kalerkantho


আগুনের জবাব আগুন দিয়ে দিত লারা

নোমান মোহাম্মদ, ব্লুমফন্টেইন থেকে   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আগুনের জবাব আগুন দিয়ে দিত লারা

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ম্যাচেই নিজ সামর্থ্যের স্বাক্ষর রাখেন আপনি। ভারতের বিপক্ষে পান ৫ উইকেট।

দল হেরে গেলেও শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে যুগ্মভাবে হন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। এটি কতটা স্মরণীয়?

অ্যালান ডোনাল্ড : কপিল দেব, শচীন টেন্ডুলকার, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, রবি শাস্ত্রী—কত বড় বড় নাম প্রতিপক্ষে! আর আমাদের তো তখন কেউ চেনেই না। ওদের বিপক্ষে খেলাই তাই ছিল বিরাট ব্যাপার। আর হ্যাঁ, নিজের সামর্থ্যে আস্থা থাকার কথা আগে বলেছি বটে। তবু ফ্রি স্টেট কিংবা ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ভালো করা এক ব্যাপার আর দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করা ভিন্ন ব্যাপার। সেখানে প্রথম ম্যাচেই যখন ৫ উইকেট পাই, আউট করি টেন্ডুলকার, সিধু, শাস্ত্রীর মতো ব্যাটসম্যানদের—এটি আমার পথচলাটা সহজ করে দেয়। ম্যাচে আমরা হারি সম্ভবত ৩ উইকেটে। আর ওদের ৭ উইকেটের মধ্যে ৫টিই নিই আমি। এ কারণে হয়তো ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার থেকে আমাকে বাদ দিতে পারেনি (হাসি)।

প্রশ্ন : শুরুর দিকের দক্ষিণ আফ্রিকা দলে বেশ কয়েকজন ছিলেন, যাঁরা আফ্রিকানস ভাষায় কথা বলতেন। আপনি, হ্যান্সি ক্রনিয়ে, ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্স। তা কতটা সাহায্য করেছে?

ডোনাল্ড : খুব। আর শুধু ভাষার কথা বলছেন কেন, দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার আগেই আমরা তো একে অন্যকে চিনতাম আট-দশ বছর ধরে। আরো বেশিই হবে। হ্যান্সির সঙ্গে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কত ম্যাচ খেলেছি! আর ফ্রি স্টেটের হয়ে আরো অনেক বেশি। এমনিতেই আমরা সবাই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। ভাষাটা আফ্রিকানস বলে ঘনিষ্ঠতা হয়তো আরেকটু বেড়েছে। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো তখন আমাদের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। একসঙ্গে বেড়ে ওঠার কারণে সেই সময়টার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়েছে।

প্রশ্ন : এবার একটু কঠিন জায়গায় আসি। মাইকেল আথারটনের সঙ্গে আপনার ট্রেন্টব্রিজের সেই মহাকাব্যিক দ্বৈরথ...

ডোনাল্ড : এটিকে কঠিন বলছেন কেন? তা ছিল ভীষণ উপভোগ্য। বলতে পারেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার সবচেয়ে উপভোগ্য ৪৫ মিনিট। ওই স্পেলটায় ভীষণ জোরে বোলিং করেছি। একের পর এক বাউন্সার দিয়ে গেছি। মাইকেল সব ছেড়ে দিয়েছে কিংবা নিজের গায়ে নিয়েছে; কিন্তু আত্মসমর্পণ করেনি। এখনো লোকে আমাদের দুজনের সেই লড়াইয়ের কথা বলে। ইউটিউবে গিয়ে তা দেখে। অবশ্য ওকে আমি একবার আউট করেছিলাম। আম্পায়ার তা দেননি; মাইকেলও ‘ওয়াক’ করেনি।

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার দেখা সবচেয়ে কঠিন ব্যাটসম্যান কি আথারটনই?

ডোনাল্ড : ও অসাধারণ ব্যাটসম্যান; নিজের উইকেটের মূল্য বুঝত খুব ভালোভাবে। তবে শুধু মাইকেলের কথা বললে চলবে না। অবশ্যই ব্রায়ান লারার কথা বলতে হবে। আগুনের জবাব আগুন দিয়ে দিত লারা। বলতে হবে শচীন টেন্ডুলকারের নামও। অসাধারণ ব্যাটসম্যান। আর ওয়াহ ভাইরাও দুর্দান্ত। বিশেষত স্টিভ ওয়াহকে আউট করা ছিল আথারটনকে আউট করার মতোই কঠিন।

প্রশ্ন : আরেকটি কঠিন প্রশ্ন। এটি হয়তো সত্যিই কঠিন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ল্যান্স ক্লুজনারের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝির সেই রান আউট প্রসঙ্গে। এরপর প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন আপনি। দক্ষিণ আফ্রিকার এক সংবাদপত্রে তো এমন শিরোনামও দেওয়া হয়, ‘ডোনাল্ড, তুমি আর দেশে ফিরো না। ’ ভোলেননি নিশ্চয়ই?

ডোনাল্ড : কিন্তু সবাই ভুলে গেছে, ওই ম্যাচে ২৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট পেয়েছি আমি (আসলে ১০ ওভারে ৩২ রান দিয়ে ৪ উইকেট)। কেউ তা মনে রাখেনি। সবাই মনে রেখেছে রান আউটটা। স্বীকার করছি, আমার ভুল হয়ে গেছে। দর্শকের চিৎকারের কারণে ‘কল’ ঠিকমতো শুনতে পাইনি। তার মানে তো এই না, ওই একটি ঘটনায় আমার ক্যারিয়ারের সব অর্জন মুছে যাবে। তার মানে তো এই না, সংবাদপত্রে অমন শিরোনাম হবে। তার মানে তো এই না, আমার দক্ষিণ আফ্রিকা আর ইংল্যান্ডের বাড়ির ঠিকানায় ভীষণ আজেবাজে ভাষায় লেখা ভূরি ভূরি চিঠি আসবে। এটা আমার প্রাপ্য না। ওই রান আউটের পরিপ্রেক্ষিতে যে নিষ্ঠুরতার শিকার আমি হয়েছি, ক্রিকেট খেলার চেতনার সঙ্গে তা একেবারেই যায় না।

প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক সেরা ব্যাটসম্যানদের কথা বলছিলেন। সেরা বোলার?

ডোনাল্ড : আমি অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের খুব ভক্ত। গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি, ব্রেট লির। বিশেষ করে ব্রেট লি। উফ, ওর ফাস্ট বোলিং দেখাটা ছিল ভীষণ উপভোগ্য।

প্রশ্ন : আর নিজের সেরা বোলিং পার্টনার?

ডোনাল্ড : অবশ্যই শন পোলক। ওর নামটিও আগের প্রশ্নের সেরা বোলারদের মধ্যে যোগ করে দেবেন। আমাদের দুজনের জুটি ছিল দারুণ। জানতাম, ব্যাটসম্যানদের কখন কিভাবে চাপ দিতে হবে। এক দিক থেকে শন হয়তো রান আটকে রাখল, আমি আরেক দিক থেকে এসে উইকেট নিলাম। আবার উল্টোটাও হতো। কখনো শন আক্রমণাত্মক, আমি একটু রক্ষণাত্মক। আবার কখনো কখনো দুজনই আগ্রাসী হয়ে উঠতাম। শনের সঙ্গে বোলিংয়ের মজাই অন্য রকম। খুব বুদ্ধি খাটিয়ে বোলিং করত।

প্রশ্ন : এখন আর আপনাদের মতো, মানে আশি-নব্বইয়ের দশকের মতো ফাস্ট বোলার কেন নেই ক্রিকেটবিশ্বে?

ডোনাল্ড : ফাস্ট বোলিংটা মরে যাওয়া এক শিল্পের মতো হয়ে গেছে। যা দেখে আমার খুব দুঃখ লাগে। ক্রিকেটে জোরে বোলিং করার চেয়ে আনন্দ আর কিসে হতে পারে? ব্যাটসম্যানরা হয়তো ভালো একটি কাভার ড্রাইভ করার কথা বলবেন। কিংবা বাউন্সারে হুক করার কথা। আমি মনে করি, ক্রিকেট খেলাটি খুব বেশি ব্যাটিংবান্ধব হয়ে গেছে। ওয়ানডের কারণে ততটা না, কারণ আমরাও ওয়ানডে খেলতাম। কিন্তু এখনকার টি-টোয়েন্টির কারণে ফাস্ট বোলিংটা কেউ করতে চায় না। আর ওই এক ম্যাচে চার ওভার বোলিং করে ফাস্ট বোলার হওয়া যায় নাকি?

প্রশ্ন : আপনার নিজের সেরা বোলিং বলবেন কোনটিকে?

ডোনাল্ড : সবচেয়ে উপভোগ্য আথারটনের বিপক্ষে ট্রেন্টব্রিজের সেই স্পেলটি। তবে সেরা হিসেবে নির্দিষ্ট কোনোটির কথা বলতে চাই না। বরং ভারত, পাকিস্তানে গিয়ে আমরা যে টেস্ট সিরিজ জিতেছি, ওগুলোর কথা বলব আলাদা করে। কারণ উপমহাদেশে গিয়ে টেস্ট সিরিজ জেতা সবচেয়ে কঠিন। আমরা তা করেছি। কোনো কোনো ম্যাচে আমার উইকেট কলামে হয়তো লেখা ‘২’ বা ‘৩’—কিন্তু দলের সামগ্রিক অর্জনের হিসাবে সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড়।

প্রশ্ন : শেষ দিকে চলে এসেছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট কি অনুসরণ করেন?

ডোনাল্ড : বল ধরে ধরে দেখা হয় না, তবে বাংলাদেশের উন্নতির খবর রাখি। এই তো কিছুদিন আগেই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে খেলল আপনার দেশ। ভালো দল, অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার রয়েছে।

প্রশ্ন : সেই দলটির দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের পারফরম্যান্স দেখে হতাশ নিশ্চয়ই?

ডোনাল্ড : কিছুটা। আমি তো বাংলাদেশ দলের ভেতরের খবর রাখি না। তবে মাঠের খেলা দেখে মনে হয়েছে, সাকিবের না থাকার প্রভাব পড়েছে প্রবলভাবে। ও দলের সেরা খেলোয়াড়; পারফরম্যান্সের কারণে মাঠের নেতা। এমন একজন যখন দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন এক সফরে দলের সঙ্গে থাকে না, তখন এর প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। তবে আমি মনে করি, ওয়ানডেতে ভালোভাবে ফিরে আসার সামর্থ্য এই বাংলাদেশ দলের রয়েছে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন হ্যান্সি ক্রনিয়েকে নিয়ে। তাঁকে কিভাবে মনে রেখেছেন?

ডোনাল্ড : হ্যান্সি আমার ভাই। ছোটবেলা থেকে আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি কত কত ম্যাচে! ওর অধিনায়কত্বে জাতীয় দলেও খেলেছি অনেক ম্যাচ। আমার দেখা অন্যতম সেরা অধিনায়ক ও। পরে হ্যান্সি একটি ভুল করে ফেলেছে। বিরাট ভুল। কিন্তু ওই যে বললাম, ও আমার ভাই। ভাইয়ের ভুল ক্ষমা করে দেওয়া যায়। আমিও হ্যান্সিকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

প্রশ্ন : তাঁকে মিস করেন এখনো?

ডোনাল্ড : খুব। ও যে এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে, এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে—কিছুতেই ভাবতে পারিনি। তবে একটি কথা, হ্যান্সি কিন্তু আমার সঙ্গে সব সময় আছে। ৩০০তম টেস্ট উইকেট পাই যখন ব্লুমফন্টেইনে, এর কিছুদিন আগেই তো ওই কেলেঙ্কারির সঙ্গে ওর নাম জড়িয়ে যায়। কিন্তু আমি উইকেট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকিয়েছি মিড অফের দিকে; যেখানে হ্যান্সি দাঁড়াত। এখনো যখন আমি ব্লুমফন্টেইনে যাই, গ্রে কলেজের পাশ দিয়ে গাড়ি চালাই কিংবা থাকি ম্যানগাউং ওভালে—সব জায়গাতেই হ্যান্সিকে দেখতে পাই। ও আমার সঙ্গেই আছে।


মন্তব্য