kalerkantho


মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর দায় ফুটবলের!

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর দায় ফুটবলের!

আইরিশ রকব্যান্ড ‘ইউ টু’র কনসার্ট পিছিয়ে গিয়েছিল দুই ঘণ্টা। কারণ কনসার্ট শুরুর নির্ধারিত সময়ে যে পুরো বুয়েনস এইরেস থেমে ছিল।

ভেন্যু লা প্লাতা স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনেই চোখ আটকে ছিল কনসার্ট দেখতে যাওয়া দর্শকদের। উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা নিয়ে পুরো আর্জেন্টিনার চোখই তখন সাঁটা ছিল টেলিভিশনে। ২০১৮-র রাশিয়া বিশ্বকাপে তারা যাচ্ছে কি যাচ্ছে না, তা নিয়ে দোলাচলের মধ্যে ইকুয়েডরের কিটোতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ‘আলবিসেলেস্তে’দের ভাগ্য নির্ধারণী ম্যাচের শুরু। শুরুতেই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার ঘটনায় আশঙ্কাও বেড়ে চলছিল। কিন্তু শেষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকে ৩-১ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ-ভাগ্য লেখা লিওনেল মেসি নামের এক খুদে জাদুকর ভক্তদের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার স্বস্তিও এনে দিলেন। তাই ‘ইউ টু’-ও দুই ঘণ্টা বিলম্বে মঞ্চে উঠতে পারল। যখন উঠল, তখন উত্সবের রঙে রঙিন হয়ে গেছে গোটা আর্জেন্টিনাও।

অথচ রাশিয়া বিশ্বকাপে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইতিহাস-পরিসংখ্যানও যেন আর্জেন্টিনাকে বিদায় দিতে তৈরি ছিল। ২০০১ সালের পর কখনোই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে ৯ হাজার ফুট উচ্চতার কিটোতে জেতার নজির ছিল না দুইবারের বিশ্বকাপজয়ীদের।

এর ওপর গত নভেম্বরের পর থেকে কোনো অফিশিয়াল ম্যাচে মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার আর কারো গোল করতে না পারার ব্যাপারটিও মাঠে নামার আগেই তাদের কম রক্তাক্ত করছিল না। পরিবেশ-পরিস্থিতি যখন বিপক্ষে, তখন ম্যাচের প্রথম মিনিটেই গোল হজম করা যেন স্রোতের প্রতিকূলে বৈঠা বাওয়ার চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছিল আরো। কিন্তু মেসি সেই স্রোত কেটেই বিশ্বকাপের তীরে নিয়ে ভেড়ালেন আর্জেন্টিনাকে। আর তা এমনই ঐশ্বরিক ক্ষমতায় যে বুয়েনস এইরেসের বারে বসে খেলা দেখা মার্কো মুরাস নামের ২৮ বছর বয়সী এক ব্রাজিলিয়ানকেও সম্মোহিত করে ফেলল, ‘ও অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। সে কিছুতেই এই গ্রহের নয়। ’

এ কথা বহু বছর থেকেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে শোনা যাচ্ছে। বারবারই এর প্রমাণ দিয়ে যাওয়া মেসি সেটি আরেকবার প্রমাণ করলেন দলের বিপন্ন অবস্থায়। খাদের কিনার থেকে দলকে নিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট কাটার পর তাঁকে চূড়ান্ত এক স্বীকৃতি দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হলেন না মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ হাভিয়ের মাসচেরানো, ‘লিও আরেকবার দেখাল যে ও-ই হচ্ছে এই খেলাটার বস। ’ এর আগে চিলি এবং স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার কোচ থাকার সময় মেসিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছেন হোর্হে সাম্পাওলি। তখনো এই বিশ্বসেরা ফুটবলারের গুণমুগ্ধ আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচের ভাষ্য এখন আরো বেশি স্তুতিময়। ম্যাচের পর জানিয়েছেন পুরো দলকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তিনি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর দলের সেরা অস্ত্রকেই, “আমি ছেলেদের বলেছিলাম, ‘মেসির কাছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ পাওনা নেই। উল্টো মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর দায় ফুটবলের!’ রাশিয়াতে সেটি সম্ভব করার ক্ষেত্রে ওকে সাহায্য করার একটি সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। ” মেসিকে ছাড়া বিশ্বকাপ অপূর্ণ থেকে যেত বলেও মনে করেন সাম্পাওলি, ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসরটিতেই মেসি না থাকলে তা হতো খুব অযৌক্তিক একটি ব্যাপার। ও ফুটবল ইতিহাসেরই সেরা খেলোয়াড়। এটা খেলোয়াড়দের সাফল্য। আমি ছেলেদের বলেছিলাম মেসিকে বিশ্বকাপে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। সৌভাগ্যক্রমে সেটি ঘটেছেও। ’ আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটি মেসি যেন তুলে নিয়েছিলেন তাঁর একার কাঁধেই। সতীর্থ আনহেল দি মারিয়ার কথায় সেটিই বোঝায়, ‘ও বিস্ময়কর। অনেক, অনেক ব্যবধানে ও বিশ্বসেরা। ওর জন্যই আর্জেন্টিনা এখন বিশ্বকাপে। ’ সতীর্থের কীর্তিতে বিশ্বকাপে পা রাখার আনন্দে গৌরবও মিশেছিল। গোলরক্ষক সের্হিয়ো রোমেরো যেমন বলছিলেন, ‘যখনই প্রয়োজন পড়বে, তখনই ও নিজেকে মেলে ধরবে। ও-ই আমাদের বিশ্বকাপে নিয়ে গেল এবং সেটি যথারীতি দুর্দান্ত ফুটবল খেলে। আমি এই ভেবে গর্বিত যে ও একজন আর্জেন্টাইন। ’ যদিও আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মেসি সতীর্থদের তুলনায় ছিলেন অনেক বেশি নির্লিপ্ত। সেটি খুব স্বাভাবিকও। কারণ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের বাধা পার হওয়া তো আর তাঁর মানদণ্ড নয়। তাঁর মতে, ‘এই জয় থেকেই বিশ্বকাপে বড় কিছুর স্বপ্নে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করবে আর্জেন্টিনা, ‘আর্জেন্টিনাকে ছাড়া বিশ্বকাপকে ঠিক স্বাভাবিক দেখাত না। এই দলটির তাই বিশ্বকাপে না খেলাটা ঠিক হতো না। এখন থেকে দলটা বদলাবে এবং আরো বেশি সুসংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করবে। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং আমরা এখন বিশ্বকাপে। ’

ইতিহাসের সেরা ফুটবলারকে নিয়েই রাশিয়ায় যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। এএফপি, মার্কা, ডেইলি মেইল


মন্তব্য