kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

স্বাধীনতা পুরস্কার কি আমরা আশা করতে পারি না?

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



স্বাধীনতা পুরস্কার কি আমরা আশা করতে পারি না?

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন বিমল কান্তি করের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

এত কিছু করলাম, তার প্রতিদানে স্বাধীনতা পুরস্কার কি আশা করতে পারি না? অবশ্যই আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া উচিত। পিন্টু ভাই একা তা পাবেন কেন?

 

— আমিরবাগ আবাসিক এলাকা কোন দিকে?

: এই গেট দিয়ে ঢুকলেই আমিরবাগ।

— মসজিদটা কোথায় বলতে পারেন?

: সোজা কিছু দূর গিয়ে ডানে যাবেন। ওই রাস্তার শেষ মাথায় মোড়েই মসজিদ।

চট্টগ্রামের সে সকালে শীত পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্যটা আড়মোড়া ভাঙছে কেবল। সেভাবে উত্তাপ ছড়াতে পারেনি তখনো। পথচলতি বেশির ভাগ মানুষের জবুথবু অবস্থা। ওই অচেনাদের সঙ্গী হয়ে অল্প কিছু দূর হাঁটতেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য আমিরবাগ মসজিদ। সেখানে গিয়েই ফোন দেওয়ার কথা তাঁকে। ফোন ধরে বলেন তিনি, ‘আমি তো মূল রাস্তার সামনেই আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক আছে, মসজিদের সামনে দাঁড়ান। আসছি।’

কী আশ্চর্য, একটু আগে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করেছি যে প্রৌঢ়কে, তিনিই তো হেঁটে হেঁটে আসছেন আবার!

দীর্ঘদেহী, মাথায় চুল নেই বললেই চলে, মুখে খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। গায়ে নীল রঙের ভারী জ্যাকেট। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর থেকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। এরপর বলেন, ‘আমার বাড়ির ঠিকানা আমাকেই জিজ্ঞেস করলেন? অবশ্য আমাকে তো না চেনারই কথা! এখন আর আমাদের কেউ চেনে না।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ডিফেন্ডার বিমল কান্তি করের বুক চিরে বেরিয়ে আসে অভিমানের দীর্ঘশ্বাস!

মসজিদের সামনেই তাঁর বাড়ি। বহুতল ভবনের দোতলায় ভাড়া থাকেন। বয়স পঁচাত্তর পেরিয়ে গেছে। কাজের ভুবন থেকে অনেক আগেই ছুটি নিয়েছেন বিমল। তিন মেয়ের বিয়ে দেওয়া সারা, তাঁরা থাকেন ঢাকায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীতে থাকেন একমাত্র ছেলের সঙ্গে। ওই বাসার ড্রয়িংরুমে বসেই বিমল নাড়াচাড়া করেন কত কাল আগের স্মৃতি!

সেই ১৯৭১! সেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল!

এই জনপদে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার অনেক আগেই ফুটবলের প্রেমে পড়েন বিমল। তখন থাকেন ফেনীতে। ফেনী হাই স্কুলে পড়ার সময় আন্ত স্কুল ফুটবল খেলতে আসেন চট্টগ্রামে। নজরে পড়ে যান রেলওয়ের কর্তাদের। তাঁকে চাকরি দিয়ে নিয়ে আসা হয় এখানে। এরপর চট্টগ্রাম মোহামেডানে খেলেন এই স্টপার; ঢাকায় গিয়ে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবেও। আর ১৯৭১ সালে দেশে যখন যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো, উদ্ভ্রান্ত মিছিলের অংশ হয়ে বিমলও পরিবার নিয়ে পাড়ি দেন সীমান্ত। আশ্রয় নেন ভারতে।

ওখানে অবশ্য শরণার্থীর মতো আশ্রিত হয়ে থাকতে হয়নি বিমলকে। আগরতলায় আগে থেকেই থাকেন স্ত্রীর ভাই গৌতম দাস। সাংবাদিকতা করা সেই শালাবাবুর বাড়িতে বেশ ছিলেন। কায়কোবাদ-এনায়েত-নওশেরের মতো ফুটবলাররা ওখানে লিগে লিগে ফুটবল খেলা শুরু করলেও সে দলে ভেড়েননি বিমল। কিন্তু স্বাধীন বাংলা দলে খেলার উপলক্ষ আসে যখন, তখন উদগ্রীব হয়ে ওঠেন ঠিকই, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ঘোষণা শুনি প্রথম। এরপর পেপারেও দেখি। তখন মনে হয় দেশের স্বাধীনতার জন্য কিছু করি। সে কারণেই যোগ দিই স্বাধীন বাংলা দলে।’ আগরতলায় ‘জয় বাংলা একাদশ’ নাম দিয়ে যে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা, তাতে অংশ নেন বিমল। এরপর যান কলকাতায়, ‘প্রতাপদাসহ কয়েকজন এলেন আগরতলা থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি নিজেই যোগাযোগ করি ওনাদের সঙ্গে। এমনিতে আমাকে তাঁরা সবাই চিনতেন। সবার সঙ্গে প্লেনে করে কলকাতা গিয়ে যোগ দিই স্বাধীন বাংলা দলে।’

ফুটবল দিয়ে যুদ্ধ করা সৈনিকদের দলে নাম লেখালেন বিমল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠনে ওই দল রাখে বিশাল ভূমিকা। ১০-১২টি ম্যাচে মাঠের লড়াইয়ে ছিলেন তিনি, কিন্তু বয়সের ভারে চাপা পড়ে যায় স্মৃতির দূর্বাঘাস, ‘দক্ষিণ কলকাতার মাঠে খেলা ম্যাচটি মনে আছে। আমরা খুব ভালো খেলে ৪-২ গোলে জিতি বলে। বম্বের ম্যাচটি তেমন ভালো খেলা হয়নি। তবে পতৌদির নবাব আমাদের বিপক্ষে খেলেছেন বলে আলাদা রোমাঞ্চ ছিল। এর বাইরে খুব বেশি কিছু মনে পড়ে না। বয়স হয়ে গেছে তো। সব ভুলে ভুলে যাই।’

বিমল ভুলে গেছেন বয়সের কারণে। আর বাংলাদেশ এ ফুটবলবীরদের ভুলে গেছে বিস্মৃতিপরায়ণ স্বভাবের জন্য। নইলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রাপ্য সম্মান পাবে না কেন? এ নিয়ে বুকজোড়া দুঃখ বিমলের। বিশেষত স্বাধীনতা পুরস্কার না পাওয়াটা আর্তনাদ হয়ে বাজে তাঁর কণ্ঠে, ‘এত কিছু করলাম, তার প্রতিদানে স্বাধীনতা পুরস্কার কি আশা করতে পারি না? অবশ্যই আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া উচিত। পিন্টু ভাই একা তা পাবেন কেন?’ অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর প্রতি তাঁর ক্ষোভ বেরিয়ে আসে এখানে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক যে সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমার নখের সমান নাকি তোরা?’—এ নিয়েও বিস্তর ক্রোধ বিমলের, ‘পিন্টু ভাইয়ের এই দম্ভ সব সময়ের। নিজেকে সবার চেয়ে বড় খেলোয়াড় মনে করেন। তাঁর চেয়ে বড় ফুটবলার তো সালাউদ্দিন। কই, ওকে তো কখনো এভাবে বলতে শুনিনি। আসলে পিন্টু ভাই শুধু নিজের কথা বলেন। সে কারণে স্বাধীন বাংলা দলের কেউ তাঁকে দেখতে পারে না।’

স্বাধীনতার পর ঢাকায় মাত্র দুই মৌসুম খেলেন বিমল। ভিক্টোরিয়ায় ১৯৭৩ সালে সর্বশেষ। এরপর চট্টগ্রাম মোহামেডানে আরো দুই মৌসুম খেলে একেবারে অবসর। এরপর চট্টগ্রাম লিগে রেফারিং করেন কিছুদিন। আর সংসার চালানোর জন্য টুকটাক ব্যবসা। শ্যালকের সঙ্গে ওষুধের ব্যবসা ছিল। তাতে প্রাচুর্য হয়তো ছিল না সেভাবে, কিন্তু অভাবও দাঁত বসাতে পারেনি। আর এখন তো মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসাও করছে। বিমলের তাই অখণ্ড অবসর।

সেই অবসরে বারান্দায় বসে পেপার পড়েন; খাঁচায় থাকা ছোট্ট রঙিন পাখি দুটির খুনসুটি দেখেন। পার্কে যান হাঁটতে, আড্ডা দিতে কখনো-সখনো রেফারিজ অ্যাসোসিয়েশনে। আর প্রায় প্রতি সন্ধ্যার পর নিয়ম করে ঢুঁ গোলপাহাড় মন্দিরে। প্রার্থনায় অংশ নেন; কীর্তন শোনেন।

তাঁদের ১৯৭১ সালের কীর্তির কথা যে সবাই ভুলে গেছে, সেই দুঃখটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টাও থাকে হয়তো বিমল করের সেই প্রার্থনায়!

 

 


মন্তব্য