kalerkantho


মেসি-রোনালদোরাও তৃপ্ত হতেন যে গোলে

মতিনের জাদুকরী গোল

সনৎ বাবলা   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মতিনের জাদুকরী গোল

দেশের ক্ষয়ে যাওয়া ফুটবলেও অক্ষয়-অমর হয়ে যাওয়ার মতো কিছু ঘটনা ঘটে। সঠিক সংরক্ষণ কিংবা যথাযথ জায়গায় উপস্থাপনের অভাবে অগোচরেই থাকে যায় সেসব। বেশির ভাগ সময় হারিয়েও যায়, দর্শকহীন ফুটবলের যুগে কেবল বেঁচে থাকে গুটিকয়েক মানুষের স্মৃতিতে। মতিনের গোলটিকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে চায় না সাইফ স্পোর্টিং। যেতে চায় ফিফার দরবারে, পাঠাতে চায় ফিফার সেরা গোল অ্যাওয়ার্ডের নমিনেশনে।

ঢাকার ম্যাড়মেড়ে ফুটবলে সুখানুভূতির উপলক্ষ খুব কমই আসে। চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয় চমৎকার মুভ, সুন্দর গোল দেখার জন্য। এই অপেক্ষা ঘুচিয়ে মতিন মিয়া অপূর্ব এক গোলে দুর্দান্ত এক ফুটবল সন্ধ্যা উপহার দিয়েছেন গত ৭ ডিসেম্বর। ইনজুরি টাইমে নিজেদের বক্সের ওপর থেকে বল ধরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে সাইফের এই ফরোয়ার্ড বল পাঠিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার জালে। দৌড়ে যেন ম্যারাডোনার গোলের সুরভি,  গোলরক্ষকসহ পাঁচজনকে পরাস্ত করেছেন তিনি। পায়ের কারুকাজে এক এক করে চারজনকে পরাস্ত করে হঠাৎ এমন গতি বাড়িয়েছেন ফাউল করারও সুযোগ ছিল না। সাইফের কোচ রায়ান এই গোলকে ঢাকার ‘ট্রাফিক জ্যাম-ব্রেকার’র সঙ্গে তুলনা করেছেন, ‘ঢাকার যানজটের মধ্য দিয়ে যেভাবে মানুষ এঁকেবেঁকে এগিয়ে যায়, মতিনের গোলটিও হয়েছে সেরকম। দারুণ সুন্দর এক গোল।’ কিন্তু বিস্ময়করভাবে মতিন যেন অত আপ্লুত নন, ‘এমন গোল করে স্বাভাবিকভাবে খুশি। ড্রিবল করে গোল করা আমার পছন্দ। চট্টগ্রাম ও সিলেট লিগে এমন অনেক গোল আছে আমার। বল নিয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারি আমি। এ জন্য কোচও আমাকে পছন্দ করেন।’ ঢাকায় তাঁর অভিষেক হয়েছে অনেক দেরিতে, গত বছর সাইফ স্পোর্টিংয়ের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। এর আগে এই সিলেটি ফুটবলারের যত খ্যাতি শুধু ‘খেপে’, সিলেটে বিভিন্ন জায়গায় খেপ খেলে জীবিকা নির্বাহ করার মধ্যে খুঁজতেন খেলোয়াড়ি জীবনের সার্থকতা। পায়ে মাড়িয়েছেন ঢাকায় খেলার সুযোগও, যদি ওরকম পয়সা পাওয়া না যায়! অবশেষে পয়সার গ্যারান্টি দিয়ে সাইফ নিয়ে আসে তাঁকে। এরপর প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগ খেলা এই ফুটবলারের এখন উপলব্ধি, ‘আরো আগে ঢাকায় আসা উচিত ছিল।’  

ঢাকায় খেললে যে অনেক দুয়ার খুলে যায়, সেটা এখন তিনি বুঝতে পারছেন। নিজের সামর্থ্য দেখাতে পারছেন, সুখ্যাতি কুড়াতে পারছেন। দেশের একমাত্র উয়েফা লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হকের কণ্ঠেও সেই গোলের প্রশংসা, ‘খুব ভালো গোল এটা, ফিফার সেরা গোলের অ্যাওয়ার্ডের জন্য পাঠানো যেতেই পারে। আমাদের যেটুকু আছে, তা দিয়েই তো চেষ্টা করতে হবে। এর মধ্যে কোনো খেলোয়াড় ভালো করলে তাকে উৎসাহ দেওয়ারও তো একটা উপায় এটা।’ সাইফ স্পোর্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরীও এই গোল নিয়ে উচ্ছ্বসিত, ‘মতিনের পায়ে জাদু আছে, সে অনায়াসে কয়েকজনকে ডজ করে বেরিয়ে যেতে পারে। বাফুফের সহযোগিতা পেলে আমরা অবশ্যই ফিফার কাছে গোলটা উপস্থাপন করতে পারি।’ ফিফা প্রতিবছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বর্ষসেরাদের অ্যাওয়ার্ড দেয়। সেখানে বর্ষসেরা গোলটি কিংবদন্তি ফুটবলার ফেরেঙ্ক পুসকাসের নামে দেওয়া হয়। ‘পুসকাস অ্যাওয়ার্ড’ খেলোয়াড়দের নাম কিংবা প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে না। অবিশ্বাস্য-অদ্ভুত সব গোলের কীর্তিমানদের হাতেই ওঠে এই পুরস্কার। স্থানীয় লিগ, টুর্নামেন্ট, আন্তর্জাতিক ম্যাচ, এমনকি মহিলা ফুটবলের গোলও আসতে পারে সেরা গোলের বিবেচনায়। এই হিসাবে তো ২০১৬ সালের সেরা গোলের পুরস্কার জিতেছিলেন মালয়েশিয়ান সুপার লিগের দল পেনাংয়ের মোহাম্মদ ফাইজ সুবরি অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক গোলের জন্য। তার আগের বছর জিতেছিলেন ব্রাজিলের অখ্যাত অ্যাটলেটিকো গুয়ানিজের অখ্যাত ওয়েন্ডেল লিরা।

সুতরাং এখানে গোলের সৌন্দর্যই শেষ কথা। যদিও বাংলাদেশ আগে কখনো এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য পাঠায়নি কারো গোল। অথচ ২০১০ সালে এসএ গেমসে জাহিদ হোসেন দুর্দান্ত এক গোল করেছিলেন মালদ্বীপের জালে। তারপর ওই তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা পর্যন্ত, আর কিছু করার রেওয়াজ ছিল না। মতিনকে দিয়ে নতুন রেওয়াজ শুরু করার কথা বলেছেন বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ, ‘মতিনের গোলটি আমি দেখেছি। লিগ কমিটির আগামী সভায় তাঁর গোলটি ফিফায় পাঠানোর ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমাদের দেশের একটা ভালো গোল নমিনেশনে থাকল। ফিফার কাছে পাঠানো আমাদের জন্য দশ মিনিটের কাজ। এটা আমরা করব।’ করলে এটা হবে ফিফার দরবারে তোলা কোনো বাংলাদেশি ফুটবলারের প্রথম গোল। মতিনও তাই শিহরিত, ‘পুরস্কার পাই না পাই, আমার গোলটা তো দু-তিনজন লোক দেখবে। এটাই হবে আমার আনন্দ।’ ১৯ বছর বয়সী দেশি ফরোয়ার্ডের আনন্দের মতো এটা বাংলাদেশ ফুটবলেরও তো গৌরব।


মন্তব্য