kalerkantho


বর্ষায় রবীন্দ্রনাথ , রবীন্দ্রনাথের বর্ষা

মোকারম হোসেন

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বর্ষায় রবীন্দ্রনাথ ,

রবীন্দ্রনাথের বর্ষা

অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তাঁর ডারউইনবাদ ও রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনা প্রবন্ধে লিখেছেন—‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রকৃতি-সাহিত্যের রাজাধিরাজ। আমি সর্বদাই কবির কাছে নতশির, কৃপাপ্রার্থী, তাঁর অফুরান ভাণ্ডার থেকে দুহাত ভরে কুড়োই সম্মোহক আনন্দের খোরাক, লিখতে বসে তুলে নিই তাঁর শব্দ ও শব্দগুচ্ছ, কাছে রাখি বনবাণী, সঞ্চয়িতা, গীতবিতান।’ সত্যিই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টির মায়াজালে আমাদের ভাবনাকে বিস্তৃত পরিসরে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই আমরা প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের রূপ-সুধা অবলোকন করতে শিখেছি। তিনিই আমাদের দেখিয়েছেন বাংলার প্রকৃতিতে ছয় ঋতুর বর্ণাঢ্যতা তুমুল রাজসিক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর কথা, কবিতা ও গান প্রকৃতির নান্দনিকতাকে নানাভাবে উপস্থাপন করে। কবিগুরুর প্রকৃতিলগ্ন এই সৃষ্টিকর্ম পরিমাণের দিক থেকেও সমুদ্রসম।  

আমাদের সব ঋতুর বর্ণ-গন্ধ আলাদা। কিন্তু সব ঋতুই যে বাঙালির মানসলোকে নাড়া দেয়, তা-ও নয়। এমন যদি একটি ঋতুও থাকে, যার সঙ্গে বাঙালিমাত্রই একাত্ম  হয়ে ওঠে, তা অবশ্যই বর্ষা। সেই কবে খ্রিস্টপূর্ব বা মতান্তরে খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের দিকে কবি কালিদাস মেঘদূতের কাব্য সাজিয়েছেন। মূলত তখন থেকেই বর্ষা আমাদের হলো। আমরা বর্ষা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে শিখলাম। অনেক যুগ পরে কবিগুরু বর্ষার সেই প্রায় মৃতপ্রায় ধারাকে আবার পুনর্জীবন দিলেন। আষাঢ়-শ্রাবণের ছান্দসিক ভেজা বাতাস তাঁর মনকেও উতলা করল। সেই আর্দ্রতা ছুঁয়ে গেল আমাদের মনোজগেক। কবি লিখলেন হূদয়গ্রাহী অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, নাটক, ছড়া। ধীরে ধীরে এই সব লেখা আমাদের জন্য এক অনিবার্য আশ্রয় হয়ে উঠল। বর্ষার কালজয়ী সেই সব লেখা বাঙালির হূদয়ে সোনার অক্ষরে মুদ্রিত হয়ে আছে। বাংলা ভাষায় বর্ষার এমন মর্মস্পর্শী আবেগঘন চিত্রকল্প আর দ্বিতীয় কোনো লেখকের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ—

‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে/তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’ [খেয়া, শিলাইদহ, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭]

এই কবিতা বাংলায় বর্ষার চিরায়ত রূপকেই তুলে এনেছে। এমন আরো কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বর্ষামঙ্গল শিরোনামের কবিতায় আছে—

‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে/ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা/শ্যামগম্ভীর সরসা।’ [কল্পনা, জোড়াসাঁকো, ১৭ বৈশাখ ১৩০৪]

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থে অঝর বর্ষণের ঘোরলাগা মুহূর্তের কথাই মূর্ত হয়ে ওঠে—

‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।/কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।’ [সোনার তরী, শিলাইদহ, ফাল্গুন ১২৯৮]

প্রচলিত গানে কৃষ্ণকলি, মেঘলা আকাশ আর কালো হরিণ চোখ মিলেমিশে একাকার—

‘কৃষ্ণিকলি আমি তারেই বলি,/কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।/মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে/কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।’ /[খেয়া, শিলাইদহ, ৪ আষাঢ়, ১৩০৭]

বর্ষা পর্বের বশে কটি জনপ্রিয় গান আছে। বর্ষার মেঘপুঞ্জকে স্বাগত জানাতে এ এক সুখশ্রাব্য গীতিকাব্য।

‘মন মোর মেঘের সঙ্গী,/উড়ে চলে দিগদিগন্তরের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে/রিমিঝিম  রিমিঝিম  রিমিঝিম            

ঁঁআবার—‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে অথবা ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,/ আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান’

‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে বর্ষার পল্লীবাংলার নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। শ্রাবণের মধুর বর্ষণে ভেজা বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল এই গল্পের মোহনীয় শব্দগুলো।

‘শ্রাবণ মাসে বর্ষণের আর অন্ত নাই। খাল বিল নালা জলে ভরিয়া উঠিল। অহর্নিশি ভেকের ডাক এবং বৃষ্টির শব্দ। গ্রামের রাস্তায় চলাচল প্রায় একপ্রকার বন্ধ—নৌকায় করিয়া হাটে যাইতে হয়।’ বর্ষার এমন অনেক অনবদ্য বর্ণনায় সমৃদ্ধ এই গল্প।

শুধু পোস্টমাস্টারই নয়, বর্ষাবিষয়ক গল্পের তালিকায় আরো আছে একরাত্রি, ছুটি, জীবিত ও মৃত ইত্যাদি। প্রবন্ধও নেহাত কম নয়। ‘মেঘলা দিনে’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন—‘আজ মেঘলা দিনের সকালে শুনতে পাচ্ছি, সেই ভিতরের কথাটা কেবলই বন্ধ দরজার শিকল নাড়ছে। ভাবছি, কী করি। কে আছে যার ডাকে কাজের বেড়া ডিঙিয়ে এখনই আমার বাণী সুরের প্রদীপ হাতে বিশ্বের অভিসারে বেরিয়ে পড়বে।’ বর্ষার ছন্দবদ্ধ বরিষণ কবির মনকে কতটা উতলা করতে পারে, এখানে তা বোঝা গেল। প্রবন্ধের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য হলো বাণী, মেঘদূত, বর্ষা ও শরৎ এবং শ্রাবণসন্ধ্যা, বর্ষার চিঠি, বৈশাখী ঝড়ের সন্ধ্যা, আষাঢ়, বসন্ত ও বর্ষা, নববর্ষা ইত্যাদি। কবি গুরুর বর্ষার সমগ্র আয়োজনকে আরো ঋদ্ধ করেছে এ বিষয়ক কিছু চিঠিপত্র। তাতে বর্ষার নানা দিক উঠে এসেছে। বর্ষাবিষয়ক প্রায় ১৬টি চিঠির মধ্যে একটি হেমেন্দ্রবালা দেবীকে লেখা। 

রবীন্দ্রনাথ বর্ষার প্রসঙ্গ শুধু কবিতা, গান, গল্প বা প্রবন্ধে সীমাবব্ধ রাখেননি। আলো ফেলেছেন বর্ষার প্রকৃতিতে ফোটা অপরূপ ফুলের ওপরও। এই তালিকাও সংক্ষিপ্ত নয়। কোনো কোনো ফুলের জন্য রচনা করেছেন একাধিক পঙিক্ত। নানাভাবে, নানা প্রসঙ্গে সজ্জিত এসব কাব্যকথন প্রকৃতিসাহিত্যের অনন্য সম্পদ হয়ে আছে। তাঁর বর্ষণসিক্ত পুষ্পরাজির কয়েকটি এখানে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। সঙ্গে একটি প্রাসঙ্গিক বর্ণনাও যুক্ত হলো—   

বর্ষার অন্যতম ফুল ‘মালতী’ নিয়ে তাঁর ১৭টি উদ্ধৃতির সন্ধান পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি— 

১. কাননে ফুটে নবমালতী/ কদম্ব কেশর। ২. সেদিন মালতী যুথী জাতি/ কৌতূহলে উঠেছিল মাতি। ৩. ওই তো মালতী ঝরে পড়ে যায়/ মোর আঙ্গিনায়।  ৪. উতলা হয়েছে মালতীর লতা/ ফুরালো না তার মনে কথা। ৫. ওই মালতীলতা দোলে/ পিয়াল তরুর কোলে, পূব হাওয়াতে। ৬. কুন্দ মালতী করিছে মিনতি হও প্রসন্ন। ৭. যে ফিরে মালতীবনে সুরভিত সমীরণে ৮. বাদল বাতাস মাতে মালতীর গন্ধে

মালতী কাষ্ঠল লতার বহুবর্ষজীবী গাছ। পাতা আয়তাকার, ৮ সেমি লম্বা, বোঁটা ও শিরা লালচে। ফুল সাদা, সুগন্ধি, গড়নের দিক থেকে অনেকটা শিউলি ফুলের মতো, পাপড়ি মোড়ানো।

যূথী, জুঁই, যূথিকা একই ফুল। এটিও বর্ষার অন্যতম ফুল। উল্লিখিত একাধিক নামে এই ফুলের ২২টি উদ্ধৃতির খোঁজ পাওয়া যায়। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি—

১. সেদিন মালতী, যূথী, জাঁতি/ কৌতূহলে উঠেছিল মাতি। ২. চলিলে সাথে, হাসিলে অনুকূল/ তুলিনু যূথী, তুলিনু জাঁতি, তুলিনু/ চাঁপাফুল। ৩. মেঘের দিনে শ্রাবণ মাসে/ যূথীবনের দীর্ঘশ্বাসে। ৪. এই শ্রাবণ-বেলা বাদল ঝরা যূথীবনের/ গন্ধে ভরা। ৫. জুঁই সরোবর তীরে নিঃশ্বাস ফেলিয়া ধীরে/ ঝরিয়া পড়িতে চায় ভূঁয়ে। ৬. বৃষ্টির জলে ভিজে সন্ধ্যা বেলাকার জুঁই/ তাকে দিল গন্ধের অঞ্জলি।

কদম ছাড়া যেমন বর্ষা প্রাণহীন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও কদমের সৌন্দর্য ধূসর ও বিবর্ণ। কদমকে তিনি নীপ নামেও সম্বোধন করেছেন। সব মিলিয়ে ১৪টি কাব্যাংশে কদমের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি—

১. কদম্বগাছের সার,/চিকন পল্লবে তার/  গন্ধে ভরা অন্ধকার/ হয়েছে ঘোরালো। ২. নবকদম্ব মদির গন্ধে/ আকুল করে। ৩. কদমগাছের ডালে/ পূর্ণিমা চাঁদ আটকা পড়ে/ যখন সন্ধ্যাকালে। ৪. আষাঢ়ের আর্দ্রবায়ুভরে/ কদম্ব কেশরে/ চিহ্ন তার পড়ে ঢাকা। ৫. কদম্ব কেশরগুলি নিদ্রাহীন বেদনায় আঁকা। ৬. বাদল দিনের প্রথম কদমফুল/ আমায় করেছ দান। ৭. কদম্বেরই কানন ঘেরি/ আষাঢ় মেঘের ছায়া খেলে। ৮. ফুটুক সোনার কদম্বফুল নিবিড় হর্ষণে।

কদমের সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। বর্ণে গন্ধে সৌন্দর্যে কদম এ দেশের রূপসী তরুর প্রথমদের অন্যতম। গাছ দীর্ঘাকৃতির, বহুশাখী এবং বয়স্ক গাছ বিরাট। প্রস্ফুটন মৌসুমে ছোট ছোট ডালের আগায় একক কলি আসে গোল হয়ে। কোমল ও সুগন্ধি। বলের মতো গোলাকার মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস অতি চমত্কার। মঞ্জুরির রং সাদা-হলুদ মেশানো। সব মিলিয়ে সোনার বলের মতো ঝলমলে।

রবীন্দ্রনাথের সমুদ্রসম রচনা-নিচয়ের বিশাল অংশজুড়ে আছে বর্ষা, যার খুব সামান্যই এখানে বিবৃত হলো। তাঁর বর্ষার কোমল শব্দমালা থেকে যদি আমাদের হূদয়কে আর্দ্র করতে হয় তাহলে আরো গভীর পাঠ ও অনুসন্ধান প্রয়োজন। সেই চেষ্টা আমাদের করতে হবে। বর্ষার আশ্চর্য মেঘদল আমাদের জীবনে শান্তির বারতা ছড়িয়ে দিক।



মন্তব্য