চকরিয়ায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পৌর এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি। প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাসে তিন শতাধিক নারী-পুরুষকে ডেঙ্গু রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে।
চকরিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ
- দুই মাসে তিন শতাধিক রোগী, ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু
ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)

এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত রবিবার সকালে মারা গেছেন আবু ইউসুফ জয় (২৮) নামে এক ছাত্রলীগ নেতা। তিনি এবং তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম একসঙ্গে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল জমজমে ভর্তি হন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও উন্নতি না হওয়ায় ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে।
চকরিয়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে জানান, প্রায় ১০ দিন আগে তাঁর ওয়ার্ডের হালকাকারা মৌলভীর চর গ্রামের নুরুল ইসলাম এবং তাঁর ছেলে চকরিয়া পৌরসভা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক আবু ইউসুফ জয় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। বাবা নুরুল ইসলাম চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও অকালে মৃত্যুবরণ করেন আবু ইউসুফ জয়।
ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কবির আহমদ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতালেও প্রতিদিন ভিড় করছে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ। এর মধ্যে চকরিয়া পৌরসভার বেশিসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছুটছেন।’
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক চিকিৎসক কবির আহমদ আরো বলেন, ‘ব্রেকবোন ফিভার বা ডেঙ্গু রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হাড়ের অসহ্য ব্যথা এবং প্রচণ্ড জ্বর। এ কারণে পানির পিপাসা দেখা দেবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে এই রোগে আক্রান্তরা।
সম্প্রতি এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন পৌরসভার মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা আবু সালাম। এ ছাড়া ফুলতলার ওসমান গণি মিন্টু এবং তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। পৌরশহরের সৌদিয়া বইঘরের মালিক জাহাঙ্গীর আলমও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়ে এখন ভালো হওয়ার পথে।
চকরিয়ার বেসরকারি হাসপাতাল জমজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম কবির বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে গত দুই মাসে শুধু আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন শতাধিক রোগী। এর মধ্যে যেসব রোগীর শরীরে রক্তের প্লাটিলেটের পরিমাণ ৩০ হাজারের নিচে নেমেছে তাঁদেরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে এখনো পর্যন্ত জমজম হাসপাতালে কোনো রোগী মৃত্যুবরণ করেনি।’
এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, চকরিয়ার পুরো পৌরশহর চিরিঙ্গা যত্রতত্র ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করতে গিয়ে একসঙ্গে প্রায় ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজ করতে গিয়ে একেবারে বন্ধ হয়ে রয়েছে ময়লা পানি চলাচল। আর এতেই এডিস মশার বিস্তার ঘটছে ভয়াবহভাবে। এ কারণে চকরিয়ায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বলে দাবি বাসিন্দাদের।
তবে চকরিয়া পৌরসভার সচিব মো. মাসউদ মোর্শেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপরোধে গত কয়েকদিন ধরে পৌরশহরের বিভিন্ন স্থানে এবং পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডে মশা নিধন কার্যক্রম চলছে। আর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ চলমানের সময় ময়লা পানি জমে থাকার কথাটি সত্য নয়। ড্রেন নির্মাণ করতে গিয়ে কোথাও দুই দিনের বেশি ময়লা পানি ধরে রাখা হয়নি।’
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহবাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিসপ্তাহে ৫-৬ রোগী ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসলেও তা নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা একটু বেড়েছিল। এর প্রতিকারে নির্দিষ্ট কোনো ভ্যাকসিন নেই। তবে এ রোগ প্রথমপর্যায়ে শনাক্ত হলে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে কয়েকদিনের মধ্যেই সেরে উঠতে পারে আক্রান্ত ব্যক্তি। কিন্তু ডেঙ্গুর ভাইরাস যখন পুরো শরীরে ছড়ায় তখন প্রচণ্ড জ্বর এবং জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথার পাশাপাশি রক্ত বেরোতে থাকে।’
তাঁর মতে, এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস বহন করে। তাই সচেতন থাকার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এই রোগ থেকে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
সম্পর্কিত খবর