kalerkantho


অন্তরাল থেকে অর্ণব তারকালোকে

সনৎ বাবলা   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অন্তরাল থেকে অর্ণব তারকালোকে

অর্ণব শাহরিয়ার জাপানে গিয়েছিলেন এক সাধারণ শ্যুটার হয়ে। পরশু রাতে ফেরার পর দেখছেন জীবন অনেক ওলটপালট হয়ে গেছে।

তাঁর চারপাশের আবহ কেমন যেন বদলে গেল। হঠাৎ কদর বেড়ে গেছে ঘরে-বাইরে। চেনা মানুষগুলোর সপ্রশংস দৃষ্টি আর সহাস্য আলাপে অর্ণব হয়ে গেছেন দেশের শ্যুটিংয়ের ঝলমলে এক তারা, ‘ঘরভর্তি মেহমান এখন, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তাঁরা। বুঝতে পারছি, একটা আন্তর্জাতিক পদক আমার জীবনের রং বদলে দিয়েছে!’

অর্ণব শাহরিয়ার জাপানে গিয়েছিলেন এক সাধারণ শ্যুটার হয়ে। পরশু রাতে ফেরার পর দেখছেন এই সাধারণ শ্যুটারের জীবন অনেক ওলটপালট হয়ে গেছে। আগে যে মুখ ফিরিয়ে চলে যেত, সে-ও এখন দুদণ্ড থেমে হাত মেলাচ্ছে। তাকে শোনাতে হচ্ছে রুপার গল্প। চীনা শ্যুটারের কাছে সোনার লড়াইয়ে মাত্র ০.৫ পয়েন্টে হারলেও আত্মীয়-স্বজনের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘সোনার ছেলে’। নিজেদের ছেলে-পুলেকেও বলছেন, ‘তাকে দেখো, তার মতো হওয়ার চেষ্টা করো।’ সমবয়সীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা ১৬ বছর বয়সী এই তরুণ। সামগ্রিক পরিপার্শ্ব দেখে অর্ণবও উপলব্ধি করছেন নতুন দায়, ‘এশিয়ান এয়ারগানে পদক জয়ের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চাপও বোধ হয় তৈরি হয়ে গেছে। আরো উঁচুতে উঠতে হবে আমাকে।’

অথচ তাঁর কৈশোরের স্বপ্নজুড়ে ছিল ক্রিকেট। বাবার হাত ধরে বিকেএসপিতে গিয়েছিলেন ক্রিকেটার হওয়ার জন্য, ‘খেলাধুলায় আগ্রহ দেখে বাবা বিকেএসপিতে নিয়ে গিয়েছিলেন ভর্তি হওয়ার জন্য। হতে চেয়েছিলাম ক্রিকেটার। ক্রিকেটের এমন জনপ্রিয়তার জোয়ার আমাকে ভীষণভাবে টেনেছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ক্রিকেট পাইনি, খুব ভেঙে পড়েছিলাম আমি। তখন বাবাই আমাকে সাহস দিয়ে শ্যুটিংয়ে ভর্তি করেছেন। বলেছিলেন, কপালে থাকলে ভালো শ্যুটার হয়েও সাড়া ফেলা যায়।’ ২০১৪ সালে এয়ারগানে শুরু তাঁর শ্যুটিং, পরের বছর ম্যাচ রাইফেলে প্র্যাকটিস। তার মাত্র দুবছর পর জাপানে হয়েছে নতুন শ্যুটারের সূর্যোদয়। এশিয়ান এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপ হলো এশিয়ার সেরা শ্যুটারদের মঞ্চ। সেখানে প্রথম দিন কেটেছে বাংলাদেশি শ্যুটারদের ব্যর্থতার মিছিলে। বাকী-রিসালাতদের আত্মসমর্পণ দেখে কোচ ক্রিস্টেনসেনকেও যেন হতাশায় পেয়ে বসেছিল। কিন্তু পরের দিন সেই হতাশাকে বিদায় দিয়ে রুপালি দিন উপহার দিয়েছেন অর্ণব। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে বিকেএসপির এই তরুণ ‘ইয়ুথ ক্যাটাগরি’তে রুপা জিতে বাবার স্বপ্ন সার্থক করেছেন, ‘পরশু রাতে বাসায় ফেরার পর বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। তিনি ক্রিকেট খেলতেন, বড় খেলোয়াড় হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। বাবা না পারলেও ছেলের মধ্য দিয়ে বোধ হয় তাঁর স্বপ্নপূরণ হয়েছে। সত্যি বললে আমি পরিবার থেকে যেরকম সাপোর্ট পেয়েছি সেটা তো বাবা পাননি। এই পদক জয়ের আনন্দ আমার যত ঠিক ততটাই আমার বাবারও।’ ঠিক মধ্যবিত্তের জীবনের গল্প। বাবার জীবনে যত ব্যর্থতা থাকে সেগুলো ঝালিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ থাকে সন্তানকে দিয়ে। সন্তানের জীবনের ছবিতে অলক্ষ্যে ঢুকে পড়েন নিজে। তার সাফল্যে উদ্বেলিত হন নিজে। আনন্দ-অশ্রু ঝরে নিজের। বাবা আলিফ হোসেন এভাবেই নিজের জীবনের অতৃপ্তি মিটিয়েছেন ছেলের প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্যে।

এটা শুধুই রৌপ্য পদক নয়, এর সঙ্গে আছে আরেক বিশাল প্রাপ্তি। আগামী অক্টোবরে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠেয় ইয়ুথ অলিম্পিকে সরাসরি অংশ নেওয়ার টিকিটও নিশ্চিত হয়েছে অর্ণবের। শ্যুটিংয়ে তো প্রথমই আর সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয়। গলফার সিদ্দিকের পর অলিম্পিকের মতো এমন বৈশ্বিক ক্রীড়ায় অর্ণব পা রাখবেন নিজের যোগ্যতা দিয়ে। পদকের চেয়েও যেন এটা বেশি নাড়া দিয়েছে তাঁকে, ‘এটা এমন এক প্রাপ্তি, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’ তবে এ বছরটা কেটেছে তাঁর দুর্দান্ত। দেশে যেসব মিটে দাঁড়িয়েছেন তার সবকটিতেই রেকর্ড! হামিদুর রহমান ইয়ুথ শ্যুটিংয়ে ৫৯২ মেরে রেকর্ডের শুরু। এরপর দেশের এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে ৬০০-র মধ্যে মেরেছেন ৫৯৯! সর্বশেষ জুনিয়র বিভাগে ৫৯৫ মেরে জাতীয় শ্যুটিংয়ে করেছেন নতুন রেকর্ড। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা দেখেই ডেনিশ কোচ তাঁকে নিয়ে আশাবাদী হয়েছিলেন। জাপান রওনার সময় আশার কথা বলেও গিয়েছিলেন। তাই অর্ণবের অশেষ কৃতজ্ঞতা কোচ ও ফেডারেশন সম্পাদকের কাছে, ‘আমার এই সাফল্যের পেছনে আছে আমার পরিশ্রম, ফেডারেশন সম্পাদকের সাপোর্ট-ভিশন ও কোচের উন্নত ট্রেনিং। এর কোনো একটি না হলে হয়তো আমি এ জায়গায় আসতে পারতাম না। আমাদের শ্যুটিং রেঞ্জ থেকে শুরু করে, সরঞ্জাম এবং ট্রেনিং সবই আধুনিক। বিশেষ করে আমাদের বিদেশি রাইফেল কোচ অসাধারণ, তাঁর শেখানোর পদ্ধতিই আলাদা।’ ফেডারেশন সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদের মিশন ‘টোকিও অলিম্পিক’ পরিকল্পনার বড় একটা অংশজুড়ে আছেন ডেনিশ কোচ ক্লাভস ক্রিস্টেনসেন। এটা টোকিও অলিম্পিকে পদক জেতার প্ল্যান নয়, নিজের যোগ্যতায় অলিম্পিকে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অর্ণবের যুব অলিম্পিকের টিকিট পাওয়া দিয়েই শুরু হলো এই মিশনের সাফল্য।


মন্তব্য