kalerkantho


মহাকাল ঠিক খুঁজে বের করবে তাঁকে!

সাইদুজ্জামান   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মহাকাল ঠিক খুঁজে বের করবে তাঁকে!

বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন নিমজ্জমান! ২০০৩ বিশ্বকাপে কেনিয়া আর কানাডার কাছে হেরে দল নানা উপদলে বিভক্ত। অতঃপর ছিন্ন মালা এক সুতায় গাঁথার নেতৃত্বটা দেওয়া হলো খালেদ মাহমুদকে, যিনি কোনোভাবেই নিরঙ্কুশ ‘পিপলস চয়েস’ ছিলেন না।

সে তুলনায় চন্দিকা হাতুরাসিংহের নাটকীয় অন্তর্ধান-পরবর্তী পরিস্থিতি অতটা নাজুক নয় মোটেও। তবু নতুন হেড কোচ নিয়োগের আগের ট্রানজিশন পিরিয়ডে আবারও মাহমুদের কাঁধে আস্থার হাত রেখেছে বোর্ড। তবে অধিনায়কত্ব পাওয়ার কালে গুটিকয় সমর্থক ছিল তাঁর পাশে। কিন্তু জাতীয় দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, বকলমে কোচ মাহমুদ একেবারেই ভক্তশূন্য। জনমত জরিপের উত্তাপেই কি না, সরাসরি ভারপ্রাপ্ত কোচ না বলে তাঁকে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের খটমটে পদ দিয়েছে বিসিবি। পাশাপাশি মাহমুদের ওপর থেকে শ্যেনদৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতির জন্য কখনো রিচার্ড হালসাল, কখনো বা মাশরাফি বিন মর্তুজা আর সাকিব আল হাসানকে কোচ বলে চালিয়ে দিয়েছেন বোর্ড সভাপতি।

তবে গতকাল ত্রিদেশীয় আসরপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফির পাশে বসে কোচিং-সংক্রান্ত খুঁটিনাটি প্রশ্ন নিয়েছেন এবং উত্তরও দিয়েছেন খালেদ মাহমুদ। তারও আগে, জাতীয় দলের দীর্ঘ ক্যাম্পে কোচের ভূমিকাতেই দেখা গেছে তাঁকে। অদ্যাবধি মাহমুদের এই ভূমিকা নিয়ে ক্রিকেটারদের তরফে বিরাগের কোনো খবর মেলেনি।

সাম্প্রতিককালে তামিম ইকবালের এক-দুটি মন্তব্যে কারণে-অকারণে রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়েছে বোর্ডকর্তাদের। যদিও বিপিএল সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস অধিনায়কের আরেকটি মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় হয়নি সেরকম, তবে অস্বস্তি তৈরি করেছিল ঠিকই, ‘আমার কাছে তিনি (মোহাম্মদ সালাউদ্দিন) আর সবার চেয়ে অনেক ভালো কোচ।’ সালাউদ্দিন যে কোচিং ডিগ্রি এবং সামর্থ্যে এগিয়ে, এমনটা ক্রীড়া সাংবাদিক মহলেও স্বীকৃত। তবে সেই তামিমও দিন দুয়েক আগে মাহমুদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘আমি জোর করে তো আর খারাপ বলতে পারি না। সত্যি বলছি, উনার (মাহমুদ) ট্রেনিংস সেশনগুলো খুব ভালো হচ্ছে। প্রতিটি বিষয় নিয়ে ট্রেনিং হচ্ছে, প্রত্যেকে সুযোগ পাচ্ছে।’ ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি কাল বলেছেন, ‘ড্রেসিংরুমের পরিবেশে সেই প্রেসারটা আর নেই।’ প্রধান কোচের কাছ থেকে এর বেশি আর কিছু তো চাওয়ার নেই খেলোয়াড়ের। তবে কি পরীক্ষায় নামার আগেই উতরে গেলেন মাহমুদ?

উহু, জীবন তার চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা দিয়ে শিখিয়েছে মাহমুদকে। তীব্রতর সমালোচনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন ১৯৮৩ সাল থেকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে জড়িয়ে পড়া এই অলরাউন্ডার। তিন দশকেরও বেশি সময় ক্রিকেটের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা মানুষটি নিজের সাফল্যের খতিয়ান হাতড়ে শুধুই বলেন, ‘কতটুকু কী পেরেছি জানি না, তবে আমি চেষ্টা করে গেছি। অধিনায়কত্ব যখন পাই, তখন দলে খণ্ড খণ্ড অনেকগুলো গ্রুপ। মাঠের মতো মাঠের বাইরেও আমার সমান কাজ ছিল। এখন যে দায়িত্ব পেয়েছি, সেটাতে কতটুকু সফল হব জানি না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।’ আর তাঁর কাছে ক্রিকেট হলো, ‘ক্রিকেটই আমার সব কিছু, ব্রেড অ্যান্ড বাটারও। ক্রিকেট ছাড়া আমার নিঃশ্বাসই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।’

এবারের ‘চেষ্টা’য় সাফল্যের সম্ভাবনা সম্ভবত বেশি করে দেখছেন খালেদ মাহমুদ, ‘অধিনায়কত্ব পাওয়ার তুলনায় এবারের দায়িত্ব কিছুটা সহজ মনে হচ্ছে। ২০০৩ সালে আমরা তো দল হিসেবেই গড়ে উঠতে পারিনি। কিন্তু এখন বাংলাদেশ যথেষ্ট শক্তিশালী দল। তামিমের কথা যদি বলি, ওকে শেখানোর কিছু নেই। ও নিজেই জানে কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে। দলে আরো এমন কয়েকজন খেলোয়াড় আছে, যেমন সাকিব, রিয়াদ, মুশফিক; ওরা সবাই প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটার, যাদের সঙ্গে আমি নিজেও খেলেছি। তাই আমাদের বোঝাপড়াটা খুব ভালো। টিমওয়ার্কটা খুব ভালো হচ্ছে।’

ধরুন, সেই টিমওয়ার্কে ভর করে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দারুণ কিছু করে ফেলল বাংলাদেশ দল। তাতেও কি খালেদ মাহমুদের ব্যাপারে জনমনের মোড় ঘুরবে? মনে হয় না। কারো কারো ভাগ্যে আসলে ওসব জোটে না। এই যেমন, মাহমুদের বোলিং নিয়ে জমজমাট সব ট্রল আছে। অথচ কি আশ্চর্য, এই যুগে তাঁর চেয়ে বাজে উইকেট গড় নিয়েও টেস্টে বোলিং করে যাচ্ছেন কোনো কোনো বাংলাদেশি পেসার! মাহমুদের ম্যাচের রং বদলানো ইনিংসের গল্প এখনো ঠাঁই পায় মাঝবয়সীদের ক্রিকেট আড্ডায়, যদিও স্মৃতিতে ব্যাটসম্যান মাহমুদ মানেই রিচার্ড জনসনের বাউন্সারে বাউন্সারে নাজেহাল মাহমুদ!

আজকের ‘বর্তমান’ যখন মধ্যবয়সে পা রাখবে, তখনো স্মরিত হবেন মাহমুদ। তবে সেটা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে’র কর্কশ উদাহরণ হয়ে। তিনি যে একাধারে বিসিবি পরিচালক, ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ক্লাব হয়ে এখন জাতীয় দলের কোচও! যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই স্বার্থের সংঘাত আত্মস্থ করে নিয়ে ক্রিকেট প্রশাসন।

কিন্তু মহাকাল ঠিক কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে একজন খালেদ মাহমুদকেই, এ যেন তাঁর নিয়তি!

সেই অভিজ্ঞতা থেকে কালও বলে গেলেন, ‘ক্রিকেটই আমার সব কিছু, ব্রেড অ্যান্ড বাটারও। ক্রিকেট ছাড়া আমার নিঃশ্বাসই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।’


মন্তব্য