kalerkantho


আমি রেকর্ডের জন্য কখনো ক্রিকেট খেলিনি

নোমান মোহাম্মদ, ব্লুমফন্টেইন থেকে   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আমি রেকর্ডের জন্য কখনো ক্রিকেট খেলিনি

প্রশ্ন : কেপটাউনের ভেনবার্গ বয়েজ হাই স্কুলে থাকার সময়ই আপনার ক্রিকেটে হাতেখড়ি। পরে ২০১০ সালে ওই স্কুলের ক্রিকেট মাঠের নামকরণ হয় ‘জ্যাক ক্যালিস ওভাল’।

এটি কতটা গর্বের?

জ্যাক ক্যালিস : অবশ্যই দারুণ অনুভূতি। আমি ওই মাঠে ক্রিকেট খেলে খেলে বেড়ে উঠেছি। ওখানে অনেক স্মৃতি। সেই মাঠটির নামকরণ আমার নামে করায় স্কুলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সেখানে এখনো ছোট ছোট বাচ্চা খেলে। ওরা স্বপ্ন দেখে, ভবিষ্যতে জাতীয় দলে খেলবে। তো, মাঠের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে আছে বলে ওদের স্বপ্নের জায়গাটি হয়তো আরো বড় হয়। এটি সত্যি আমার জন্য ভালো লাগার বিষয়।

প্রশ্ন : স্কুলে তো রাগবিও খেলতেন।

ছিলেন ফ্লাই হাফ। ক্রিকেটে এলেন কিভাবে?

ক্যালিস : রাগবি ও ক্রিকেট একসঙ্গে খেলেছি। হাই স্কুলেও দুটি খেলা চালাই পুরোদমে। কিন্তু পরে দেখলাম, ক্রিকেটে রান করছি অনেক বেশি, উইকেটও পাচ্ছি। রাগবির সাফল্য ততটা না। আর শারীরিক সামর্থ্যের বেলায়ও ক্রিকেটটা অনেক সহজ। সে কারণেই ক্রিকেট বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : এটা কি সত্য যে শারীরিকভাবে ছোটখাটো থাকার কারণে আপনি ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে বাদ পড়েছিলেন?

ক্যালিস : এখনকার আমাকে দেখে সেটি বিশ্বাস করা কঠিন, তাইতো? কিন্তু ঘটনা সত্য। স্কুলে বেশ ছোটখাটোই ছিলাম। পরের দিকে বেড়ে উঠি দ্রুত। ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের ওই অনূর্ধ্ব-১৫ দলে খেলার যোগ্যতা আমার ছিল। ব্যাটিং-বোলিং বিবেচনায় সে কথা বলছি। কিন্তু আমাকে বাদ দেয়, কারণ ছোটখাটো হওয়ার কারণে আমি নাকি স্কয়ার শট খেলতে পারব না।

প্রশ্ন : পরে অবশ্য সব ধরনের শটেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তা-ও একেবারে ক্রিকেট ব্যাকরণ মেনে। এই ব্যাকরণ মেনে ব্যাটিংয়ের ব্যাপারটি কি ছোটবেলা থেকেই?

ক্যালিস : আমি ভাগ্যবান যে স্কুলে খুব ভালো কিছু কোচের অধীনে ছিলাম। তাঁরা ওই ব্যাকরণসম্মত ব্যাটিংটাই শেখান আমাকে। পরে ডানকান ফ্লেচার, বব উলমারের কাছেও শিখেছি অনেক। আর আমার বাবারও বড় প্রভাব ছিল। আসলে তরুণ বয়সে সঠিক টেকনিক শেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি তো সারা জীবন আপনার সঙ্গে থেকে যাবে। আমার সেই শেখার শুরুটা ভালো হয় বলেই হয়তো অমন ব্যাকরণ মেনে ব্যাটিং করতে পারতাম।

প্রশ্ন : বাবা হেনরি তো আপনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন খুব। তাঁর প্রভাবের কথা বলছিলেন। সেটা কতটা?

ক্যালিস : অনেক। পারিবারিকভাবে আমরা সবাই খুব ঘনিষ্ঠ। সবাই সবাইকে সমর্থন দিই। সেটি ভালো সময়ে যেমন, তেমনি খারাপ সময়েও। হ্যাঁ, আমার ওপর বাবার অনেক প্রভাব। কত কত বল যে ছুড়ে মেরেছেন নেটে! বাবার মৃত্যু মেনে নেওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। ওনার যখন ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন বয়স ছিল ৬৫ বছর। বাবার সম্মানে ইংল্যান্ডের এক ওয়ানডে টুর্নামেন্টে ৬৫ নম্বর জার্সি পরি আমি। এর কিছুদিন পর তো মারাই গেলেন।

প্রশ্ন : আপনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু ভালো হয়নি মোটেই। প্রথম পাঁচ টেস্টের সাত ইনিংসে দুই অঙ্কে পৌঁছেন মাত্র একবার। মোট রান ৫৭, গড় ৮.১৪। সময়টা কত কঠিন ছিল?

ক্যালিস : এখন পেছন ফিরে তাকালে তো মনে হয়, ভালোই হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যে সহজ না, তা দ্রুত বুঝে যাই আমি। তখন আরো বেশি চেষ্টা করেছি; পরিশ্রম করেছি। হাল ছাড়িনি কিছুতেই। সে কারণে হয়তো সাফল্য পেয়েছি পরবর্তী সময়ে।

প্রশ্ন : আর সেটিও কেমন সাফল্য! শুধু টেস্টের কথাই যদি ধরি, ১৬৬ ম্যাচে ৫৫.৩৭ গড়ে ৪৫ সেঞ্চুরিতে ১৩২৮৯ রান। পাশাপাশি বোলিংয়ে ৩২.৬৫ গড়ে ২৯২ উইকেট। রেকর্ড বিবেচনায় সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার আপনি। নিজেও কি তা মনে করেন?

ক্যালিস : না। দেখুন, আমি রেকর্ডের জন্য কখনো ক্রিকেট খেলিনি। খেলেছি ভালোবাসার কারণে। আর সর্বকালের সেরা কিভাবে নির্ধারণ করবেন? এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের ক্রিকেটারদের তুলনা করা যায় না কিছুতেই। আমি ভাগ্যবান যে এমন একটা সময়ে খেলেছি, যখন প্রচুর আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছে। আমাদের আগের অনেক প্রজন্মই তো এই সুযোগ পায়নি। তবে লোকে যে আমাকে সেরা অলরাউন্ডারদের মধ্যে রাখে, তা জেনে ভালো লাগে।

প্রশ্ন : সেখানে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন গ্যারি সোবার্স এবং আশির দশকের ওই অলরাউন্ডার চতুষ্টয়—ইমরান খান, কপিল দেব, রিচার্ড হ্যাডলি ও ইয়ান বোথাম। তাঁদের কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ক্যালিস : সবাই গ্রেট অলরাউন্ডার। তাঁদের নিজেদের সময়ে সামর্থ্যের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন। ক্রিকেট ইতিহাসে প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে আলাদা জায়গা। স্যার গ্যারি ছিলেন অবিশ্বাস্য এক ক্রিকেটার। অন্য যে চার অলরাউন্ডারের কথা বললেন, তাঁরাও নিজ নিজ সময়ে নিজ নিজ দলে অবদান রেখেছেন অনেক। আমাকে যে তাঁদের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে রাখা হয়, এতে আমি গর্বিত খুব।

প্রশ্ন : কিন্তু শুধু যদি পরিসংখ্যানের কথা বলি তাহলে কি মনে হয়, আপনার ব্যাটিং-বোলিংয়ের রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা সম্ভব?

ক্যালিস : আমি তো মনে করি, খুবই সম্ভব। যত সময় যাচ্ছে, তত বেশি ম্যাচ খেলা হচ্ছে। আগের প্রজন্মের চেয়ে আমরা বেশি ম্যাচ খেলেছি। আমাদের চেয়ে এখনকার প্রজন্ম আরো বেশি। তাতে করে রান করার, উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনার জায়গা বড় হচ্ছে। আমি তাই মনে করি, অবশ্যই কারো না কারো পক্ষে আমার রান, আমার উইকেট পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন : নিজের সেরা ইনিংস কোনটি?

ক্যালিস : প্রথম সেঞ্চুরির কথা বলব। মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ইনিংস। ওই যে ক্যারিয়ার শুরুর পরিসংখ্যান দিলেন একটু আগে, সে কারণে দলে তখন আমার জায়গাটি নড়বড়ে হয়ে যায়। মেলবোর্নের সেঞ্চুরির পর থিতু হই জাতীয় দলে। আর আমাকেও তা আত্মবিশ্বাস দেয় যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করতে পারব। এ কারণে ওই ইনিংসটি সেরা।

প্রশ্ন : আর শেষ টেস্টের শেষ সেঞ্চুরিটি?

ক্যালিস : এটিও বিশেষ কিছু। এর চেয়ে ভালোভাবে তো আমি ক্যারিয়ার শেষ করতে পারতাম না।

প্রশ্ন : নিজের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স?

ক্যালিস : (একটু চিন্তা করে) হয়তো হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে ৬ উইকেট পেয়েছিলাম, সেটি। শন পোলক ইনজুরিতে পড়ে যায় বলে ওই টেস্ট খেলতে পারেনি। আমাকে তখন নিতে হয় বাড়তি দায়িত্ব। ওই কঠিন সময়ে দলের জন্য অবদান রাখতে পারায় তৃপ্তি আছে।

প্রশ্ন : কিন্তু টেস্ট উইকেট সংখ্যা যে ৩০০-র মাইলফলকের চেয়ে মাত্র ৮ উইকেট দূরত্বে থেমে গেছে, এ জন্য কোনো অতৃপ্তি নেই?

ক্যালিস : না, মোটেই না। রেকর্ডের জন্য যে কখনো ক্রিকেট খেলিনি, তা আগেই বলেছি। ৩০০ উইকেট পেলে ভালো লাগত। কিন্তু ২৯২-ও তো কম না।

প্রশ্ন : আপনার সমকালের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার হিসেবে কাদের নাম বলবেন?

ক্যালিস : ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্রায়ান লারা। ও নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যাটসম্যান। আর বোলারদের মধ্যে সিমার হিসেবে ওয়াসিম আকরাম আর স্পিনার হিসেবে শেন ওয়ার্ন।

প্রশ্ন : সেরা অধিনায়ক?

ক্যালিস : হ্যান্সি ক্রনিয়ে। গ্রায়েম স্মিথের রেকর্ডও খুব ভালো। তবে আমি হ্যান্সির কথাই বলব।

প্রশ্ন : তাঁকে কিভাবে মনে রেখেছেন?

ক্যালিস : এটি খুব দুঃখজনক যে হ্যান্সিকে লোকে মনে রেখেছে ওই ভুলের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে ওর অবদানের কথা সেভাবে কেউ বলে না। হ্যান্সি না হয় একটি ভুল করে ফেলেছে। আর সেটি তো স্বীকারও করেছে। মেনে নিয়েছে শাস্তি। যে যা-ই বলুক, আমি হ্যান্সিকে মনে রেখেছি ক্রিকেট দিয়ে দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ওর অবদানের জন্য।

প্রশ্ন : পাওয়ার হিটার হিসেবে আপনার তেমন সুনাম ছিল না। কিন্তু টেস্টে সর্বোচ্চ ছক্কা সংখ্যায় ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ক্রিস গেইলের পরই আপনার ৯৭টি। এটি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ক্যালিস : কখন এবং কিভাবে আপনি আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলবেন, তার ওপর সব কিছু নির্ভর করে। কখনো সময় থাকে রক্ষণাত্মক হওয়ার, কখনো সময় আক্রমণাত্মক হওয়ার। ম্যাচের ঠিক ওই পরিস্থিতিতে দল কী চায়, তা আমার কাছে মুখ্য। সেভাবেই খেলতে চেয়েছি। আর জিততে চেয়েছি সব সময়। কারণ আমি খুব ‘ব্যাড লুজার’। হারটা কখনো মেনে নিতে পারতাম না, তা যে দলের বিপক্ষেই হোক।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট প্রচুর টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। আপনার মতো যথার্থ ব্যাকরণ মেনে চলা ব্যাটসম্যানের জন্য ওখানে মানিয়ে নেওয়াটা কঠিন ছিল না?

ক্যালিস : আমি তো উপভোগ করেছি খুব। এমনও মনে করি, এই টি-টোয়েন্টি আমার ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। ওখানে খেলে খেলেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দিকে আরো আক্রমণাত্মক, আরো ইতিবাচক ব্যাটিং করেছি। হ্যাঁ, আনন্দ নিয়েই খেলেছি টি-টোয়েন্টি।

প্রশ্ন : বিফস্টেকও নাকি খান খুব আনন্দ নিয়ে?

ক্যালিস : উফ্, এটি আমার প্রিয় খাবার। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রচুর খাই।

প্রশ্ন : ওয়াইনও তো পছন্দ! নইলে তো মার্ক বাউচারের সঙ্গে মিলে নিজস্ব ব্র্যান্ডের ওয়াইন বাজারে আনতেন না?

ক্যালিস : হ্যাঁ, আমাদের ওয়াইনের নাম ‘দ্য ইনিংস’। কয়েক বছর আগে তা বাজারে আনি। দুজনের বন্ধুত্ব বেশ গভীর তো; ভাবলাম দেখি মাঠের বাইরে কিছু করা যায় কি না। মার্ক এখন প্রিটোরিয়ায় থাকে; টাইটানসের কোচ। কিন্তু ওর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে বেশ।

প্রশ্ন : আপনার ‘হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট’ করা নিয়েও নাকি বাউচার মজা করেন খুব?

ক্যালিস : বললাম না, আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নিজেদের মধ্যে অমন অনেক কিছুই হয়। হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করার পর গাড়ি নিয়ে ছোট্ট এক দুর্ঘটনায় পড়ি আমি। মার্ক বলে বসে, আমার চুল চোখের ওপর এসে পড়ার কারণেই নাকি সামনের কিছু দেখতে পাইনি। তাই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভালোই মজা করেছে।

প্রশ্ন : একেবারে শেষ পর্যায়ে জানতে চাই, বাংলাদেশ দলের খেলা কি দেখা হয়?

ক্যালিস : আমার আসলে ক্রিকেট দেখার মতো খুব বেশি সময় নেই। তবে কিছু কিছু খবর রাখি। ঘরের মাঠে ওরা দুর্দান্ত দল। এখন বিদেশে ভালো করার চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন : সাকিব আল হাসান তো আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সে আপনার সঙ্গে খেলেছেন অনেক দিন। তাঁকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ক্যালিস : সাকিব দারুণ খেলোয়াড়। বিশেষত ধীরগতির নিচু বাউন্সের উপমহাদেশীয় উইকেটে ও ভীষণ কার্যকর বোলার। খুব চতুরও। আর ব্যাটিংয়ে সাকিব আক্রমণাত্মক ধাঁচের। বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় খেলোয়াড় ও।


মন্তব্য