kalerkantho


সমাধানের আড়ালেই বড় সমস্যা

২২ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



সমাধানের আড়ালেই বড় সমস্যা

স্বাগত : কষ্ট পাননি তো ভাই! বাদ পড়ার ২৪ ঘণ্টা পর নাটকীয়ভাবে দলে ফেরা মমিনুল হককে কি সে কথাই বলছেন সাব্বির রহমান? তাঁকে বাদ দেওয়ার পেছনে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন বলে খবর। অনুশীলনে সেই হাতুরাও স্বাগত জানিয়েছেন মমিনুলকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বাদ দেওয়ার পরদিনই গণদাবির মুখে ফেরানো হয়েছে মমিনুল হককে। এতে পক্ষ-বিপক্ষের হার-জিত হয়েছে বটে, তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের অভ্যন্তরে বিদ্যমান ভারী পরিবেশের ‘ওজন’ আরো বেড়েছে বলেই খবর।

হেড কোচ বনাম কোর গ্রুপের মধ্যকার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নিষ্পত্তি সহসা হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দল নির্বাচন পদ্ধতি। একজন মমিনুল হক ক্ষতিগ্রস্ত হলেন কি না কিংবা তাঁর সূত্র ধরে সৌম্য সরকারেরও নতুন করে নজরদারিতে পড়ে যাওয়াটাও গত ৪৮ ঘণ্টায় এ দেশের ক্রিকেটীয় ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে নথিভুক্ত করা যায়!

শনিবার রাতে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। এ সাক্ষাতের একমাত্র বিষয় ছিল আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠা বাবদ সাড়ে চার লাখ ডলার প্রাইজমানি বুঝে পাওয়া। সব দেশেই প্রাইজমানি ক্রিকেটাররা পেয়ে থাকেন। সে মতে বিসিবি সভাপতিও চার সিনিয়র ক্রিকেটারকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে বোর্ডকর্তা আর জাতীয় দলের কোর গ্রুপের সভা তো আর সংক্ষিপ্ত হয় না, চলে আসে অন্যান্য বিষয়ও। সেদিন দল ঘোষণার পর থেকেই মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে মমিনুলের বিষয়েও সিনিয়রদের অভিমত জানতে চেয়েছিলেন নাজমুল হাসান। সেখানে একজনই মুখ খুলেছিলেন বলে খবর।

তিনি নাকি বলেছিলেন যে, দলটা ১৫ জনের করে মমিনুলকে রাখলেই ভালো হতো। বাকিরা মৌনতায় সম্মতি জানিয়েছিলেন এবং পরদিন মিডিয়ার সামনে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে বিতর্ক এড়ানোর সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে এটি ‘এনডোর্স’ও করেছেন বোর্ড সভাপতি। মমিনুলকে খেলানোর দিব্যি তো আর কেউ দেয়নি। এমনকি ১৪ জনের দলে ঢুকে পড়া মমিনুল ঢাকা টেস্ট চলাকালে ডাগ আউটে বসে থাকলেও অনাপত্তির ইঙ্গিত সেদিনই দিয়েছেন নাজমুল হাসান। তবে গতকাল নেটে প্রথমেই মমিনুলকে নামিয়ে কোচ কি ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ করলেন কি না, তা নিয়ে ফিসফাস চলছে দলের ভেতরে!

তাতেও শান্তির পতাকা উড়তে দেখা যাচ্ছে না। বরং কোচ বনাম সিনিয়র ক্রিকেটারদের সম্পর্কে টান পড়েছে নতুন করে। দলীয় গণ্ডির বাইরে গিয়ে বোর্ড সভাপতির সঙ্গে সিনিয়র ক্রিকেটারদের দেন-দরবার করার ঘোর বিরোধী হেড কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে। মজার ব্যাপার হলো, প্রধান কোচের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ সিনিয়র ক্রিকেটারদের। নিজের কিংবা নিজেদের পক্ষে ‘রায়’ ঘোষণার জন্য উভয় ‘পক্ষে’র পারস্পরিক দোষারোপ বহুদিনের। তাই মমিনুলকে দলে ফেরানোর আগের দিন বোর্ড সভাপতির সঙ্গে সিনিয়রদের সাক্ষাৎ এবং অভিমত দেওয়ায় হাতুরাসিংহের ক্যাম্পে প্রবল অসন্তোষ। নাজমুল হাসানের এ ‘দুই সংসারে’র পারস্পরিক অবিশ্বাস নিয়ে দলসংশ্লিষ্ট একজন আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন, ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বোর্ড সভাপতি যখন বসেন, তখন মনে হয় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আলাদা করে ডাকলেই একেকজনের অভিযোগের শেষ নেই, কেউ কাউকে মনে হয় বিশ্বাস করে না। ’

অথচ জাতীয় দলের মেরুদণ্ডই সিনিয়র ক্রিকেটাররা, এটা খুব ভালো করেই জানেন হাতুরাসিংহে। আবার এ শ্রীলঙ্কান যে খুব ভালো কোচ, এ নিয়ে সংশয় নেই সিনিয়রদের মনে। তবু অবিশ্বাসের দেয়াল উঠে গেছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। ক্রিকেটারদের অভিযোগ, বোর্ড সভাপতির কাছে কখনো কখনো মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত দেন কোচ। আবার কোচের অভিযোগ, নিজেদের পক্ষে সিদ্ধান্ত টানতে আড়ালে বোর্ড সভাপতির দ্বারস্থ হন সিনিয়র ক্রিকেটাররা। যদিও উন্মুক্ত টিম মিটিংয়েই ছোটখাটো ওই সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলা যেত। অবশ্য টিম মিটিংয়ে ভুলেও কোচের অভিমতের বিরোধিতা নাকি আর করেন না ক্রিকেটাররা। পরিসংখ্যান, যুক্তি-তর্কে কোচকে হারানো যায় না। যদিও-বা কখনো হারের মুখে পড়েন, তখন রাগ দিয়েই নাকি নিজের সিদ্ধান্তকে জিতিয়ে নেন কোচ। আর প্রকাশ্যে হাতুরাসিংহের বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা কারোরই নেই। ভয়, কোচ আবার বোর্ড সভাপতির কান ভারী করে যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন! নাজমুল হাসান যতই সিনিয়রদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলুন, মাশরাফিদের দৃঢ় বিশ্বাস সরাসরি ভোটে জিতবেন হাতুরাসিংহেই।

আরো করুণ অবস্থা নির্বাচক কমিটির বাকি সদস্যদের। দল নির্বাচনী সভা-পূর্ব প্রস্তুতিতে হাতুরাসিংহে এতটাই এগিয়ে থাকেন যে, তাঁর দাবির কাছে নতি স্বীকার করেন বাকিরা। তা ছাড়া সিনিয়র ক্রিকেটারদের মতো তাঁদের মনেও একই ভয়, বাধা দিলেও বোর্ড সভাপতির সম্মতি ঠিকই আদায় করে নেবেন হাতুরাসিংহে। তাই কোনো রকমে মানহানি এড়িয়ে চাকরি করে যাওয়ার পন্থাই অবলম্বন করছেন নির্বাচক কমিটির বাকি সদস্যরা। মমিনুল বিতর্ক এড়াতে ১৫ জনের ফর্মুলা দল নির্বাচনী সভাতেও আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু কোচের ইচ্ছায় সেটি আর হয়নি।

কোচ হঠাৎই কেন এমন মমিনুলবিরোধী হয়ে উঠলেন? এ প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর হাতুরাসিংহের প্রবল বিরোধীদের কাছেও নেই। ‘মিনি’কে কোচ অপছন্দ করেন, এমন কোনো ঘটনা তাদের চোখেও ধরা পড়েনি। তাই বোর্ড সভাপতির কাছে দেওয়া হাতুরাসিংহের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র যুক্তি বলে মনে করছেন তাঁরা। প্রথমত, মমিনুল ইদানীং অফ স্পিনটা খারাপ খেলছেন। আর অস্ট্রেলিয়া দলে নাথান লিয়নের মতো অফ স্পিনার আছেন। দ্বিতীয়ত, মমিনুল স্কোয়াডে থাকলে একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়ে সৌম্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার মেঘও জমতে দিতে চাননি কোচ।

মমিনুলের সূত্র ধরে এভাবেই আতশকাচের নিচে চলে এসেছেন সৌম্য সরকার। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির জেরে কোচের সঙ্গে মমিনুলের সম্পর্কও যেমন খুঁটিয়ে দেখবেন সবাই। এ দুজন তো বটেই, দেশের ক্রিকেটের জন্যও এর কোনোটিই কাম্য নয়। অথচ এ পরিস্থিতির জন্য তাঁদের দুজনের কোনো দায়ই নেই। কোচ বনাম সিনিয়র এবং প্রশ্নবিদ্ধ দল নির্বাচনী পদ্ধতি মিলিয়ে সিরিজের আগেই যেন কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ দল।

অবশ্য ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় নিয়েই নাকি সেরা ক্রিকেটটা খেলে বাংলাদেশ দল; নিরাশার রাজ্যে আশার আলো তাই জ্বলছেও!


মন্তব্য