kalerkantho


ভারতীয় শিক্ষার্থী আতেফ শেখ খুন

‘প্রযুক্তি তদন্তে’ প্রমাণিত হলো বন্ধুই খুনি

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘প্রযুক্তি তদন্তে’ প্রমাণিত হলো বন্ধুই খুনি

নগরের আকবর শাহ থানা এলাকার একটি বাসায় ভারতীয় শিক্ষার্থী আতেফ শেখকে তাঁর বন্ধু মাইসনাম উইনসন সিংহই ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছেন। ‘প্রযুক্তি তদন্তের’ মাধ্যমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই খুনের রহস্য উম্মোচন করেছে। যদিও পরপর দুই দফা রিমান্ডে বন্ধু খুনের দায় অস্বীকার করে উইনসন সিংহ তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। ঘটনার সময়ের ‘কিছু স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে’ দাবি করে চিকিৎসকদেরও বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।

গতকাল সোমবার সিআইডির কাছ থেকে ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার পর পিবিআই নিশ্চিত হয়েছে আতিফ শেখকে বন্ধু উইনসন সিং ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈন উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘ঘটনার পর থেকে উইনসন সিংহকে সন্দেহ করা হচ্ছিল। তিনি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু সময়ের ‘স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে’ দাবি করে বার বার খুনের দায় অস্বীকার করেন তিনি। এ কারণে যে ছুরি দিয়ে আতেফ শেখকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল, সেই ছুরির বাট থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উইনসন সিংহ-এর ডিএনএ নমুনা মেলানো হয়। দুটি ডিএনএ মিলে যাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া গেছে খুনি উইনসন।’’

তিনি আরো বলেন, ‘উইনসন সিংহই আতেফকে খুন করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই, এখন বের করতে হবে কী কারণে খুন করলেন। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে উইনসনকে আবারও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার সময় দুই বন্ধু এককক্ষে ছিল। দরজাও ছিল বন্ধ। বদ্ধ দরজার তালা খুলে দুজনের একজনকে গলাকাটা এবং অন্যজনকে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করেন তাঁদের অন্য বন্ধু নীরাজ। হাসপাতালে নেওয়ার পর আতেফ মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যান উইনসন। কিন্তু উইনসন নিজে আতেফকে খুনের কথা অস্বীকার করতে থাকায় বিপাকে পড়ে তদন্তকারী সংস্থা। এ কারণে পুরো মামলার তদন্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহার করে শেষ করতে হচ্ছে।’

সন্তোষ চাকমা জানান, ঘটনায় জড়িত সবাই ভারতীয় নাগরিক এবং তাঁরা নগরের ইউএসটিসির শিক্ষার্থী। গত বছরের ১৪ জুলাই রাতে তাঁদের বাসায় মদের আসর বসায় বন্ধুরা। আকবর শাহ থানা এলাকার লেকভিউ সোসাইটির হাজী ইউসুফ ম্যানশনের একটি ফ্ল্যাটে আসর শেষ করার পর রাত ১১টার দিকে খুনের ঘটনা ঘটে। ওই সময় আসরে অংশ নেওয়া অন্য বন্ধুরা চলে গিয়েছিল। নিজেদের কক্ষেই ছিলেন আতেফ শেখ ও উইনসন। সেখানেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পরপরই ভারত থেকে আতেফের বাবা আবদুল খালেক চট্টগ্রামে এসে আকবর শাহ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শুরুতে মামলাটি আকবর শাহ পুলিশ তদন্ত করলেও পরবর্তীতে মামলার তদন্ত করে পিবিআই। মামলার তদন্ত পর্যায়ে একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী বন্ধু উইনসনও ছিলেন। তাঁকে দুই দফা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও পিবিআই কোনো তথ্য পায়নি। বারবার তিনি দাবি করছিলেন, ‘কিছু সময়ের স্মৃতি’ নষ্ট হয়ে গেছে তাঁর। অর্থাৎ, ঘটনার আগে ও পরের সব বিষয় তার মনে আছে। শুধু ঘটনার সময়ের স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে।

দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদের পরও উইনসন সিং খুনের ঘটনা অস্বীকার করায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করেন আসামির স্মৃতি পরীক্ষা করার জন্য। আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৬ সদস্যবিশিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে আসামির স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে আড়াল করার জন্যই স্মৃতি নষ্ট হওয়ার যে দাবি করেছে তা অসত্য। আসামি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে।’

চিকিৎসকদের কাছ থেকে এমন প্রতিবেদন পাওয়ার পর অপরাধ প্রমাণে পিবিআইয়ের কাছে তেমন কোনো তথ্য প্রমাণ ছিল না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বুদ্ধি আঁটেন, যে ছুরি দিয়ে আতেফকে হত্যা করা হয়েছে সেই ছুরির বাট পরীক্ষা করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের। ছুরিটি ভেঙে গিয়েছিল ঘটনার সময়। ভাঙা ছুরির বাট থেকে শেষ পর্যন্ত সিআইডি ডিএনএ নমুনা পেয়ে যায়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম থেকে দুই আসামি উইনসন ও নীরাজকে ঢাকায় পাঠানো হয় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজনে। দুজনের নমুনা নেওয়ার পর সিআইডি নিশ্চিত হয় তাঁদের মধ্যে উইনসনের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে ছুরির বাটে প্রাপ্ত ডিএনএর সঙ্গে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সন্তোষ চাকমা বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সময় ছুরিটি ভেঙে গিয়েছিল। যেহেতু ছুরির বাট ধরেই খুনি আতেফকে ছুরিকাঘাত করেছে, সেহেতু বাটে খুনির হাতের ডিএনএ ছিল। এই ডিএনএ থেকে খুনি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া অন্য আসামি নীরাজের ডিএনএর মিল না পাওয়ায় তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’


মন্তব্য