kalerkantho


দলের প্রতিষ্ঠাতা প্যাটেল

যদিও অধিনায়ক মানতে চান না

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দলের প্রতিষ্ঠাতা প্যাটেল

গোলমাল শুরুতেই। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আসলে কার ভাবনার ফসল? স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এই দলটির মুখচ্ছবি হয়ে ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। অধিনায়ক হওয়ায় প্রচারের আলোয় তো থাকবেনই। কিন্তু পিন্টু যে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হওয়ার ২৭ দিন পর ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন, এ সত্য আড়ালের উপায় নেই। এর আগেই তো সেই দল তৈরি, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নেওয়া, কারনানি ম্যানশনে বাড়ি ভাড়া নেওয়াসহ সব কাজ হয়ে গেছে। তা করেছেন কে?

পিন্টুর দাবি, দল তৈরির শুরুর দিকের প্রক্রিয়া থেকেই তিনি সঙ্গে ছিলেন। প্রতাপ শংকর হাজরার উচ্চারণ, ফুটবল দল তৈরির ভাবনা তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সুভাষ চন্দ্র সাহার চিন্তাও ছিল নাকি একই স্রোতের। কিন্তু এই দাবিগুলো ব্যক্তিগত। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সিংহভাগ ফুটবলার নিশ্চিত করেই বলেছেন, এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল। তাঁর মস্তিষ্কেই প্রথম আসে ফুটবল দিয়ে যুদ্ধের ধারণা। থিয়েটার রোডে প্রবাসী সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়ার কাজটিও করেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিভাজনের কারণে দুই ম্যাচ শেষে স্বাধীন বাংলা দল ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে চলে যান প্যাটেল। তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখার শুরুও সেখানে। আর ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইতিহাস বিকৃতির পাকচক্রে কাদা লাগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলেও।

‘আমি তো কখনো বলি না, জাকারিয়া পিন্টু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক না। তাহলে আমাকে অস্বীকার কেন?’—বিষাদের রং খেলে যায় প্যাটেলের কণ্ঠে। কিন্তু পিন্টু একেবারে অস্বীকার করেন তাঁর ভূমিকা, ‘আমি ওকে কিছু করতে দেখিনি।’ কিন্তু আপনি যোগ দিতে দিতে তো দল তৈরির কাজ প্রায় শেষ? ‘না, এসব হওয়ার সময়ই আমি গিয়েছি। প্যাটেলের সংগঠনে কিছু ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু ওকে আমি প্রতিষ্ঠাতা বলতে রাজি নই’— জোরালো কণ্ঠ অধিনায়কের। সহ-অধিনায়ক প্রতাপও গলা মেলান, ‘একবার জনৈক পরিচিত লোক এসে আমাকে বলে স্বাধীন বাংলা দল গঠনের জন্য থিয়েটার রোড থেকে আমাকে ডেকেছে। তাঁর নাম আমি বলব না। কারণ সে এর যোগ্য না। ওই দল গঠনে আমাকে খবর দেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না।’ বলাই বাহুল্য, উচ্চারণের যোগ্য মনে না করা সেই নামই প্যাটেলের।

অথচ দলের বাদবাকি প্রায় সব সদস্যই অধিনায়ক, সহ-অধিনায়কের মতের বিরুদ্ধে। বাফুফের বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন যেমন বলেছেন, ‘সংগঠনের মূল ভূমিকা প্যাটেলের। এটি অ্যাবসুলেটলি কারেক্ট।’ ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্নারও একই সুর, ‘ওই দল গঠন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। যেহেতু প্যাটেলের সেই যোগাযোগ ছিল, ও লুৎফর চাচাসহ কয়েকজনের সঙ্গে মিলেই তা করেছে।’ শেখ আশরাফ আলী মনে করিয়ে দেন কিভাবে প্রথম ফুটবলার হিসেবে তাঁর সঙ্গে প্যাটেলের কথা হয়। এ কে এম নওশেরুজ্জামান আবার পিন্টু-প্রতাপরা প্যাটেলের অবদান অস্বীকার করছে শুনে বলেন, ‘বাপ-মা ছাড়া সন্তান হতে পারে না। উদ্যোক্তাকে যদি আপনি অস্বীকার করেন, তাহলে কি দলটি এমনিই হয়ে গেছে?’ তসলিম উদ্দিনেরও একই কথা, ‘প্যাটেল ভাই খেটেখুটে এত কিছু করল, তাঁকে বঞ্চিত করা ঠিক না।’ শাহজাহান আলমের কথা, ‘প্যাটেল না হলে এই দল হতো না।’ বিমল কর, বীরেন দাস বীরু, ফজলে সাদাইন খোকন, আবদুল খালেক, মজিবর রহমান, সনজিৎ কুমার, মোজাম্মেল হকদেরও একই দাবি।

সুভাষ চন্দ্র সাহা তা মানেন না। মানেন না বলতে তাঁর হাওয়াই কথা, ‘আমি আগরতলা থেকে কলকাতা গিয়ে তাঁকে অমন কিছু করতে দেখিনি।’ আমতা আমতা করেন অন্য দু-একজন। কিন্তু দেশে থাকা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জীবিত যে ২২ জন, এর মধ্যে বাদবাকি ১৬-১৭ জন তো খোলাখুলি বলেছেন, এই দলটির প্রতিষ্ঠাতার নাম সাইদুর রহমান প্যাটেল। ইতিহাসের সেই সত্য কতকাল আর মাটিচাপা থাকবে?



মন্তব্য