kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষণ্ণ সহরের গল্প

সেলিনা হোসেন

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০





বিষণ্ণ সহরের গল্প

রজা খোলার আগে ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়ায় আলপনা। চোখের পানি মুছেছে, বিষণ্ন চেহারায় খানিকটা খুশির আভা। আসফিয়া ভাবে, মেয়েটা কি কোনো ভালো খবর পেয়েছে? ওকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আলপনা বলে, মহুয়া আপু এসেছে। তোমরা কি কলিং বেল শুনতে পেয়েছ?

—হ্যাঁ, পেয়েছি তো। তাহলে মহুয়াই কি দরজার সামনে, যা ওকে ঘরে নিয়ে আয়।

—মহুয়া আপু আমাকে মোবাইলে ফোন করেছিল। বলেছে মোবাইলে ভাইয়াকে পাচ্ছে না। মহুয়া আপু ফোনে অনেক কেঁদেছে।

আবার কলিং বেল বাজলে দুজনেই বলে, যা ওকে নিয়ে আয়।

আলপনা এগিয়ে যায়। আরমান হক ও আসফিয়া পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। অমিয়র সঙ্গে মহুয়ার প্রেমের কথা তারা জেনেছে মাস ছয়েক আগে। অমিয় নিজেই বলেছে। এবার পিলখানায় যাওয়ার আগে বলেছে, তোমরা আমাদের বিয়ের ডেটটা ঠিক করে ফেল আব্বু-আম্মু। দুজনেই এই মুহূর্তে ভাবছে ওদের বিয়ের ডেটটা ঠিক করে ফেলতে হবে। মহুয়াকে তারাও খুব পছন্দ করে। পড়াশোনায় মেধাবী, আচার-ব্যবহারে মার্জিত। দুজনেই একসঙ্গে বলে, চমত্কার মেয়ে। আসফিয়ার উচ্ছ্বসিত ভাব কাটে না। বিভিন্ন সময়ে বলে, ও আমাদের ঘর আলোকিত করবে। শুনে শুনে গান লিখেছে। গান শোনাও ওর কাছ থেকে বড় পাওনা।

আসফিয়া দুহাতে চোখ মোছে। আরমান হক স্ত্রীর হাতে চাপ দিয়ে বলে, মহুয়ার সামনে আমরা কাঁদব না। মেয়েটা কষ্ট পাবে।

আসফিয়া মাথা নেড়ে সায় দেয়।

দুজনে এসে সামনে দাঁড়ায়। মহুয়ার বেদনার্ত কণ্ঠস্বর ঘরে ভাসে।

—পিলখানায় কী হচ্ছে—

আসফিয়া ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে। আরমান হকও উঠে দাঁড়িয়ে ওর মাথায় হাত রাখে। দুজনের আদর পেয়ে মহুয়া কাঁদতে শুরু করে।

—বসো মা।

আলপনা ওকে টেনে ধরে বলে, বসো মহুয়া আপু। মহুয়া চেয়ারে বসে দুহাতে চোখ মোছে। আলপনা ওকে টিস্যু এগিয়ে দেয়। নিজেও চেয়ার টেনে বসে। দুঃখের স্রোতে ভাসতে থাকে পারিবারিক মিলনমেলায়। সবাই বোঝে মহুয়া এখানে বাইরের কেউ না। পরিবারেরই একজন। পরিবারের ছেলেটির ভালোবাসার মানুষ। এই পরিবার তাকে প্রাণের টানে জড়িয়েছে। যে দুঃখের স্রোত বইছে সবার মনে সেই স্রোতে অমিয় এখন বর্ষার কদম ফুল। সবার হূদয়জুড়ে রং আর সৌরভ ছড়িয়ে ফুটে আছে যৌবনের ফুল হয়ে। কেউ সেখান থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছে না। কত সময় কেটে যায়। গোলাগুলির শব্দ থামে না। তবে তীব্রতা কমে এসেছে। কান খাড়া রেখে সবাই মিলে অমিয়র ভালোমন্দ অনুভব করতে চায়। কোথায় আছে অমিয়? কেমন আছে? মহুয়া সজল চোখে আবার জিজ্ঞেস করে, কী হচ্ছে পিলখানায়—

—আমরা তো জানি না মাগো যে কী হচ্ছে। তবে গোলাগুলির শব্দ শুনে মনে হয় এক দল অন্য দলকে আক্রমণ করেছে।

—পিলখানায় দলাদলি হবে কেন? আসফিয়া সোজা হয়ে বসে বলে, এসব কথা আমাদের ভাবার দরকার নেই। অমিয় কেমন আছে আমরা এটাই ভাবব।

—আমি মহুয়া আপুকে আমার ঘরে নিয়ে যাই মা?

—যাও। আমি ওর জন্য খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।

—আমি এখন কিছু খাব না।

—সকালের নাশতা খেয়েছ?

—না, খাইনি।

আলপনা জোরে জোরে বলে, এত ভয়ের মধ্যে খাবার তো গলা দিয়ে নামবে না। আমিও তো খাইনি মা।

—একদম না খেয়ে থাকা ঠিক হবে না। ফ্রিজে পুডিং আছে। আমি তোমাদের পুডিং আর কোক দিচ্ছি। এটুকু খাবে।

—আচ্ছা খাব মা।

দুজনে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চলে যায়। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে দুজনে। একসময় আসফিয়া আরমান হকের ঘাড়ে হাত রেখে বলে, তোমাকে একটু পুডিং দেই?

—দাও।

—গাজরের হালুয়া?

—না, এই নৃশংসতার মধ্যে প্রিয় জিনিস খাব না। আসফিয়া, পিলখানার চারদিকে কত মৃত্যু। আসফিয়া, এই জীবনে এত কিছু দেখতে হবে তার আগে আমার মরণ হলো না কেন?

—তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না গো। আমাদের ছেলেটাকে আমরা ঠিকই ফেরত পাব।

—আল্লাহ মাবুদ। আরমান হক দুই হাত ওপরে তোলে।

আসফিয়া ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে টেবিলে গোছায়। আলপনার ঘরে খাবার দেওয়ার আগেই ও ছুটে আসে ওদের কাছে।

—কি রে মা, নতুন কোনো খবর আছে?

—টেলিভিশনে অনেক কিছু দেখাচ্ছে। আপনারা টিভি দেখেন।

—এখনই তোর বাবাকে টিভির সামনে নিস না। আগে কিছু খেয়ে নিক। তারপর টিভি দেখবে।

—দু চোখ ভরে যা কিছু দেখতে হবে তার জন্য আমি তৈরি হইনি রে মা।

আরমান হক দুহাতে চোখ মোছে।

আসফিয়া পুডিংয়ের বাটি এনে টেবিলে রাখে। আরমান হকের দিকে এক বাটি পুডিং এগিয়ে দিয়ে বলে, খাও।

আরমান হক বাটি টেনে চামচে করে পুডিং উঠিয়ে মুখে পোরে। এক চামচ মুখে পুরলে মনে হয় কী খাচ্ছে তা বুঝতে পারছে না। আসফিয়া এতক্ষণ পুডিংয়ের কথা বলেছে। কিন্তু স্বাদে পুডিংয়ের কোনো স্বাদ নেই। এক চামচ খেয়ে চুপ করে বসে থাকে আরমান হক। বাটিটা নিজের হাতে সামনের দিকে এগিয়ে রাখে। পানির গ্লাস শেষ করে। বুঝতে পারে শরীরের ভেতরে খিদের চেয়ে পিপাসা বেশি। আলপনা আর মহুয়াকে পুডিং আর কোক দিয়ে ফিরে আসে আসফিয়া। টেবিলের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়।

—খেলে না যে? ভালো লাগেনি?

—পুডিং দেবে বলেছিলে, পুডিং তো দাওনি।

—কী বলছ? এটা তো পুডিংই। অন্য কিছু তো দেইনি।

—আমি পুডিংয়ের স্বাদ পাইনি।

—কী বলছ? কী হয়েছে তোমার?

—আমার তো কিছু হয়নি।

—আগে তো কখনো তোমাকে খাবার চিনতে ভুল করতে দেখিনি। তুমি অনায়াসে খাবারের নাম বলতে পারো। আজ কী হলো?

—জানি না। আমার কিছু হয়নি।

—চলো টিভি দেখবে।

—না। আমি টিভি দেখব না। তোমরা দেখো। অমিয়কে দেখা গেলে আমাকে জানিও।

—তুমি কী করবে?

—শুয়ে থাকব। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। কিছু ভালো লাগছে না। তুমি কিছু খেয়ে নাও আসফিয়া।

—আমার তো খাওয়ার সাধ ফুরিয়েছে। ছেলেটা ফিরে না আসা পর্যন্ত আর পেট ভরে খেতে পারব না। দম আটকে এলে হয় তো একটু পানি খাব।

—এভাবে চিন্তা করবে না আসফিয়া। ওর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো।

—তুমিও তো খাওনি।

—আমার পুডিংয়ের বাটিটা বেডরুমে দাও। আমি একটু একটু করে খাব। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না যে আমার দিন কি ঘনালো কি না।

চিত্কার করে কেঁদে ওঠে আসফিয়া।

—এমন করে কথা বলবে না। আমাদের উচিত শুধু অমিয়র জন্য দোয়া করা।

ফোঁপাতে থাকে আসফিয়া।

দ্রুতপায়ে বেরিয়ে আসে আলপনা আর মহুয়া। মাকে জড়িয়ে ধরে আলপনা।

—আমরা কাঁদছি কেন? ভাইয়ার ভালো খবর আমরা ঠিকই পাব।

মহুয়া প্রথম ওকে মা বলে ডাকে। আসফিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে, আপনি কাঁদবেন না মা। ও ঠিকই আপনার কোলে ফিরে আসবে।

আমি কি আপনাকে গান শোনাব? আপনি শুয়ে থাকেন।

—না, আমি শুতে পারব না। চলো ড্রয়িংরুমে বসি।

তিনজনে ড্রয়িংরুমে যায়। বেডরুমের খাটের পাশের টেবিলে পুডিংয়ের বাটি রাখে আরমান হক। শুনতে পায় শহরের কণ্ঠস্বর, বিডিআর জওয়ানদের অনেকে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র এনে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। এই পরিস্থিতি দেখে আট-দশজন কর্মকর্তা দরবার হলের পশ্চিম গেট দিয়ে বের হয়ে রাস্তায় নামে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের নিলডাউন করায়। এর মধ্যে ‘সদর’ লেখা বিডিআরের একটি পিকআপে বেশ কয়েকজন ওখানে এসে নামে। এসএমজির ব্রাশফায়ারে তাদের হত্যা করে। জওয়ানদের অনেকে দরবার হলের ভেতরে থেকে মহাপরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তাদের পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতে বলে। তারা সেই অনুযায়ী মহাপরিচালককে সামনে রেখে বের হতে থাকে। দরবার হল থেকে বের হয়ে কয়েক পা এগোলেই বিদ্রোহীরা সেনা কর্মকর্তাদের লাথি-ঘুষি মেরে বেয়নেট চার্জ করে। এত কিছু করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ওদের।

—ওহ, থাম শহর।

—তোমাকে এসব শুনতে হবে আরমান হক। ধৈর্য ধরো।

—আমার শোনার মতো ধৈর্য নেই। আমার বুকের ভেতর আমার ছেলের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ছোটবেলা থেকে ও খুব হাসিখুশি ছেলে। ওর দুরন্তপনায় আমি মুগ্ধ বাবা ছিলাম। কখনো বিরক্ত হইনি। ও মাথা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বলত, আমার বাবা রাগ করতে জানে না। মাঝেমধ্যে ছড়া কেটে বলত, বাবা, আমার বাবা/লেবেনচুস খাবা/খাও খাও খাও/পাখি হয়ে যাও/আকাশ দেখে ভাসো/জ্যোত্স্না নিয়ে আসো/সবাইকে ভালোবাসো।

—শহরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, আরমান হক এখন তোমার চারদিকে দুর্যোগ। তুমি টেলিভিশন দেখো। অনেক কিছু জানতে পারবে।

—না, আমি টেলিভিশন দেখতে পারব না। আমি নিজের চোখে দোজখ দেখতে চাই না।

—তুমি দেখতে না চাইলে কী হবে, দোজখ তো জ্বলছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে পিলখানা। পুড়ছে কোনো সেনার লাশ। পুড়ছে—

—থাক, থাক আর বলো না।

—শুনতে থাকো আরমান হক। গুলি আর বোমা বিস্ফোরণে কয়েকজন সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন পথচারী, একজন রিকশাওয়ালা।

—ওদের মারা হলো কেন? ওদের কী দোষ?

—কোনো কোনো মরণের জন্য দোষ লাগে না অরমান হক। বিনা দোষেও মরতে হয়। বিদ্রোহীরা বলবে, ওদেরও দোষ আছে। ওরা বিদ্রোহের সময় সামনে আসে কেন? ওরা জানবে না যে পিলখানার বিক্ষুব্ধ মানুষেরা দাবি আদায়ে মরিয়া হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে।

—ওরা কোনো অন্যায় করেনি?

—করেছে।

—কী করেছে?

—নিষ্ঠুরতা ওদের বড় অন্যায়। ওরা মহাপরিচালকের স্ত্রী ও বাড়ির কাজের মেয়েটিকে হত্যা করেছে।

—এটা কেমন কথা? ওদের অপরাধ কী?

—বলেছি না কোনো কোনো মৃত্যুতে অপরাধ লাগে না। মহিলাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। দরজা ভেঙে তাকে বের করা হয়েছে। তিনি একজন জেনারেলের স্ত্রী ছিলেন। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন না। তারপর বিদ্রোহীদের রোষ তাঁকে বাঁচতে দেয়নি। মৃত্যুর ঘটনা ঘটার আগে মহাপরিচালক প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এক দল উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক আপনার সরকারকে হেয় করার জন্য বিদ্রোহ করেছে। আমি ওদের সাথে নাই। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আপনি আমাদের সাহায্য পাঠান। আপনি আমাদের বাঁচান।’ এই ফোন করার পরে তিনি স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, ভয় পেয়ো না। সৈনিকেরা বাড়িতে গেলে বাথরুমে দরজা বন্ধ করে রেখো।’

—ওরা আরো অনেক কিছু করেছে শহর।

—হ্যাঁ করেছে। একজন মেজর টয়লেটে লুকিয়ে থেকে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন যে বিদ্রোহীরা তাঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যা তা ভাষায় গালাগাল করছে। ওরা বিভিন্ন বাড়ি লুটপাট করছে।

—এটা কেমন বিদ্রোহ শহর?

স্তব্ধ হয়ে যায় শহর। আর কোনো কথা শোনা যায় না। আরমান হক নিজেও শহরের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নয়। অমিয়র সঙ্গে কাটিয়ে আসা জীবনের ২৬ বছর প্রবল রঙে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। অমিয় বলছে, বাবা বাবা তোমার সঙ্গে আমার খেলাটা আমি খেলব। তুমি হাত বাড়াও আমি তোমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

ছেলেটাকে এভাবে বুকে জড়িয়ে ধরার গভীর আনন্দ ছিল আরমান হকের জীবনে। একসময় ছেলেটার শৈশব ফুরিয়েছে। ছেলে পড়ালেখা শেষ করে মেজর হয়েছে। খেলার দিন ফুরিয়ে গিয়েছে। কতকাল এমন খেলাটা খেলা হয়নি আরমান হক তা মনে রাখেনি। শুনতে পায় অমিয় বলছে, বাবা দুহাত বাড়িয়ে রাখো, আমি তোমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দৌড়ে আসছি।

আরমান হক ছটফটিয়ে বিছানায় উঠে বসে। সোজা হয়ে বসে দুহাত সামনে বাড়িয়ে রাখে।

—বাবা সোনা আমার বুকে আয়, আয়। বাবা সোনা কোথায় তুই? তোর পায়ের শব্দ তো আমি শুনতে পাচ্ছি না। বাবা-বাবারে—।

কোথাও অমিয়র পায়ের শব্দ শুনতে পায় না আরমান হক। একসময় দুহাত বুকে চেপে ধরে।

চলবে



মন্তব্য