kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

প্রথম গোলের গর্ব নিয়ে আমেরিকায় বসতি

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন শাহজাহান আলমের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রথম গোলের গর্ব নিয়ে আমেরিকায় বসতি

অনিন্দ্যসুন্দর সেই গোল দেখে দর্শকদের সে কী উচ্ছ্বাস! তাদের কথাবার্তা পরে অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন তিনি, ‘‘আমি সেই ম্যাচ খেলি ‘সাগর’ নাম নিয়ে। যেন দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের ওপর পাকিস্তানি আর্মি অত্যাচার না করতে পারে। প্রথম গোল করার পর ভারতীয় দর্শকরা নাকি বলছিল, ‘ছেলেটা কী গোল করল রে! এই সাগর তো দেখি ভগবানের ছেলে!’ সত্যি ওই গোলের স্মৃতি ভোলার নয়।’’

প্রথম একাদশে ছিলেন না তিনি। বদলি হিসেবে নামেন মাঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে টাচলাইন থেকে ভেসে আসে চমৎকার লব। বক্সের ঠিক ভেতরে বলটি ধরেন। বডিডজে ছিটকে ফেলেন মার্কারকে। এরপর দুর্দান্ত এক কোনাকুনি শট। বলের আশ্রয় জালে। গোল!

নদীয়া জেলা একাদশের বিপক্ষে গোলটির রিপ্লে যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পান আজও। শুনতে পান দর্শকদের সেই গগনবিদারী উল্লাস। তাতে একাকার হয়ে যায় ১৯৭১ ও ২০১৮। ভারতের কৃষ্ণনগর ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে টেলিফোনে ভেসে আসা কণ্ঠে তাই আবেগের উথালপাতাল ঢেউ। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম গোল বলে কথা! আর সেই প্রথম গোলদাতা শাহজাহান আলম।

‘আমাকে বলা হতো সুযোগসন্ধানী ফুটবলার। তা সুযোগে জীবনে কম গোল দিইনি। কিন্তু এই গোলটির মূল্য আলাদা। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমার চেয়ে ভালো ফুটবলার অনেকে আছেন। আমার চেয়ে বেশি গোল, ভালো ভালো গোল দিয়েছেন কতজন! কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম গোলটি তো আমারই থাকবে। কেউ কখনো তা কেড়ে নিতে পারবে না’—যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোনে শাহজাহানের গর্বিত কণ্ঠস্বর। স্মৃতির পুকুরে ঢিল পড়ায় রোমাঞ্চের তিরতিরে কাঁপন সেখানে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগেই ঢাকার মাঠে প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার শাহজাহান। রীতিমতো তারকা। ১৯৬৫ সালে রহমতগঞ্জ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। এরপর দিলকুশা হয়ে ইপিআইডিসিতে। যুদ্ধের আগের সর্বশেষ যে লিগ ১৯৭০ সালে, তাতে চ্যাম্পিয়ন দলের নিয়মিত একাদশের খেলোয়াড় তিনি, ‘ওই ইপিআইডিসি দলে ৯ জনই মাকরানি ফুটবলার। একাদশে শুধু দুজন বাঙালি। লেফট আউটে গাজী আর রাইট আউটে আমি।’

যুদ্ধ শুরুর পরও বাংলাদেশে ছিলেন শাহজাহান। বেরোনোর পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেই পথের দিশা নিয়ে আসেন মঈন সিনহা। তত দিনে কলকাতায় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি গঠিত হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জনমত তৈরির জন্য ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্তও পাকা। এবার খেলোয়াড় সংগ্রহের কাজ। তখনই দলের প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল কলকাতা থেকে বাংলাদেশে পাঠান মঈনকে। গল্পটি বলার সময় আবার আবেগ ভর করে শাহজাহানের কণ্ঠে, ‘প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরে আসে আবার মঈন সিনহা। আমাকে, লালুকে ও সাঈদকে খুলে বলে সব। ওর সঙ্গে আমরা তিনজন রওনা হই স্বাধীন বাংলা দলে খেলার জন্য।’

কিন্তু বললেই তো আর চলে যাওয়া যায় না। যুদ্ধের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা তখন ধ্বংসপ্রায়। তার ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের ভয়। বহু কষ্টে কুমিল্লা পৌঁছে হেঁটে হেঁটে তাই সীমান্ত পেরোতে হয় শাহজাহানদের, ‘বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমাদের তখন খালি গা। পরনে শুধু হাফপ্যান্ট। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে কখনো হেঁটে, কখনো দৌড়ে, কখনো ক্রল করে এগোতে হয়েছে। আগরতলা পৌঁছানোর পর কার্গো প্লেনে অবশেষে কলকাতা।’

এরপর ২৫ জুলাইয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কৃষ্ণনগরে নদীয়া জেলা একাদশের বিপক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম ম্যাচ। সেখানে শাহজাহানের প্রথম গোল। অনিন্দ্যসুন্দর সেই গোল দেখে দর্শকদের সে কী উচ্ছ্বাস! তাদের কথাবার্তা পরে অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন তিনি, ‘‘আমি সেই ম্যাচ খেলি ‘সাগর’ নাম নিয়ে। যেন দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের ওপর পাকিস্তানি আর্মি অত্যাচার না করতে পারে। প্রথম গোল করার পর ভারতীয় দর্শকরা নাকি বলছিল, ‘ছেলেটা কী গোল করল রে! এই সাগর তো দেখি ভগবানের ছেলে!’ সত্যি ওই গোলের স্মৃতি ভোলার নয়।’’ যেমনটা শাহজাহান ভোলেননি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতার নামও, ‘অবশ্যই প্যাটেল। তাজউদ্দীন সাহেবকে বলে দলের অনুমোদন নিয়েছে ও। খেলোয়াড় সংগ্রহ করেছে। আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করেছে। প্যাটেল না হলে স্বাধীন বাংলা দল তৈরি হতো না কিছুতেই।’

কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠাতা তো দুই ম্যাচের বেশি থাকতে পারেননি। বিপ্লবের মশাল জ্বালান যে প্যাটেল, নানা ঘটনাপ্রবাহের জেরে দল ছেড়ে চলে যেতে হয় তাঁকে। এ জন্য অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু ও সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরাকে দায়ী করেন শাহজাহান, ‘পিন্টু-প্রতাপের জন্যই প্যাটেল চলে যায়। ওই দুজনের শয়তানির শেষ নেই। এরা আমাদের কত উপদ্রব যে করেছে! প্রতাপদা নকল পুলিশ পর্যন্ত পাঠিয়ে হয়রানি করেছে আমাদের।’ কুকীর্তির কারণে তাঁরা তাই হারিয়েছেন সতীর্থদের শ্রদ্ধা, ‘পিন্টু ভাই ও প্রতাপদাকে তাই কেউ সম্মান করে না। অন্যদের যদি তারা সম্মান দিতে না পারে, তাহলে অন্যরা তাদের শ্রদ্ধা করবে কেন?’

যুদ্ধের পর শাহজাহানের ক্যারিয়ার এগোয়নি খুব একটা। ইপিআইডিসি নাম বদলে হয় বিআইডিসি। ওখানে এক মৌসুম খেলেন। এরপর ছিঁড়ে যায় হাঁটুর লিগামেন্ট। তখন তো আর এসবের চিকিৎসা ছিল না তেমন। বুটজোড়া তাই খুলে রাখতে হয় চিরতরে। এরপর ১৯৭৭ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান স্থায়ীভাবে। বেশ আছেন সেখানে। দুই ছেলে বড় হয়ে ধরেছে সংসারের হাল। অবসর জীবন কাটাচ্ছেন তাই শাহজাহান।

কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সব সতীর্থ তো তাঁর মতো ভাগ্যবান না। তাঁদের কথা ভেবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা শাহজাহানের মন পোড়ে, ‘আইনুল ভাই তো ক্যান্সারে মরেই গেলেন! তসলিম ভাই শুনেছি অভাবের মধ্যে আছেন। আরো অনেকের অবস্থা ভালো না। রাষ্ট্র যদি তাঁদের দায়িত্ব নেয়, ভালো লাগবে। আর যদি স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে দেশ আমাদের সম্মান জানায়, তাহলেও ভালো লাগবে খুব।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম গোল দেওয়ার ভালো লাগার সঙ্গে এই ভালো খবরগুলোর অপেক্ষায় থাকেন এখন শাহজাহান আলম। সেই সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসেও!


মন্তব্য