারভীন আক্তার, নুরে আলম, রহিম উদ্দীন বলেছে, আমাদের গ্রামে অনেকের বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নেই। প্রতিবছর স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বিনা মূল্যে শৌচাগার রিং পাওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি হচ্ছে। এতে গ্রামের মানুষও সচেতন হচ্ছে। এছাড়া গ্রামের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর স্কুলব্যাগ কেনার সামর্থ্য নেই। স্কুলব্যাগ পেয়ে আমার খুব খুশি। প্রতিবছর উৎসব আমেজে এ আনন্দ উপভোগ করি।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়ন খুবই গরিব এলাকা। এখানে শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে গত ছয় বছর ধরে এ কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এ এইচ এম কুতুব উদ্দিন ‘বাচাও’ নামে একটা সংস্থার অধীনে প্রতিবছর এ অর্থায়ন করে থাকেন।’’

‘বাচাও (বাংলাদেশি আমেরিকান চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন)’ এর পরিচালক এ এইচ এম কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং শিশুদের লেখাপড়ামুখী করে তুলতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এটিকে সামনে রেখে আরো বড় পরিসরে করার চিন্তা-ভাবনা করছি।’


মন্তব্য