kalerkantho


শিরোপাক্ষুধায়ই অদম্য আবাহনী

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শিরোপাক্ষুধায়ই অদম্য আবাহনী

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ফুটবলে অতীতটাই নিরেট, বর্তমানটা ঘুণে ধরা। আবাহনী ক্লাবে গিয়ে এখন এই কথা বলুন, আপনি একা পড়ে যাবেন। পেশাদার লিগের দশ আসরের ছয়বারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। আকাশি-নীলের বর্তমান প্রজন্ম সেই কৃতিত্ব নিতে ছাড়বে কেন? মোহামেডান তো কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার অবস্থায়। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর থেকে আবাহনীর ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য। ফুটবলে ঘুণ ধরেছে, দর্শক মুখ ফিরিয়েছে, সমর্থকরাও ক্লাবমুখো হয় না, কিন্তু আবাহনী ফুটবল দলটা ঠিক নিজেদের সাফল্যের পথে হেঁটে চলেছে অবিচল। পেশাদার যুগে এমন না হলে চলে!

বর্তমান ফুটবলের প্রসঙ্গে সোনালি প্রজন্মের তারকাদের অনেকে লজ্জায় মুখ লুকান। কী ছিল তাঁদের তারকাখ্যাতি আর এখন কারা খেলেন! তবে গত দশ বছরে আবাহনীর ছয় শিরোপা জয়ের গর্বে এখন সেই সাবেকরাও ভাগ নিতে রাজি। আকাশি-নীলের সাবেক তারকা লেফট ব্যাক মাসুদ রানা যেমন বলছিলেন, ‘এই সময়ে মোহামেডানের মতো একটা দল প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আবাহনী যেভাবে ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, তা সত্যি গর্ব করার মতো। আবাহনীতে খেলেছি, ছোটবেলা থেকে আবাহনী সমর্থন করি, আবাহনীর এই শিরোপাজয় আমাকেও তাই একই রকম আনন্দে ভাসাচ্ছে।’ ইমতিয়াজ সুলতান জনি মোহামেডানে খেলেছেন, ক্লাবের স্থায়ী সদস্যও এখন। তবে আবাহনীতেও ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটানো তাঁর চোখে আবাহনীর টানা সাফল্য দেশের ফুটবলের জন্যই দারুণ ইতিবাচক, ‘আবাহনী-মোহামেডান ফুটবলের প্রাণ, যে যা-ই বলুক। মোহামেডান তো এখন পারছে না। কিন্তু আবাহনী থামেনি, তাদের শিরোপাক্ষুধাই দেশের অন্যতম সেরা একটা ক্লাবে পরিণত করেছে তাদের।’ পেশাদার লিগের শুরু থেকে আবাহনীর ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করা সত্যজিৎ দাস রূপু বলছিলেন তাঁদের এই শিরোপাক্ষুধা নিয়ে, ‘আবাহনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খেলে এসেছে, এখনো সেই একই মনোভাব কাজ করে সবার মধ্যে। সেরা হওয়ার এই লক্ষ্যে কখনোই আমরা ছাড় দিইনি।’

মোহামেডান যেখানে পথ হারিয়ে ফেলল, সেখানে আবাহনী কী করে ঘুণে ধরা সময়টা পাড়ি দিচ্ছে নিজেদের এমন লক্ষ্যে অবিচল থেকে; কোটি টাকার প্রশ্ন। আবাহনীর বর্তমান ডিরেক্টর ইনচার্জ কাজী নাবিল আহমেদ এতে নিজেদের আন্তরিকতাকে রাখেন সবার ওপরে, ‘আবাহনীকে শীর্ষস্থানে দেখতে ক্লাবের প্রত্যেকের যে আন্তরিকতা, সেই শক্তিতেই আমরা এগিয়ে চলছি। মোহামেডানের মতো ক্লাব তারাও যদি আরেকটু ভালো করে চেষ্টা করে নিজেদের ক্লাবকে শীর্ষে ফেরাবে সেটাও অসম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।’ আবাহনীর বর্তমান দলটার সিনিয়র খেলোয়াড় ওয়ালী ফয়সাল বলছিলেন ক্লাবের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে, ‘আমাদের ক্লাবে মনে কোনো কিছু নিয়ে কখনো দ্বিমত হয় না। আমরা রূপুদার কথা শুনি, নাবিল ভাই এসে আমাদের উৎসাহ দেন। অন্য ক্লাব কর্মকর্তারাও এর বাইরে কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। ফলে খেলোয়াড়রাও মাঠে পুরো মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এই শৃঙ্খলাটাই আমি মনে করি পেশাদার লিগে সাফল্যের পেছনে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

পেশাদার লিগের প্রথম তিন আসরেই হ্যাটট্রিক করা আবাহনীর এটি ষষ্ঠ শিরোপা। দশ আসরে বাকি চার শিরোপার তিনটি জিতেছে নতুন দল শেখ জামাল, একটি শেখ রাসেল। ১৯৭৩ সালে প্রথম বিভাগ ফুটবলে নাম লিখিয়েই আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই করে, শিরোপা আসে পরের বছরে। পঞ্চাশের দশকে বা তারও আগে দাপট দেখানো ওয়ান্ডারার্স মোহামেডানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ে যখন ঝিমুচ্ছে, তখনই আধুনিক ফুটবলের পতাকায় শোভিত হয়ে আবাহনীর উত্থান। শুরু নতুন বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন যুগের। ’৭৩ থেকে ’৯৩ পর্যন্ত আবাহনীর সমানসংখ্যক শিরোপা জিতেছে মোহামেডান, আটটি করে। ’৯৩-এ প্রথম বিভাগ বদলে প্রিমিয়ার লিগ হওয়ার পরও দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইটা চলতে থাকে। ২০০৭-০৮ মৌসুমে পেশাদার যুগের আগ পর্যন্ত মোহামেডানের শিরোপা চারটি, তিনটি আবাহনীর। পেশাদার লিগে এসেই সেই ব্যবধান ৬-০ করে ফেলেছে আবাহনী। তাই সেই ১৯৫৬ সালে প্রথম বিভাগ জেতা মোহামেডানের লিগ শিরোপা এখনো পড়ে আছে ১৯-এ, সেখানে আবাহনী ১৭ ছুঁয়েছে স্বাধীনতার পর শুরু করেও। আর দুটি লিগ শিরোপা হলেই ত্রিশের দশকে কলকাতা মোহামেডানের অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা ঢাকা মোহামেডানের এ যাবৎকালের শিরোপা জয়ের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবে তারা। সেই দিন খুব দূরে নয়, বলাই যায়। এ বছরই তারা টানা দ্বিতীয় লিগ শিরোপা জিতল।

নতুন দল সাইফ স্পোর্টিংয়ের চ্যালেঞ্জ ছিল। আগের মৌসুমে খেলা আবাহনীর জনা পাঁচেক তারকা ফুটবলারকে দলে ভিড়িয়ে নিয়েছিল তারা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম আবাহনী কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলেছে দিচ্ছে গত দুবছর ধরেই। শেখ জামাল ২০১০-১১ মৌসুমে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তো বড় দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই ঢাকা আবাহনীর মতো শিরোপা বুভুক্ষু হয়ে উঠতে পারেনি তাদের কোনোটিই।


মন্তব্য