kalerkantho


ঘরবাড়িতে বানের পানি, রাস্তাঘাট তছনছ

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ঘরবাড়িতে বানের পানি, রাস্তাঘাট তছনছ

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাউজানের হলদিয়ায় ভেঙে গেছে সড়ক। ছবি : আবু দাউদ, জাহেদুল আলম ও ছোটন কান্তি নাথ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে পানি। রাস্তাঘাট তছনছ হয়ে গেছে। মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধির পাঠানো খবরে :

রাউজানে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি : ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে রাউজানে। মুষলধারে বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢলে ডাবুয়া, সর্তা, খাসখালী, বেরুলিয়া খালসহ বিভিন্ন খালের বাঁধ ভেঙে পুরো রাউজান প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৮টি ওয়ার্ড বন্যা কবলিত। বাড়িঘরে, স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। ভেঙে পড়েছে বহু কাঁচা বসতঘর। উপজেলার এক লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি। ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত মুরগির খামার। খালগুলোতে ভাঙনের কারণে উপজেলার উপর দিয়ে বিস্তৃত চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কসহ অভ্যন্তরীণ দুই শতাধিক সড়ক পানিতে ডুবে গিয়ে বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত এ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। মঙ্গলবার হাজার হাজার বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। ঢুবে গেছে শতাধিক মসজিদ। এতে শবেকদরের ইবাদত নিয়েও বিপাকে পড়েন মুসল্লিরা। পানিতে তলিয়ে গেছে বেশির ভাগ বাজার, দোকানপাট।

 

বাম থেকে :  চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুরে মসজিদে ঢুকেছে পানি এবং খাগড়াছড়ির মাস্টারপাড়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন বাসিন্দারা।               ছবি : আবু দাউদ, জাহেদুল আলম ও ছোটন কান্তি নাথ

এদিকে নাজুক পরিস্থিতির মুখে উপজেলা পরিষদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক  করেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি। এতে উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম এহেছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দুর্যোগপূর্ণ অবস্থার কারণে জরুরি ভিত্তিতে সাত লাখ টাকা ও ২০ টন চাউল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সভার পর ফজলে করিম চৌধুরী উপজেলার বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখেন।    

পৌরসভা সদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট দীলিপ কুমার চৌধুরী বলেন ‘খাসখালী খালের বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে শাহনগর, সাপলঙ্গা, জলিলনগর, ঢেউয়া হাজীপাড়া, ফকিরহাট পানিতে তলিয়ে গেছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। রাস্তাঘাট ম্যাসাকার হয়ে গেছে।’

রাউজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএম জসিম উদ্দিন হিরু বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ৪টি ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যার পানিতে। ইউনিয়নের উপর দিয়ে বিস্তৃত হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক, রাউজান-নোয়াপাড়া সেকশান-২ সড়কসহ বহু অভ্যন্তরীণ সড়ক ডুবে গেছে। হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম বলেন ‘সর্তাখালের প্রত্যেকটি বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে পুরো ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। মানুষ পশু, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন ব্রিজ, কালভার্ট ও রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।’

চিকদাইর ইউপি চেয়ারম্যান প্রিয়তোষ চৌধুরী বলেন ‘ইউনিয়নের প্রত্যেক ওয়ার্ড পানির নিচে। মানুষ অসহায়। ডাবুয়া ও সর্তা খালের বাঁধ ভেঙে গেছে। নিরাপদে সরে গেছে অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক।’

ডাবুয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ইউনিয়নের অবস্থা খুব নাজুক। বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

পৌরসভার প্যানেল মেয়র বশির উদ্দিন খান ও জমির উদ্দিন পারভেজ বলেন, গহিরা, দায়ারঘাটা, বেরুলিয়া, জানালীহাটসহ বিভিন্ন স্থানে রাঙামাটি সড়ক তলিয়ে গিয়ে সোমবার ও মঙ্গলবার যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে কিছু সময় চললেও স্বাভাবিক হয়নি। পৌরসভার সব কটি ওয়ার্ডের প্রায় সব এলাকার ঘরবাড়ি, হাটবাজার, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘বন্যা দেখা দিয়েছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রত্যক ওয়ার্ডে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বিভিন্ন প্রাচীর ভেঙে গেছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এদিকে বহু মসজিদ, বাজার বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা শবেকদরের প্রস্তুতি নিতে বিপাকে পড়েন। অনেক মসজিদে নামাজের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।’

চকরিয়ায় কৃষকের মাথায় হাত : কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। গত তিন দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরসহ উপজেলার অন্তত ১২ ইউনিয়নের সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে বানের পানিতে। এতে বিস্তীর্ণজোড়া রকমারি সবজি ও ধানক্ষেতসহ উৎপাদিত ফসল গোলায় তুলতে না পারার শঙ্কায় কৃষকের মাথায় হাত উঠেছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চকরিয়া উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় কয়েক হাজার কৃষক রকমারি সবজির আবাদ করেন। কিছু কিছু সবজি ক্ষেত থেকে তুলে বাজারেও নিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় লাগাতার ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন কৃষকেরা।

চকরিয়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের হালকাকারা গ্রামের সবজিচাষি আবদুর রহমান জানান, দুই একর জমিতে কাঁকরোল, তিতকরলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, বরবটি, শসাসহ বিভিন্ন রকমারি সবজির আবাদ করেন তিনি। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ। কিন্তু এসব সবজি তুলে বাজারে নিয়ে যাওয়ার আগেই ভয়াবহ বন্যায় সবকিছু ছারখার করে দিয়েছে।

একই গ্রামের আরো বেশ কয়েকজন কৃষকও জানালেন একই তথ্য। তাঁরা জানান, হালকাকারার কৃষকেরা এবার মাতামুহুরী নদীতীরের প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিনে চাষ করেছেন কাঁকরোল, তিতকরলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, বরবটি, শসাসহ বিভিন্ন রকমারি সবজির। ইতোমধ্যে ফলন এসেছে। বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের কম করে হলেও কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মাতামুহুরী নদীতীরের সবজিক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।

চকরিয়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের সিংহভাগ মানুষ মাতামুহুরীর চরে সবজি ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। বন্যায় কম করে হলেও তিন শতাধিক সবজিচাষি ক্ষতির শিকার হয়ে পথে বসেছেন।’ কাকারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শওকত ওসমান বলেন, ‘কাকারা ইউনিয়ন মাতামুহুরী নদীবেষ্টিত। তাই শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে সবজিচাষ হয় এখানে। বন্যার তাণ্ডবে সবজিচাষির এখন মাথায় হাত উঠেছে।’

বরইতলী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার বলেন, ‘ইউনিয়নের সিংহভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। বিশেষ করে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরে ব্যাপক সবজির আবাদ করেন এখানকার কয়েক হাজার কৃষক। বন্যার প্রথম ধাক্কাতেই সর্বনাশ ঘটেছে কৃষকের।’

তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক উল্লাহ বলেন, ‘বর্ষাকাল হওয়ায় সবজির আবাদও কম হয়। বন্যায় যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাঁদের তালিকা তৈরি করা হবে। এর পর নতুন করে বীজ সরবরাহসহ নানা প্রণোদনা দেওয়া হবে।’

খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে : পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বর্ষণে খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা সদরের মুসলিমপাড়া, গঞ্জপাড়া, কালাডেবা, শান্তিনগর, বাঙালকাঠি, গোলাবাড়ি, কমলছড়ি, খবংপুড়িয়া, সিঙিনালার অন্তত ৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কেবল পৌরসভা এলাকাতে ৩৫০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন। কিছু কিছু এলাকায় বাড়িতে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করেন যুব রেড ক্রিসেন্ট কর্মী ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। গত সোমবার রাত ৯টার পর থেকে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না গোটা খাগড়াছড়িতে। টানা বর্ষণের কারণে সোমবার দিবাগত গভীর রাতে হঠাৎ করে চেঙ্গীনদীর পানি বেড়ে শহর ও শহরতলীর অধিকাংশ এলাকা ডুবে যায়। পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিসিক কার্যালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়। জেলার দীঘিনালা, মহালছড়ি, রামগড় এলাকায়ও বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়িতে ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। পানছড়ি-খাগড়াছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। মঙ্গলবার দুপুরে বন্যার্তদের দেখতে ছুটে যান শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি।

 


মন্তব্য