kalerkantho


চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ চায় নেপাল

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ চায় নেপাল

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানি করতে চায় নেপাল। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে চায় দেশটি। এতদিন ভারতের হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করে নেপাল পণ্য আমদানি-রপ্তানি করছিল। ইদানীং হলদিয়ার বদলে বিশাখাপত্তম বন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে ভারত সরকার। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের দ্রুত সুযোগ পেতে চাইছে নেপাল।

জানতে চাইলে বাংলাদেশে নেপালের রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ডা. চোপ লাল ভুসাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এতদিন ভারতের হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আমদানি করতাম। কিছুদিন আগে ভারত সরকার হলদিয়ার বদলে বিশাখাপত্তম বন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বিশাখাপত্তম বন্দর আমাদের জন্য অনেক দূরে এবং পরিবহন খরচ অনেক বেশি হবে। সুতরাং সেই পরামর্শ কোনো সুফল আসবে না। চট্টগ্রাম থেকে নেপালের সমুদ্রপথের দূরত্ব মাত্র ৫০০ কিলোমিটার। এজন্য আমরা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে চাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে আমাদের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করতে চাই। এতে নেপালি পণ্য রপ্তানির হাব হিসেবে বিবেচিত হবে চট্টগ্রাম বন্দর। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ওয়ারহাউস বা গুদাম এবং বন্দর ব্যবহারের অনুমতি প্রয়োজন।’

বিষয়টি নিয়ে গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে সরেজমিনে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য উঠানামা পরিদর্শন করেছে দেশটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। এর আগে শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশটির এমপি, রাষ্ট্রদূত ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। সেই আলোচনায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত এই সুযোগ পাওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। 

সক্ষমতা না বাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দর নিজেদের পণ্য উঠানামা নিয়ে নিজেরাই হিমশিম খাচ্ছে। বহির্নোঙরে ও জেটিতে জাহাজ জট লেগেই আছে। এই অবস্থায় বিষয়টি সম্ভব কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রপ্তানি পণ্য হলে চট্টগ্রাম বন্দরের এখনকার সক্ষমতা দিয়েই সেটি পাঠানো সম্ভব। কারণ এখনো বিপুল খালি কন্টেইনার জাহাজে করে বিভিন্ন বন্দরে যাচ্ছে। এজন্য তাদেরকে আমরা বলেছি কমলাপুর আইসিডি ব্যবহার করতে। কারণ বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে কমলাপুর আইসিডির দূরত্ব চট্টগ্রামের চেয়ে অনেক কম। সেখান থেকে রপ্তানি পণ্য জাহাজে তোলে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছবে এরপর সেগুলো বড় জাহাজে বিদেশের নির্ধারিত বন্দর হয়ে গন্তব্যে রওনা দেবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গুদাম দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের বলেছি, দেশের ব্যবসায়ীদের সাথে মিলে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পাশে একটি ডিপো স্থাপন করে সেখানে তোমাদের এলাচি, আদাসহ যাবতীয় পণ্য গুদামজাত কর। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম থেকে সহজেই রপ্তানি করতে পার।’

নেপালকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিলে বাংলাদেশও উপকৃত হবে জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেপালের অনেক কাঁচাপণ্য কমখরচে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে এই ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য হ্যান্ডল করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। চট্টগ্রাম কাস্টমসকেও প্রস্তুত হতে হবে।’

আর বাংলাদেশে নেপালের ডেপুটি চিফ অব মিশন ধন বাহাদুর ওলী জোর গলায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা সুইজারল্যান্ড থেকে পণ্য আমদানি করছে, অথচ কাছের দেশ নেপাল থেকে সহজে পণ্য আমদানির সুযোগ নিচ্ছে না। সুদূর চীন থেকে আদা আমদানি করছে বাংলাদেশ, অথচ অনেক কমদামে একেবারে সহজে নেপাল থেকে আমদানি করছে না। বাংলাদেশ-নেপাল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই, কিন্তু আমরা চাইলে পরস্পরকে এইক্ষেত্রে সহায়তা করে এগোতে পারি।’

তিনি অনুযোগের সুরে বলেন, ‘‘আমরা দুদেশ ‘হাইলি কানেকটেড বাট পলিটিক্যালি ডিসকানেকটেড’ এই কারণে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা এগোতে পারিনি। এতদিনেও আমরা শুধু আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছি।’’

চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ১৯৭৬ সালে ট্রানজিট চুক্তির আওতায় পণ্য পরিবহন হত। নানা জটিলতায় পড়ে ১৯৮২ সাল থেকে সেটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৮ সালের দিকে কিছু পণ্য নেপাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। ২০১০ সালেও একটি সারের চালান চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে রেলপথে নেপাল গিয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৪০ টন প্লাস্টিক পণ্য চীন থেকে জাহাজে আমদানি হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছিল। চট্টগ্রাম বন্দরে নেপালের ট্রানশিপমেন্ট কন্টেইনার পণ্য এসেছিলে সেই প্রথম। সেখান থেকে সড়কপথে বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতের ফুরেরওয়ারি ও পানির টাংকি হয়ে নেপালের কাকরভিটায় পৌঁছে। এরপর আর পণ্য পরিবহনে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে মোংলা বন্দর দিয়ে এতদিন পণ্য আমদানি-রপ্তানি করছিল নেপালের ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে নেপালের ট্রানজিট চুক্তির সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী সৈয়দ মাহমুদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ এলাচি নেপালে উৎপাদিত হচ্ছে। নেপাল থেকে পণ্য আমদানিতে ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ নিয়ে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আমরা এখন সেই সুযোগ অনায়াসেই কাজে লাগাতে পারি।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নেপালে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ভারতের উপর দিয়ে যাওয়া। সরাসরি সড়কপথ না থাকায় ভারতের সড়কপথ ব্যবহার করতেই হবে। চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে বোঝাই হয়ে পণ্য সড়কপথে বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতের ফুরেরওয়ারি ও পানির টাংকি হয়ে নেপালের কাকরভিটায় পৌঁছতে ভারত সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন আছে। এ বিষয়টিও জোর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, নেপাল এবং বাংলাদেশ দুদেশের সরকারপ্রধান বিষয়টি সমাধানে জোর দিয়েছেন।

বর্তমানে ঢাকা-কাঠমণ্ডু রুটে বিমানপথে তিনটি বিমান সংস্থা চলাচল করছে। শিগগিরই হিমালয়ান এয়ারলাইন্স নামে নতুন একটি বিমান সংস্থা যাত্রী পরিবহন শুরু করবে।


মন্তব্য