kalerkantho


ডাকাতি-ধর্ষণ মামলা

কর্ণফুলী থানার গাফিলতি খুঁজে পাচ্ছে না নগর পুলিশ!

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কর্ণফুলী থানার গাফিলতি খুঁজে পাচ্ছে না নগর পুলিশ!

কর্ণফুলী থানা এলাকার একটি বাড়িতে ডাকাতির সময় চার নারীকে ধর্ষণের ঘটনা-পরবর্তী মামলা রেকর্ড না করা, তিন আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড কিংবা টিআই প্যারেডসহ সার্বিক কাজে কর্ণফুলী থানা পুলিশের গাফিলতি খুঁজে পাচ্ছে না নগর পুলিশ। যদিও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন।

প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতির সময় চার নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কর্ণফুলী থানা পুলিশ তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের পর দাবি করে, পুলিশ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়েছে এবং তাঁদের একজনকে টিআই প্যারেডের মাধ্যমে শনাক্ত করার আবেদনও করা হয়।

কিন্তু পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে নিশ্চিত করে ঘটনায় তাঁরা জড়িত এবং এদের তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পুলিশের দুই সংস্থা যখন এই বিপরীতমুখী অবস্থান নেয় তখন প্রশ্ন ওঠে কোন দাবি সঠিক? কর্ণফুলী থানা পুলিশ নাকি পিবিআইয়ের। অবশ্য এর আগেও অনেক নাটকীয় ঘটনা ঘটে এ মামলা ঘিরে।

১২ ডিসেম্বর রাতে ডাকাতি-ধর্ষণ ঘটনার পর ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবার যায় কর্ণফুলী থানায় মামলা করতে। শুরুতেই কর্ণফুলী থানা ভিকটিমের বসতঘর পটিয়া থানার অধীনে উল্লেখ করে পটিয়া থানায় মামলা করার পরামর্শ দেয়। আবার পটিয়া থানা পুলিশ ভিকটিমকে পাঠায় কর্ণফুলী থানায়। এই নিয়ে চারদিন দৌঁড়ঝাঁপের পর ১৭ জানুয়ারি ভূমিপ্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কর্ণফুলী থানায় মামলা রেকর্ড হয়। এরপরই কর্ণফুলী থানা পুলিশ আবু নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। আবুর তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে কর্ণফুলী থানা পুলিশ। এঁদের মধ্যে আসামিকে রিমান্ডের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। কর্ণফুলী থানা পুলিশের এমন ‘গোলেমেলে’ আচরণের মধ্যেই ২৫ ডিসেম্বর নগর পুলিশের বন্দর জোনের উপ-কমিশনার হারুন উর রশিদ হাজারি বলেন, ‘ডাকাতি-ধর্ষণ মামলা রেকর্ড ও তদন্ত পর্যায়ে পুলিশের আংশিক ব্যর্থতা ছিল।’ এরপরই কর্ণফুলী থানা পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান করা হয় বন্দর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আরেফিন জুয়েলকে।

অন্যদিকে পিবিআই এ মামলায় মিজানুর রহমান (৪৫) নামে একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দিতে ঘটনায় জড়িতদের প্রকৃত পরিচয় বেরিয়ে আসে। তাতেই প্রমাণিত হয়, কর্ণফুলী থানা পুলিশ ডাকাতি-ধর্ষণ মামলায় যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।

পিবিআইয়ের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাকাতি-ধর্ষণের ঘটনায় এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনায় মোট ছয়জন জড়িত। অন্য দুজন পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত চারজনের মধ্যে তিনজন নিজদের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া হান্নান নামের এক আসামির তিনদিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে রবিবার। তিনদিন জিজ্ঞাসাবাদে হান্নান ঘটনায় জড়িত নয় বলে দাবি করেছে। তবে আসামিদের সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় থাকার বিষয়ে স্বীকার করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘হান্নান রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জড়িত নয় দাবি করলেও ডাকাতেরা যে রাতে ওই বাড়ির পাশে অবস্থান নিয়েছিল, তখন হান্নানের সঙ্গে আবু সামার মোবাইল ফোনে কথোপকথনের প্রমাণ আছে। ঘটনার পরও তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সন্তোষ চাকমা বলেন, ‘কর্ণফুলী থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ইমতিয়াজ বাপ্পীর রিমান্ড আবেদনের ওপর রবিবার শুনানি আছে আদালতে। সেই শুনানিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আমাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। আমি রবিবার আদালতে হাজির থাকব।’ তিনি বলেন, ‘ডাকাতি-ধর্ষণের ঘটনায় ইমতিয়াজ বাপ্পী জড়িত এমন কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তাই আমি বাপ্পীর রিমান্ড চাইব না।’

পিবিআইয়ের গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা ওই ঘটনায় প্রকৃত আসামি আর কর্ণফুলী থানা পুলিশের গ্রেপ্তারকৃত তিনজন মূলত নিরপরাধ লোক।-এ বিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। কিন্তু কর্ণফুলী থানা পুলিশের ব্যর্থতা বিষয়ে প্রকাশে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মন্তব্য করতে চাইছেন না। কর্মকর্তারা বলছেন, ডাকাতি-ধর্ষণ মামলায় আসামি গ্রেপ্তার নিয়ে কর্ণফুলী থানা পুলিশ ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজাতে চেয়েছিল। এক আসামিকে টিআই প্যারেডের মাধ্যমে শনাক্ত করানোর চেষ্টাও হয়েছিল। মূলত বিভিন্নমুখী চাপে পড়ে পুলিশ এমন অপকর্মের দিকে এগিয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু পিবিআই মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। কর্ণফুলী থানা পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না?-এমন বিষয়ে জানতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান আরেফিন জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাফিলতি ছিল কি না সেটা জানতে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

কর্ণফুলী থানা পুলিশ ‘জজমিয়া’ নাটক সাজাতে চেয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নাটক সাজাবে কেন? মূলত একজন নারী আবু নামের এক আসামির ছবি দেখে শনাক্ত করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে তো ঘটনার বিষয়ে অন্ধকারে ছিল পুলিশ। তাই এমনটা হতে পারে। বাস্তবে পুলিশের কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল না।’


মন্তব্য