kalerkantho

অপ সঞ্চয়

মাকিদ হায়দার

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অপ সঞ্চয়

অঙ্কন : মানব

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস এলেই বৃষ্টির কান্নার ধ্বনি শুনে তখন মনের ভেতরের তাড়নায় ক্ষণিকের জন্যও নিজেকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখতে পারেন না তিনি। মনটা একা, একাই কাঁদতে থাকে, মনকে বেশিক্ষণ কাঁদবার সুযোগ সেদিন না দিয়ে ভাড়া বাড়ির চারতলার ছাদে যেন নিজের মনেরই অজান্তে গিয়েই ভিজতে হয় আষাঢ়-শ্রাবণের অজস্র বৃষ্টি ধারায়।

সেই বৃষ্টি ধারার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয় তাঁর অক্ষিগোলকে জমানো অজস্র ব্যথা ও বেদনার উষ্ণ চোখের জল, যে জলে মিশে আছে তাঁর কলেজজীবনের গোটা দুয়েক সিনিয়র সহপাঠীর তারুণ্যের উজ্জ্বলতায়, বিভা মাখানো গোটা দুয়েক মুখ। তৃতীয় মুখটি তাঁর স্বামী গাজী আদনানের।

তবু তাঁকে কাঁদতে হয় সেই অজস্র জলধারার ভেতরে, যখন তিনি একসময় অনুভব করেন বৃষ্টি কিছুটা কমেছে কিংবা কিয়ত্ক্ষণের ভেতরেই ছেড়ে যাবে, তখনই চারতলা থেকে নেমে তিনতলার ফ্ল্যাটের জানালার কাছে গিয়ে আপন মনে ভাবতে থাকেন—ভুল কার হয়েছিল, প্রথম মুখটির নাকি দ্বিতীয় মুখটির—সর্বশেষ প্রশ্নটি তিনি নিজেকেই করেন, নাকি আমার নিজের, তবে তৃতীয় মুখটির অবশ্যই নয়, অথচ তৃতীয় মুখটির সঙ্গে তিনি আছেন প্রায় চার বছর। আছেন এবং থাকেন এক নিস্তব্ধতার ভেতরে, দুই রুমের এই ফ্ল্যাটে আর নতুন কেউ নেই, থাকলে অন্তত ড্রেসিং টেবিলের ওপরে অবহেলায়-অযত্নে পড়ে থাকা। সাজসজ্জার, পারফিউম থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রসাধনী হয়তো ফেলে ভেঙে দিলেও তাঁর ভালো লাগত, অথচ সেসবের কিছুই নয়। ভেজা চুলের জল যখন গড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁকে বাথরুমের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হয়, কিছু সময় যেতে না যেতেই যেন তিনি মনের অজান্তেই প্রথম মুখটিকে আয়নার ভেতরে দেখতে পান, আর তখনই যেন আয়নার ভেতরের সেই প্রথম মুখটি জানতে চায়, শামীমা ভালো আছেন?

গত শনিবারের বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে যখন ঢাকা শহর ভেসে যাওয়ার উপক্রম, সেদিন চারতলার ছাদে না গিয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় অনেকক্ষণ অসম্পূর্ণভাবেই ভিজেছিলেন, হয়তো সেদিনও তিনি চারতলার ছাদে যেতেন না, যাওয়ার কারণটি আকাশই তাঁকে বারবার জানিয়েছিল, বিদ্যুতের আকাশ ভাঙা পাগলামি ও বজ্রপাতের আশঙ্কায় সেদিন যাননি চারতলার ছাদে। সেদিনও তাঁকে কাঁদতে হয়েছিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে, কাঁদবার সময় লক্ষ করলেন ফ্ল্যাটের উল্টো দিকের এক বিপণিবিতানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা যে ভদ্রলোকটিকে দেখতে পেয়েছিলেন, যেন তাঁর ফেলে আসা কলেজজীবনের একজনের মুখের মতো একটি মুখ। মুখটি বোধ হয় সেই দ্বিতীয় সিনিয়র সহপাঠীর হবে, বৃষ্টি কিছু কমে এলেও তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন দ্বিতীয় ভাবনার মুখটি আর দেখতে পেলেন না, তখন একবার কাঁদলেন। মাঝেমধ্যে মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা ‘মন’ নামের একটি সৃষ্টি ছাড়াও অসম্ভব চঞ্চল বস্তুকে কেন যে মানুষের শরীরের ভেতর দিয়েছিলেন, সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই, শুধু জানা আছে, দেহের, শরীরের ও হূদয়ের মাঝখানে একটি মন নামের অসভ্য লোকের বাড়ি আছে। এই মুহূর্তে সেই অসভ্য লোকটার বাড়িতেই ভাড়া থাকতে হবে আজীবন।

বাড়িওয়ালা কোনো দিনই ভাড়া চাইবে না, তবে মাঝেমধ্যে এসে মনে করিয়ে দেবে। বেশ কয়েক বছর আগে, বিএ ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই দুটি মুখ দিন-রাত উত্পাত চালিয়ে যাচ্ছে নিজের—নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই দুষ্ট প্রকৃতির সেই অসভ্য প্রকৃতির মন, মাত্র দুটি মুখ নিয়ে তাঁর যাবতীয় ভাবনা, অথচ ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ব্যাংকার সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হয়ে রাত ৯টায় যখন ফিরে আসেন, তবু তাঁর জন্য দেহের ভেতরের সেই লুকিয়ে থাকা অসভ্য মনটি যেন সভ্য হয়ে গাজী আদনানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। গাজীর যেদিন ফিরতে দেরি হয়, সেদিন ঘর-বারান্দা করতে করতে মনে হয় কোথায়ও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি তো? নাকি ঢাকা শহরের দীর্ঘ জ্যামের ভেতরে এই আষাঢ়-শ্রাবণের ক্লান্তিহীন বৃষ্টিতে তাঁকেও কি আমার মতো কাঁদতে হয়? সে প্রশ্নের মনের ভেতর থেকে উত্তর হয়ে ফিরে আসতে না আসতেই কলিংবেল কাঁদতে থাকে শামীমার মতো। কান্নার ধ্বনিকে উপেক্ষা না করে দরজা খুলতেই সামনে এসে দাঁড়ায় পাশের ফ্ল্যাটের আরেক বাসিন্দা।

শামীমা মনে-প্রাণে বিরক্ত হলেও ভদ্রতার প্রশ্নেই তাঁকে বলতে হয় দিদি, ভেতরে আসুন। দিদি ভেতরে না এসে খুবই নিচু স্বরে বলেন, গোটা কয়েক কাঁচা মরিচ—ভদ্রমহিলার এ স্বভাব নতুন নয়। এর আগে অনেকবার আনাজসহ কাপড় ইস্ত্রি করার নাম করে ইস্ত্রিটাকে নিয়ে দিতে প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন। বারদুয়েক বলার পর ইস্ত্রি ফেরত পেলেও ফিরে পাননি আনাজ, লবণ। দরজার ওপারে দাঁড় করিয়ে—গোটা কয়েক কাঁচা মরিচ নিয়ে ফিরতেই চোখে পড়ল কাকভেজা আদনান সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন।

কোনো কোনো দিন খুবই আনন্দ মনে একগোছা রজনীগন্ধা, বকুলের মালা, শখের একটি শোপিস আদনান যেদিন সঙ্গে নিয়ে আসেন, তখনই শামীমার মনে হয় প্রথম মুখটির কথা। যে মুখটি এডওয়ার্ড কলেজের বার্ষিক আনন্দ অনুষ্ঠানে গিয়েছিল ‘সুখে আমায় রাখবে কেন’—সেই সদা উজ্জ্বল, মৃদুমন্দ বসন্তের প্রথম কিংবা তৃতীয় দিনে কেন যেন জানতে চেয়েছিল, শেষের কবিতায় অমিত চরিত্র, আপনার কাছে কেমন মনে হয়?

শামীমা কলেজের বার্ষিক শিল্পসাহিত্যের অনুষ্ঠানে গত বছর দ্বিতীয় এবং এই বছর প্রথম হয়েছিলেন বাচিকশিল্পী হিসেবে, আজকে যখন বাচিকশিল্পীর প্রথম পুরস্কারটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক। সেই স্মৃতিটা এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় গাজী যখন রজনীগন্ধার গোছা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তখনই শামীমা যেন হঠাৎ করেই ফিরে গিয়েছিল কলেজ অডিটরিয়ামের সেই আলো ঝলমলে সন্ধ্যায়। সেই দিন বাচিকশিল্পীর উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, যুক্ত শব্দের ব্যবহার ও কবিতা পাঠের কোন স্তরে, কোথায় উঠতে, নামতে ও থামতে হবে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর কলেজের সভাপতি সংক্ষিপ্ত ভাষণে।

জেলা প্রশাসক আরো একজনের প্রশংসা করেছিলেন আবেদিনের দ্বিতীয় গানটির জন্য—‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’, সেই দিনের সেই সন্ধ্যায় ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার আবৃত্তি শুনে জেলা প্রশাসকের স্ত্রী, যিনি এই শহরে ডিসি ভাবি নামে সমধিক পরিচিত, তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশের জন্য দর্শকের সারি ছেড়ে মঞ্চে ওঠে এসে, শামীমা, আবেদিন এবং এই কলেজের অধ্যক্ষসহ অন্য কয়েকজনকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলন। আগামী ২২ শ্রাবণ রবিঠাকুরের মৃত্যুদিনে, ঠাকুরের গান, বাচিকশিল্পীর আবৃত্তি, গল্পগুজব, এমনকি ১৯০৮ সালে রবিঠাকুর পাবনা শহরে অনুকূল ঠাকুরের বাড়ির দক্ষিণের পদ্মা পেরিয়ে এসেছিলেন কুঠিপাড়ার বাজিতপুর ঘাটে কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে, উচ্ছ্বসিত ডিসি ভাবি সে কথা, এমনকি তিনি যে একদিন বাচিকশিল্পী ছিলেন, ছিলেন বাংলা বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেটাও জানিয়েছিলেন ২২ শ্রাবণের সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।

ডিসি ভাবির নিমন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল জয়নাল আবেদিন, এমনকি বাংলো থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ডিসি সাহেব অতিথিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বকুলের মালা। যে মালায় ছিল মাদকতা, ছিল তরতাজা প্রাণময়, গন্ধ। ডিসি ভাবি শামীমা আর আবেদিনকে জানিয়েছিলেন, আগামী অক্টোবরে আমরা তোমাদের এই সুন্দর ছিমছাম পাবনা শহর থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় ফিরে যাব, ওর পদোন্নতির খবর পেয়েছি, যাওয়ার আগে আরেক দিন... ডিসি ভাবির কথা আর এগোতে না পারলেও, সবাই বুঝেছিলেন তাঁর অনুরোধের বিষয়। আবেদিন সেদিন ইচ্ছা করেই ডিসি সাহেবের দেওয়া বকুলের মালাটি শামীমাকে হাতে দিয়ে বলেছিল, রাখুন। সেই স্মৃতিময় দিনটির বিকেলের, সন্ধ্যার কথার সঙ্গে রাতবিরাতে এখনো, চেতনে-অবচেতনে পেয়ে থাকেন বৃষ্টির বাতাসে ভেসে আসা একটি মিঠে কড়া গন্ধ, যেমন একটু আগে পেলেন গাজী আদনানের বকুলের মালার গন্ধ। বৃষ্টিতে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, যেন ক্লান্তিতে ক্লান্তিতে ভুলে গেছে তার সৌরভ ছড়াতে। তবু শামীমাকে গলায় পরিয়ে দিতে হয় তৃতীয় মুখটিকে। আর তখনই ফেলে আসা স্মৃতিময় দিনের কথা মনে পড়ে।

দ্বিতীয় মুখটির বাড়ি রাধানগরের এডওয়ার্ড কলেজের উল্টো দিকের যুগীপাড়ায়। ক্রিকেট খেলোয়াড় বাবু ভাইদের বাড়ির তিন-চারটি পরে, মোটর গ্যারেজের দক্ষিণ দিকের  টিনের বাড়ি। শামীমা অনেক আগেই জেনেছিল দ্বিতীয় মুখটি একটি গোপন রাজনীতির দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, আর এই এডওয়ার্ড কলেজেরই চতুর্থ বর্ষের বিশিষ্ট ছাত্রনেতা রিপু বিশ্বাসের ছায়াসঙ্গী। অথচ এই শহরের অনেকেই জানেন, রিপু বিশ্বাস বিখ্যাত নকশাল নেতা, চারু মজুমদারের বিশেষ অনুসারী। চারু মজুমদার একসময় এই কলেজের ছাত্র ছিলেন, ছিলেন অসম্ভব সাহসী। তিনি ছিলেন শ্রেণিশত্রু উত্খাতের প্রথম নায়ক, দুই বাংলায়। এই কলেজের ছাত্রই এরই মধ্যে রিপু বিশ্বাসের উত্সাহেই যোগ দিয়েছিলেন উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময়, গভীর রাতে কলেজের মাঠে ৩০-৩৫ জন ছাত্রকে নিয়ে নাকি চারু মজুমদারের উপস্থিতিতেই গভীর রাত পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা শেষে মজুমদার বাবু বারবার বুঝিয়েছিলেন, শ্রেণিশত্রু খতম না করলে, ধনী, নির্ধনের সমতা এই সমাজে আসবে না, তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের তাঁর নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, একই সঙ্গে শুরু করেছিলেন শ্রেণিশত্রু খতমের।

শামীমার সবই শোনা কথা। তবে স্বচক্ষে দেখা, তাদেরই কলেজের বড় ভাই রিপু বিশ্বাসের সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী দ্বিতীয় মুখটিকে। যে মুখটি দেখলে প্রথম বর্ষের বাংলা অনার্সের ছাত্রীর মনে ভয় জড়িয়ে ধরে। একই সঙ্গে ঘৃণার উদ্রেক হয়, অথচ সব সময়ই ইচ্ছা করে সেই প্রথম মুখটিকে দেখতে। শামীমার যে কেন এমন হয় আমরা কেউই জানি না, জানি তিনি একজন নামকরা বাচিকশিল্পী।

খেঁকশিয়ালি নদীর পশ্চিম পারে যাওয়ার জন্য যে ব্রিজটি দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার দক্ষিণের হাসপাতাল রোডের ওয়াপদা রেস্ট হাউসের পাশে যে হলুদ দোতলা বাড়িটি—সেটি পুরনো হলেও সেই বাড়িটিতে থাকেন গাজী আদনানের শিক্ষক, গাজী আজিজুর রহমান, অধ্যাপক আজিজ, সম্পর্কে আত্মীয় বলেই আদনানকে কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। এমনকি জানিয়ে দিয়েছিলেন, কলেজে পড়ালেখার জন্য যত টাকাই খরচ হোক না কেন, সেটি আমিই বহন করব। শুধু তোর কাজ হচ্ছে পড়ালেখা করা। আদনান খুশি হয়েছিলেন তার আত্মীয়ের আশ্বাস বাণীতে। সেই সঙ্গে তাকে ভর্তি করিয়েছিলেন বাণিজ্য বিভাগে। এমনকি কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে কী করবে কী করবে না, ঠিক তখনই অধ্যাপক আজিজ তাঁর এক স্বজনের ইচ্ছায় একটি কেরানির চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন ব্যাংকের নিরস জীবনে। গাজী আদনানের  মনের ভেতরে এক ধরনের সাদা কাশফুল ফুটে থাকে, তার ওপর দিয়ে শরতের যে বাতাসটুকু দোলা দিয়ে যায়, মাঝে মাঝে, কেরানির মনের ভেতরে দোলা দিয়ে যায় বছরে গোটা তিনেক বোনাস যখন হাতে আসে।

আজ সেই বোনাসের কয়েকটি টাকা দিয়ে শামীমার জন্য বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় মিইয়ে পড়া বকুলের মালা কিনে যখন বাসায় ফিরল, তখনো বৃষ্টি ছিল, ঘরে এসে দেখলেন শামীমা নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে, ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালে, দীর্ঘদিন পরে মালা হাতে পেয়ে, এক মুহূর্তের জন্য তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল প্রথম মুখটির কাছে। পরক্ষণেই মনে হয়েছিল, যদি একবার সেই মুখটি দেখতে পারতাম, অথচ তাকে দেখতে হলো তৃতীয় মুখটি। যে মুখটিতে আজ আনন্দের বন্যা। সেই মুখটি কোনো কিছু না ভেবেই শামীমাকে উষ্ণ চুম্বনে, চুম্বনে জানিয়েছিল তার প্রমোশন হয়েছে। আর তখন শামীমা জানিয়েছিল কয়েক দিন ধরে তার কারণে-অকারণে বমি বমি লাগে, আদনান শেষ চুম্বন দিয়ে জানিয়ে দিল, কালকেই গাইনি ডাক্তারের কাছে যাব।

ঢাকা শহরের উত্তরের দিকে সদ্য গড়ে ওঠা জনপদটির নাম উত্তরা হলেও, এখনো এখানে কোনো সিনেমা হল, থিয়েটার হল গড়ে না উঠলেও, এই এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে অনেক বেশি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। সেসব হাসপাতালের খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, গাইনির একজন ভালো মহিলা ডাক্তার আছেন, তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার দেবহাটাতে। আদনান ও শামীমা উভয়েই স্থির করেছিলেন দেবহাটার গাইনি আপার ওখানেই যাবে, এমনকি, উত্তরার পূর্ব দিকের রেললাইন পেরিয়ে কসাই বাড়ি থেকে দুদিন আগে আদনান গাইনি ডাক্তারের চেম্বারে নিজে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পেয়েছিল শামীমার সিরিয়াল। তবে নম্বরটি মনে রাখার মতো—১৩। তেরো নম্বর, মনে রাখার হেতুটি খুঁজে পেয়ে আদনান খুশিই হয়েছিল, ওই ১৩ তারিখেই তাদের বিয়ে হয়েছিল, আর আজকে সেই ১৩ নম্বর পেয়ে চার বছর পরে, তিনি তখন ভেবেছিলেন তাদের আগত নবজাতকের জন্য এখন থেকেই নিয়মিত ডাক্তার আপার চেম্বারে আসতেই হবে। শামীমা নিজেও দ্বিমত করেনি তৃতীয় মুখের প্রস্তাবে।

যথাসময়ের বেশ অনেকক্ষণ আগেই গাজী আর শামীমাকে আসতে হয়েছিল এবং অপেক্ষার দুহাত ধরে কয়েক ঘণ্টা হাসপাতালেই অপেক্ষা করতে হবে, সেটি, সে কথা, দুজনে জানলেও বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আসতে হয়েছিল ডাক্তার আপার হাসপাতালে। হাসপাতালে যে শামীমাই প্রথম এলো বোধ হয় তা নয়, তারই পাশে বসে থাকা এক দম্পতি আপন মনে গল্প করছিল, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন, কে কাকে আগে দেখেছিল, প্রথম মোবাইলটি কে করেছিল এবং একটি শিউলি মালা...পরের কথাটুকু আর শুনতে ইচ্ছা হয়নি শামীমার। তখনই  সে যেন তার চোখের সামনে দেখতে পেল একটি তরতাজা বকুলের মালা।

১৩ সিরিয়াল আসতে এখনো অনেক দেরি। বাচিকশিল্পী ভাবলেন, সঙ্গে যদি একটি সাপ্তাহিক কিংবা মেয়েদের সেই পত্রিকাটি, যেটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় সেই ‘সানন্দা’ যদি আনতেন, গত সংখ্যায়, একটি খুবই ভালো লেখা ছিল ওপারের এক গাইনি ডাক্তারের। ভদ্রমহিলা খুবই ভালো লিখেছিলেন। সেটি সঙ্গে আনলে অন্ততপক্ষে কিছুটা সময় পত্রিকার পাতায় চোখ উল্টানো যেত অথবা ‘শেষের কবিতার’ সেই প্রিয় কবিতাটি হাজারবার পাঠ করেও কেন যে এখনো ইচ্ছা করে আরো পাঠ করতে। লাবণ্য-অমিত, শোভন লাল, যোগমায়া সবার কথা মনে এলেও—খুব বেশি মনে পড়ে সেই চরণ দুটি। ‘দোহাই তোদের একটুক চুপ কর ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।’ পাশের দম্পতি তখনো ছিলেন তাঁদের অতীত নিয়ে। শামীমার মনে ভীষণ হিংসার ছায়া, বা যাই বলি না কেন, তার মনের দুয়ারে  সে যেন এখনো দেখতে পায়, শুনতে পায়, আবেদিনের, ‘আমার হিয়ার মাঝে’, সত্যি কী সিনিয়র সহপাঠী, কলেজের সেই বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই বাচিকশিল্পীকে দেখেই গানটি করেছিল? মনের প্রশ্ন মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতেই।

একবার ইচ্ছা হলো গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি এডওয়ার্ড কলেজের রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী আবেদিন ভাই, দোলাচলে থাকতে থাকতেই হঠাৎ বমি এসে তাঁকে তার ভাবনারজগৎ থেকে ছিটকে এনে ফেলে দিল বর্তমানের হাতে, তখনই বাচিকশিল্পী শুনতে পেলেন নিজের নাম : হাসপাতালের নার্সের মুখে। এবং সিরিয়াল নম্বর ১৩। আরো শুনতে পেলেন (১৪) শেষ নম্বরে আসবেন মিসেস আবেদিন।

ভাড়া বাসায় ফিরে বাচিকশিল্পী কিছুই খাননি, ডাক্তার আপা জানিয়ে ছিলেন, কনসিপ করেছে, হাঁটা-চলাফেরা সাবধানে করবেন, মাসখানেক পরে আবার আসতে হবে। শামীমা বেগম মাসখানেক, তার পরেও বারকয়েক গিয়েছিলেন ডাক্তার আপার চেম্বারে। প্রথম মুখটির সঙ্গে আর দেখা না হলেও বাচিকশিল্পীকে মনের অগোচরেই বলে যেতে হয়, ‘ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর’।

 



মন্তব্য