kalerkantho


অ্যাথলেটিকসের উজ্জ্বল অতীত, ধূসর বর্তমান

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অ্যাথলেটিকসের উজ্জ্বল অতীত, ধূসর বর্তমান

উজ্জ্বল অতীত : দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অ্যাথলেটিকস অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে অ্যাথলেটিকস চর্চা আরো বাড়ে।

স্কুল, কলেজ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অ্যাথলেটিকসের প্রতি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় নিয়মিতই অংশ নিত। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ছিল দেশের অ্যাথলেটিকস চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। সার্ভিসেস টিম বাংলাদেশ রেলওয়ে, টিঅ্যান্ডটি বোর্ড, কাস্টমস, বিটিএমসি ও বিজেএমসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অ্যাথলেটিকসের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসে।

নতুন উদ্যমে আন্তবোর্ড, আন্তবিশ্ববিদ্যালয়, আন্তবাহিনী, জেলা ও বিভাগীয় প্রতিযোগিতাগুলোর আয়োজন শুরু হয়। তাতে বিপুল অ্যাথলেটের সেসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আত্মপ্রকাশ ঘটে নতুন প্রতিভার।

তারকা অ্যাথলেট নজরুল ইসলাম রুমি, হাবিলদার মোস্তাক আহমেদ, মীর শরীফ হাসান, আমজাদ হোসেন, মইনউদ্দিন আহমেদ, মজিবুর রহমান মল্লিক, সাইদুর রব, মিলজার হোসেন, শাহ আলম, মাহাবুব, গোলাম আম্বিয়া, বিমল চন্দ্র, সুলতানা কামাল, সুফিয়া খাতুন, শামিমা সাত্তার মিমু, রোকেয়া বেগম খুকী, ফিরোজা বেগম ও শর্মিলী রায়দের আবির্ভাব ঘটেছিল এসব প্রতিযোগিতাতেই। তাঁরা সবাই জাতীয় প্রতিযোগিতায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন।

শাহ আলম, মাহাবুব, মজিবুর রহমান মল্লিক ও বিমল চন্দ্র সাফ গেমসেও সোনা জিতে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছিলেন।

অ্যাথলেটিকস উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ অ্যামেচার অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন ১৯৭৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। ফেডারেশন কর্মকর্তাদের একাগ্রতা, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় প্রতিযোগিতা অত্যন্ত উত্সবমুখর ও জাঁকজমক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। প্রচার-প্রচারণার কারণে মাঠে দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

অ্যাথলেটিকসকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আরো জনপ্রিয় করতে ফেডারেশন জাতীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহে আয়োজন করে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রতিযোগিতাগুলোয় যে বিপুল দর্শকের সমাগম হয়েছিল তা কেবল ঢাকা ফুটবল লিগের বড় দুটি দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত ম্যাচে উপস্থিত দর্শকের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। তাই জনপ্রিয়তার নিরিখে সে সময় ফুটবলের পরই অ্যাথলেটিকসের স্থান ছিল।

ধূসর বর্তমান : অ্যাথলেটিকসের এই উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সাফল্য ১৯৯১ সালের পর থেকে হঠাত্ হুমকির মুখে পড়ে যায়। ১৯৯১ সালে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর স্বেচ্ছাবসর কার্যক্রমের আওতায় বিটিএমসি ও বিজেএমসির বিপুল অ্যাথলেট চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। তাই প্রতিষ্ঠান দুটি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ায় দেশের অ্যাথলেটিকস মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে চাকরিচ্যুতি অন্যদিকে নতুন নিয়োগ বন্ধ। এই অনিশ্চয়তার মাঝে শিক্ষিত যুবসমাজ অ্যাথলেটিকস থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাথলেটিকস চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য দেশে যে ক্রিকেট উন্মাদনা সৃষ্টি করে তাতে যুবসমাজ আকৃষ্ট হয় এই খেলাটার দিকেই। একদিকে ক্রিকেটের উত্থান অন্যদিকে কয়েকটি খেলার ব্যাপক জনপ্রিয়তা হ্রাস, এরূপ পরিস্থিতিতে ফুটবল, হকি, শ্যুটিং, সাঁতারসহ বেশ কিছু ফেডারেশন যখন নিজ নিজ খেলার উন্নয়নে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তখন অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন কেবলমাত্র দায়সারাভাবে প্রতিবছর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপগুলো আয়োজনের মাধ্যমে তাদের রুটিন কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। ডিফেন্স টিমগুলো ছাড়া অন্যরা শুধু কাউন্সিলরশিপ বহাল রাখতে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া দল গড়ে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে থাকে। জাতীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিকস আয়োজন করা হয় শুধু আইএএএফের অনুদানপ্রাপ্তির শর্ত পূরণের জন্য।

অ্যাথলেটিকসের সঙ্গে সম্পর্কহীন কিছু লোক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ফেডারেশনের কর্তৃত্ব নেন। অদক্ষতার কারণে তাঁরা ফেডারেশন পরিচালনায় ব্যর্থ হন। অ্যাথলেটিকসে স্থবিরতা নেমে আসে এ জন্যই।

উন্নয়নে যা করতে হবে : অ্যাথলেটিকসকে পুনর্জীবিত করতে প্রথমেই ফেডারেশনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। সাধারণ সম্পাদকদের পদকে বেতনভুক্ত করে সভাপতিকে নির্বাহী ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে আইএএএফের আদলে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সভাপতিসহ সব পদ হবে নির্বাচিত। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ও জাতীয় প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত সাবেক অ্যাথলেটরা যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে সে জন্য খেলোয়াড় কোটায় তাঁদের সরাসরি কাউন্সিলর মনোনীত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে।

দক্ষ ও যোগ্য ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে ফেডারেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিভা অন্বেষণের জন্য আন্তস্কুল, আন্তবোর্ড, আন্তবিশ্ববিদ্যালয়, আন্তবাহিনী, জেলা ও বিভাগীয় প্রতিযোগিতাগুলো নিয়মিতভাবে আয়োজন করতে হবে। দীর্ঘদিন যাঁরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফেডারেশনের পদ আঁকড়ে আছেন এবং যাঁদের অদক্ষতার কারণে অ্যাথলেটিকস আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে, তাঁদের দ্রুত চিহ্নিত করে ফেডারেশনের পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। অ্যাথলেটদের কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ফেডারেশনকে সার্ভিসেস টিম, করপোরেট হাউস, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠানকে অ্যাথলেটিকসের প্রতি আগ্রহী হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অ্যাথলেটিকসকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ বড় বড় জেলা ও বিভাগগুলোতে আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে। সাফ গেমসকে টার্গেট করে দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর দেশের অ্যাথলেটিকসের উন্নয়নে আইএএএফের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

কাজগুলো চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়।


মন্তব্য