kalerkantho


ক্রনিয়ের পুরো ব্যাপারটি আমরা কখনোই জানব না

নোমান মোহাম্মদ, ইস্ট লন্ডন থেকে   

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ক্রনিয়ের পুরো ব্যাপারটি আমরা কখনোই জানব না

প্রশ্ন : হ্যান্সি ক্রনিয়ের মতো আপনিও গ্রে কলেজের ছাত্র। ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠায় ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবদান নিশ্চয়ই অনেক?

নিকি বোয়ে : বলে বোঝানো যাবে না—এত বেশি।

এখানকার স্কুল দলে ঢুকতে পারলে দেশসেরা স্কুলগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাবেন। আর এখনকার দিনে তো বিদেশেও খেলতে যাওয়ার সুযোগ থাকে। অবশ্যই গ্রে আমাকে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলায় বড় ভূমিকা রেখেছে। আর হ্যান্সি ছিলেন আমার চার বছরের সিনিয়র। উনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৮৭ সালে; আমি ১৯৯১ সালে। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। আমার মা-বাবার সঙ্গে ওর মা-বাবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।

প্রশ্ন : আপনি তো স্কুল পর্যায়ে রাগবি এবং টেনিসও খেলেছেন?

বোয়ে : খেলেছি, কিন্তু ক্রিকেট সব সময় আমার প্রথম পছন্দ ছিল।

প্রশ্ন : দক্ষিণ আফ্রিকা স্কুল ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন।

তা কতটা গর্বের?

বোয়ে : ওই বয়সে এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে! পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলগুলো নিয়ে একটি দল, আমি সে দলের অধিনায়ক। এটি ১৯৯১ সালের কথা। সে দলে আমার অধীনে আরেকজন খেলেছেন, যার নাম শুনলে হয়তো একটু চমকে যাবেন। শন পোলক।

প্রশ্ন : আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনদের সবাই বিভিন্ন খেলায় ফ্রি স্টেটের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আপনার খেলাধুলায় আগ্রহের পেছনে তা বড় ভূমিকা রেখেছে নিশ্চয়ই?

বোয়ে : ঠিক বলেছেন। ফ্রি স্টেট প্রভিন্সের হয়ে সবারই প্রতিনিধিত্ব আছে। আমার মা অ্যাথলেটিকস ও হকি খেলেছেন। বাবা রাগবি। আমার দুই ভাইও তাই। একজন অবশ্য প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও খেলে। পরে রাগবি-ক্রিকেটের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সময় আসে যখন, বেছে নেয় রাগবি। আমার বোন ফ্রি স্টেটের হয়ে হকি খেলেছে। পুরো পরিবারের যখন এই অবস্থা, আমার তখন খেলাধুলার বাইরে যাওয়ার সুযোগই ছিল না।

প্রশ্ন : শৈশব-কৈশোরে ক্রিকেটের কোনো নায়ক ছিল?

বোয়ে : দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বলে আমাদের দেশের কোনো হিরো সেভাবে নয়। তার ওপর আমি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। হিরোকে তো বাঁহাতি ব্যাটসম্যানই হতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যালান বোর্ডার প্রিয় ছিলেন। আর হ্যাঁ, কেপলার ওয়েসেলস। তিনিও গ্রে কলেজের, যদিও আমার অনেক সিনিয়র। আর পরবর্তীতে তো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন। তবু দক্ষিণ আফ্রিকান বলে তাঁর প্রতি আলাদা ভালো লাগা ছিল।

প্রশ্ন : বাঁহাতি ব্যাটিংয়ের উল্লেখ করলেন; বাঁহাতি স্পিন নয়। ওই বয়সে কি মূলত ব্যাটসম্যান ছিলেন?

বোয়ে : হ্যাঁ। দক্ষিণ আফ্রিকা স্কুল দলের অধিনায়ক থাকার সময়ও তিন নম্বরে ব্যাটিং করতাম। মূলত ব্যাটসম্যানই; সঙ্গে স্পিন করতাম।

প্রশ্ন : কোথাও বোধহয় পড়েছি, স্কুলে আপনি পেস বোলার ছিলেন?

বোয়ে : ঠিকই পড়েছেন। স্ট্যান্ডার্ড সিক্স পর্যন্ত নতুন বলে বোলিং করতাম। তখন গ্রে কলেজে আমাদের ক্রিকেট কোচ ইয়োহান ভলসটিড। উনি একদিন আমার বোলিং দেখে বলেন, ‘আজ থেকে তোমার সিম বোলিং শেষ। স্পিন শুরু করো। ’ শুরুতে মানতে একটু কষ্ট হচ্ছিল, নতুন বলে জোরে বোলিংয়ের একটা মজা আছে না! অবশ্য স্পিন শুরু করার পর তা ভালোবাসতেও সময় লাগেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যালান কুরিকে রোল মডেল হিসেবে নিই। পরবর্তী সময়ে যখন জাতীয় দলে খেলি, তখনো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। ওনার উপদেশ কাজে লেগেছে অনেক।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন ব্যাটসম্যান, কিন্তু জাতীয় দলে খেলেন মূলত স্পিনার হিসেবে। মানিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল না?

বোয়ে : সেভাবে না। টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে তখন আমার জাতীয় দলে ঢোকার কোনো সুযোগ ছিল না। একটি পথই খোলা—স্পিনার হিসেবে। এখন ইংল্যান্ডের মঈন আলী যেমন। ওদের দেশে খুব ভালো স্পিনার নেই বলে স্পেশালিস্ট স্পিনার হিসেবে খেলছে। ব্যাটিং করছে ৭-৮ নম্বরে। তবে একসময় কিন্তু ইংল্যান্ডের হয়ে ওপেনও করেছে; কাউন্টি দলে এখনো তা-ই করে। আমার অবস্থাও ছিল ঠিক তেমন। প্রোটিয়াদের ব্যাটিং ভীষণ শক্তিশালী, স্পিন বোলিং ততটা না। আর আমি দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েই খুশি ছিলাম।

প্রশ্ন : ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে প্রথমবারের মতো ডাক পাওয়ার আনন্দটা যদি একটু ভাগাভাগি করেন?

বোয়ে : হ্যান্সি ক্রনিয়ে, অ্যান্ড্রু হাডসন, ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্স, অ্যাড্রিয়ান কুপার, অ্যালান ডোনাল্ড, গ্যারি কারস্টেনরা আমার চোখে কিংবদন্তি। ওদের খেলা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। তাঁদের সঙ্গে প্রোটিয়া জার্সি পরে লড়াই করছি দেশের জন্য—এটি ছিল সত্যি বিশাল ব্যাপার।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনার গায়ে লেগে যায় ‘ওয়ানডে স্পেশালিস্ট’ তকমা। আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর প্রথম প্রায় পাঁচ বছর টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি। কষ্ট হতো না?

বোয়ে : ব্যাপারটি কিভাবে ব্যাখ্যা করি? দক্ষিণ আফ্রিকা সব সময়ই পেস বোলারদের ওপর নির্ভর করেছে; স্পিনারদের ওপর সেভাবে না। আর প্যাট সিমকক্স তখনো খেলছেন; ভালো খেলছেন। পল অ্যাডামসও ছিল। টেস্টে তাই আমার সুযোগ সেভাবে আসেনি। তবে ওই সময়টায় সীমিত ওভারের ক্রিকেট উপভোগ করেছি খুব। আর টেস্ট খেলার স্বপ্নটা তো সব সময়ই ছিল।

প্রশ্ন : ২০০০ সালে অবশেষে যখন সেই স্বপ্নপূরণ হয়, কতটা রোমাঞ্চিত ছিলেন?

বোয়ে : এটি ছিল অবিশ্বাস্য। ভারতের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতি আমরা। সম্ভবত ১৩-১৪ বছরের মধ্যে ওই প্রথম কোনো সফরকারী দেশ ভারত থেকে সিরিজ জিতে ফেরে। এর মধ্যে দ্বিতীয় টেস্টে আমি হই ম্যান অব দ্য ম্যাচ। চার-পাঁচ বছর ধরে শুধু ওয়ানডে খেলার পর টেস্টে এসে এমন পারফরম করতে পারাটা ছিল ভীষণ তৃপ্তির।

প্রশ্ন : ১৯৯৯ ও ২০০৩ বিশ্বকাপ খেলেছেন। বিশ্বকাপটা অন্য সব দক্ষিণ আফ্রিকানদের মতো আপনার কাছেও নিশ্চয়ই দুঃখের প্রতিশব্দ?

বোয়ে : বেশি দুঃখ ১৯৯৯ নিয়ে। সেই দলটি ছিল সেরা আর বিশ্বকাপ জয়েরও সবচেয়ে কাছাকাছি যাই সেবার। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ টাই করেও ফাইনালে উঠতে পারিনি। স্টিভ ওয়াহর সেই সেঞ্চুরির কথা তো ভোলা সম্ভব না। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ আমাদের দেশে হয় সত্যি। তবে আমার কাছে বেশি কষ্টের ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়া।

প্রশ্ন : ঠিক ১০০ উইকেট নিয়ে টেস্ট থেকে অবসর। ১০০ উইকেটের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন?

বোয়ে : আরে নাহ্। আমি ভাগ্যবান যে ১০০ উইকেট নিতে পেরেছি। কারণ তখন মনে হয়েছিল, এটিই অবসর নেওয়ার ঠিক সময়। যদি ৯৯ উইকেটে থাকতাম, তাহলেও অবসর নিতাম। ওয়ানডেতেই তো মনে হয় ৯৬ উইকেটে থেমে যাই।

প্রশ্ন : নিজের সেরা পারফরম্যান্স?

বোয়ে : ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়াটা অবশ্যই সবার ওপরে থাকবে। ওয়ানডেতে দুটি ব্যাটিং পারফরম্যান্সের কথা বলতে পারি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পিঞ্চ হিটার হিসেবে নেমে সেঞ্চুরি করি ২০০০ সালের সিরিজে; পচেফস্ট্রুম ও সেঞ্চুরিয়নে।

প্রশ্ন : বিপক্ষে বোলিং করা সবচেয়ে কঠিন ব্যাটসম্যান কে?

বোয়ে : গত রাতেই বন্ধুরা মিলে একটি পার্টিতে ছিলাম। সেখানে ছিলেন কোর্টনি ওয়ালশ, মারিও ভিল্লাভারায়েন, দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো। তখনো এ নিয়ে কথা হচ্ছিল। ওদের বলেছি, আপনাকেও বলছি—আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন লেগেছে ব্রায়ান লারাকে।

প্রশ্ন : অ্যালান ডোনাল্ড, ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক ক্যালিস—গত কিছু দিনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় প্রায় সব দক্ষিণ আফ্রিকানের মুখে লারার কথা শুনছি। আপনিও বললেন। লারা সবচেয়ে কঠিন কেন?

বোয়ে : লারা হচ্ছে লারা। ওর ব্যাপারটি বলে বোঝানোর মতো না। লারার হয়তো মনে হলো, ‘এই বোলারকে যথেষ্ট খেলেছি, এখন আমার ভিন্ন চ্যালেঞ্জ প্রয়োজন’—তখন ও পর পর তিন ছক্কা মেরে বোলারকে আক্রমণ থেকে সরিয়ে দিল। ক্যারিয়ারে অনেকবারই আমি এমন দেখেছি।

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলতে যান। অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?

বোয়ে : দুর্দান্ত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাবেক খেলোয়াড়দের সামনে সুযোগ আসে খেলাটিতে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার। আর এতে ভারতের উঠতি ক্রিকেটারদেরও লাভ হতো। কিন্তু নানা কারণে সেটি তো চালিয়ে নেওয়া যায়নি।

প্রশ্ন : শেষ দিকে একটু অপ্রিয় প্রশ্ন করি। হ্যান্সি ক্রনিয়ের ম্যাচ পাতানোর ঘটনায় আপনার নামও জড়িয়ে যায়। ২০০৪ সালে ভারত সফর করেননি আপনি ও হার্শেল গিবস। সেটি কি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে?

বোয়ে : আসলে হ্যান্সির পুরো ব্যাপারটি কী হয়েছিল, আমরা তা কখনো জানব না। কেন ওর ম্যাচ পাতানোর ঘটনার সঙ্গে আমার নাম এলো, জানি না। আমি ষড়যন্ত্রের কথা নির্দিষ্ট করে বলছি না। তবে ব্যাপারটি ভারতের জন্য ভালো হয়েছিল।

প্রশ্ন : কোন ব্যাপার?

বোয়ে : এই যে আমি ও হার্শেল গিবস ভারত সফরে যেতে পারলাম না, সেটি। দলের সেরা স্পিনার এবং ওপেনার ছাড়া ভারতে যেতে হয় প্রোটিয়াদের। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডকে ভারত এই গ্যারান্টি দিতে পারেনি যে, ‘আমরা হ্যান্সির কেসে ওই দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, এরপর ওরা ওদের মতো ক্রিকেট খেলতে পারবে। ’ সেই গ্যারান্টি না দিলে আমরা যাব কেন? ২০০৭ সালে যখন আইসিএল খেলতে ভারত গেলাম, তখন তো কপিল দেবের সঙ্গে আগেই কথা বলে নিই। দিল্লির পুলিশ আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে; আমি কথা বলেছি। কিন্তু ওরা প্রতিশ্রুতি দেয়, আমার ক্রিকেট খেলায় বাধা দেবে না। সেই গ্যারান্টি ২০০৪ সালে পেলে আমি অবশ্যই ভারত সফরে যেতাম। সত্যের মুখোমুখি হতে আমার তো কোনো ভয় নেই।

প্রশ্ন : ক্রনিয়েকে কিভাবে মনে রেখেছেন?

বোয়ে : শুরুর দিকেই বলেছি, তিনি গ্রে কলেজে আমার সিনিয়র। আমাদের অভিভাবকদের ভেতর খুব ভালো সম্পর্ক। ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছি একসঙ্গে। ২০০০ সালে আমি যখন কাউন্টি খেলছিলাম, তখন হঠাৎ ওই ম্যাচ পাতানোর খবরের বিস্ফোরণ। এটি খুব দুঃখজনক। কিন্তু এই যে আমার নাম জড়িয়ে যায় এর সঙ্গে, হ্যান্সি আমাকে কখনো এ নিয়ে কিছু বলেনি। পরেরদিকে ও জর্জে চলে যায়। যোগাযোগ আর তত ছিল না। কিন্তু এখনো হ্যান্সির বাবা-মার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ওর বোনের সঙ্গে দেখা হয় প্রায়ই। হ্যান্সি হয়তো ভুল করেছে। কিন্তু ভুল ক্ষমা করলে তবেই না জীবন এগিয়ে যায়। আমাদের সমসাময়িক সব প্রোটিয়াকে জিজ্ঞেস করলে জানবেন, আমরা সবাই হ্যান্সিকে ক্ষমা করে দিয়েছি।


মন্তব্য