kalerkantho


সীতাকুণ্ড উপকূলে মারা পড়ছে মা কচ্ছপ

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সীতাকুণ্ড উপকূলে মারা পড়ছে মা কচ্ছপ

প্রায় ৩০ কেজি ওজনের মরা মা কচ্ছপের ছবিটি সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর গুলিয়াখালী সাগর উপকূল থেকে সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সীতাকুণ্ডের সাগর উপকূলে ডিম দিতে এসে মারা পড়ছে মা কচ্ছপ। উপজেলার মুরাদপুর, বাঁশবাড়িয়া ও কুমিরা ইউনিয়নের উপকূলে গত তিন সপ্তাহে অন্তত ১০টি মৃত কচ্ছপ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে উপজেলা মত্স্য বিভাগ। মত্স্য কর্মকর্তা জানান, উপকূলে কচ্ছপ মারা যাওয়ার ঘটনা প্রথম নয়। আগের বছরও বড় আকারের মৃত মা কচ্ছপ পাওয়া গেছে ওই এলাকায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলার সাগর উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা ধীরে ধীরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। বিশেষ করে মুরাদপুর, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা ও সলিমপুর সাগরপাড়ে প্রায় প্রতিদিন কমবেশি দর্শনার্থী আসছে। এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীর আনাগোনায় এখানে পর্যটন সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলেও এর পরিকল্পনার অভাবে বিরূপ প্রভাবও পড়ছে। একসময়ের নীরব নিঃস্তব্ধ এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে এখন মানুষ ও যানবাহনের চলাচল বাড়তে থাকায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

এলাকাবাসী জানান, এখানে বনভোজনে আসা দর্শনার্থী কিংবা স্থানীয়রা নির্বিচারে উজাড় করছে উপকূলীয় গাছপালা। তাঁদের ব্যবহৃত কার, মোটরসাইকেল, জিপসহ বিভিন্ন যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে কচ্ছপ, কাঁকড়াসহ নানান প্রাণী মারা পড়ছে। স্থানীয়রা দর্শনার্থীদের আগনকে পুঁজি করে দোকানপাট বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়েও জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে এসব প্রাণী ধ্বংস করছে। এছাড়া উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের বর্জ্যে পানি দূষিত হওয়ায় অনেক সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে। ফলে একসময় সাগর থেকে এসব উপকূলে এসে বহু সামুদ্রিক প্রাণী বসবাস ও বংশবিস্তার করলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।

মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. রহুল আমিন বলেন, ‘এখানে শুধু কচ্ছপ নয়, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছও মারা যাচ্ছে। প্রায়ই দেখি সাগরপাড়ে বিভিন্ন সামুদ্রিক জীব মরে ভাসছে। কখনো কখনো নাম না জানা বড় বড় মাছও এখানে এসে মারা পড়ে। তবে ইদানীং মৃত কচ্ছপ বেশি চোখে পড়ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানকার বাসিন্দা হওয়ায় অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করছি, মৃত কচ্ছপগুলো ডিম ছাড়ার জন্য এখানে এসেছিল।’

তিনি জানান, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে গাছপালার ফাঁকে মাটি খুঁড়ে ডিম দিয়ে আবার মাটিচাপা দিয়ে চলে যেত কচ্ছপ। পরে ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে আরো অনেক কচ্ছপের জন্ম হতো। কিন্তু এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। এখন যেসব কচ্ছপ বংশবিস্তার বা আশ্রয়ের জন্য আসছে সেগুলো কৌতূহলী এলাকাবাসী অথবা দর্শনার্থীর হাতে মারা পড়ছে। অনেকে ধরেও নিয়ে যায়। দর্শনার্থীর আগমনে এখন আগের মতো ঘনজঙ্গল কিংবা গাছপালা নেই।

প্রায় একই কথা বললেন মুরাদপুর গুলিয়াখালী সাগর উপকূলে বেড়াতে আসা সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এস কে এম জুট মিলস এলাকার বাসিন্দা মো. খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমি সম্প্রতি ওই এলাকায় বেড়াতে গিয়ে দুটি মৃত কচ্ছপ দেখেছি। এর একটি ওজন কমপক্ষে ৩০ কেজি, অন্যটি পাঁচ কেজি। একটির চোখ নেই। অন্যটির শরীরে ক্ষতবিক্ষত।’

খোরশেদও মনে করেন, এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় সামুদ্রিক প্রাণীদের আবাস ধ্বংস হচ্ছে। পর্যটকদের অনেকে সাগরপাড়ে এ ধরনের কচ্ছপ, কাঁকড়া দেখলে পিটিয়ে হত্যা করে। গত দুই সপ্তাহে এখানে আটটি কচ্ছপ মারা যাওয়ার খবর রয়েছে।

গত সপ্তাহে কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া সাগরপাড়ে আরো দুটি কচ্ছপ মারা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহেদ হোসেন নিজামী বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে প্রায় প্রতিদিন এখন বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। অনেক যানবাহনও আসে। এতে প্রাণীগুলো আগের মতো বিচরণ করতে পারে না একথা ঠিক। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে শুধু কচ্ছপ নয়, আরো নানান সামুদ্রিক মাছ মরে ভেসে আসে উপকূলে।’

সীতাকুণ্ড উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে এ সময়টাতে কচ্ছপ ডিম ছাড়ার জন্য উপকূলে আসে। কিন্তু এখানে এসে নানান প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে পড়ে এরা মারা যাচ্ছে। এ কারণে গতবছরও বেশ কয়েকটি মৃত কচ্ছপ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাঁশবাড়িয়ায় মৃত একটি কচ্ছপের ওজন ছিল প্রায় ৪০ কেজি।’

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্যের কারণে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকায় পানি দূষণেও সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছ মারা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।


মন্তব্য