kalerkantho


সামনে এসেও আড়াল ভাঙলেন না হাতুরাসিংহে

সামীউর রহমান   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সামনে এসেও আড়াল ভাঙলেন না হাতুরাসিংহে

বাংলাদেশে চন্দিকা হাতুরাসিংহে ছিলেন রক্তকরবীর রাজার মতো। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। দল নির্বাচন থেকে একাদশ বাছাই—সর্বত্রই অসীম ক্ষমতা। শ্রীলঙ্কা দলেও  যে একই রকম ক্ষমতার চর্চা তিনি করছেন, সেটা বোঝা গেছে অনুশীলনে গান শোনা বন্ধ করা ও আনকোরা পেসার শিহান মাদুশানকাকে বাংলাদেশ সফরের দলে নিয়ে। বাংলাদেশে পা দিয়ে গাম্ভীর্যের মুখোশটাকে আরো আঁটসাঁট করে নিয়েছেন হাতুরাসিংহে। কাল শ্রীলঙ্কা দলের বাংলাদেশে আসার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই তিনি এলেন। তবে কথা বললেন শুধুই এই সিরিজ নিয়েই। তাও এমনভাবে, মাত্র কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ থেকে তাঁর চলে যাওয়া এবং এসংক্রান্ত নানা ঘটনা যেন ঘটেইনি!

৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে এসেছিলেন হাতুরাসিংহে, বিসিবির সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা চুকিয়ে ফেলার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে। তাঁর বাংলাদেশের কোচের চাকরি ছাড়ার যেসব কারণ বোর্ড সভাপতি তাঁর মুখে বসিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় বসে তার বেশির ভাগই অস্বীকার করে উল্টো হাতুরাসিংহেই নাজমুল হাসানকে বলেছেন ‘চালাক লোক’। হাতুরাসিংহের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত এই ধোঁয়াশা কাটানোর উপায় ছিল না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে বসে সাম্প্রতিক অতীতের কোনো কিছু সম্পর্কেই মুখ খোলানো গেল না তাঁকে। বরং এসংক্রান্ত প্রশ্নে তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘আমি আমার পেশাগত দায়বদ্ধতা আর বিসিবির সঙ্গে বোঝাপড়া সংক্রান্ত কোনো কিছুই খোলাসা করব না। তাই আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না।’ অবশ্য এই এক প্রশ্নেই তো থেমে যাওয়া নয়! ঘুুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবেই তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল পদত্যাগের কারণ এবং প্রেক্ষাপট। কিন্তু সবই যেন বাউন্স করে ফিরে এলো নিরেট দেয়ালে। আবেগ তাঁকে ছুঁয়ে গেল সামান্যই, ‘আমাকে এখানে সাড়ে তিন বছরের মতো সময় যারা দেখেছে, তারা ভালো করেই জানে যে আবেগ আমাকে একদমই স্পর্শ করে না। আবেগের সম্পর্কে জড়াতে পছন্দও করি না।’ তাইতো বাংলাদেশের কোচ হয়ে নিজের দেশ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলাই হোক আর সাকিব-মাশরাফিদের সদ্য সাবেক কোচ হয়ে সেই শ্রীলঙ্কার তাত্ত্বিক ও কর্মগুরু হয়েই বাংলাদেশে প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে আসা, সবই তাঁর কাছে স্রেফ ‘কাজ’। সাবেক শিষ্যদের প্রতি তাঁর শুভ কামনা আছে, তবে সেটা নিজের দলের সাফল্য ছাপিয়ে নয়, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছি, অনেকের সঙ্গেই ভালো জানাশোনা হয়েছে। তাদের জন্য আমার শুভ কামনা রইল, তবে একই সঙ্গে আমি চাই শ্রীলঙ্কা এখানে ভালো করুক।’

কিছুদিন আগেও যাঁরা বাংলাদেশ দলের কোচ, বোলিং কোচ ও ম্যানেজারের দায়িত্ব সামলেছেন; তাঁরাই এই ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নেওয়া তিন দলের কোচের চেয়ারে। তাতে বড় ক্ষতিটা হয়তো হয়েছে বাংলাদেশেরই, প্রতিপক্ষ দুই কোচের মাথাতেই যে আছে তামিম-সাকিবদের শক্তি-দুর্বলতার ব্লু প্রিন্ট! বাংলাদেশের কোচ থাকার সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণপ্রাচীরের ছোট ছোট ফাটলগুলোও এড়ায়নি ধুরন্ধর ট্যাকটিশিয়ান হাতুরার। যদিও মুখে বলছেন, খবরাখবর নাকি পাওয়াই যায়, ‘আমার মনে হয় না এটা (আগে বাংলাদেশের কোচ থাকা) কোনো সুবিধা দেবে। এই সময়ে ক্রিকেটের অনেক তথ্যই পাওয়া যায়। খেলোয়াড়রাও প্রত্যেকে একে অন্যের সম্পর্কে জানে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও তো জানে আমি কিভাবে চিন্তা করি। তাই সত্যি কথা বলতে কোনো বাড়তি সুবিধাই নেই।’

শুরুতে বাংলাদেশ দলে শুধু কোচই ছিলেন হাতুরাসিংহে। নির্বাচকদের কাজে মাথা গলাতে গলাতে একটা সময় তিনি নির্বাচক প্যানেলে ঢুকে যান, হয়ে পড়েন অঘোষিত প্রধান নির্বাচকও। তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই হয়ে পড়ে শেষ কথা। তাঁর সময়ে লম্বা সময় পারফরম না করেও প্রতিভাবান তকমার জোরে জাতীয় দলে খেলে যাওয়া সৌম্য সরকার হাতুরা-পরবর্তী প্রথম সিরিজেই বাদ! সরাসরি তাঁর নাম উল্লেখ করেই প্রশ্ন করা হয়েছিল হাতুরাকে। তখন তিনি নৈর্ব্যক্তিক, ‘বাংলাদেশ দলকে একজন বা দুজন খেলোয়াড় দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। তারা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ এই এক-দুজন সর্বস্ব দল। আমার কোনো পছন্দের খেলোয়াড় নেই। যারা পারফরম করে, তারাই আমার পছন্দের পাত্র।’

বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই তাঁর। আগে যে কথাগুলোয় ‘আমরা’ বলতেন, এখন সেগুলোই হয়ে গেছে ‘তারা’, ‘দেশের মাটিতে বাংলাদেশ অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। গত আড়াই বছরে আমরা, এখানে আমরা বলতে বাংলাদেশ, ঘরের মাঠে মাত্র একটা সিরিজ হেরেছিলাম। বাংলাদেশ ওয়ানডেতে ভালো দল। তারা তাদের সামর্থ্যটা জানে আর সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করে কাজে লাগাতে পারে। যেকোনো দলের জন্যই এখানে খেলাটা বড় চ্যালেঞ্জ।’

সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের এই চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্তি হয়ে ওঠার অগ্রযাত্রায় হাতুরাসিংহের অবদান কম নয়। তবে বিদায়টা সুখকর হলে হয়তো আরো উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেতেন তিনি। আর অনেক প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় তাঁর প্রস্থান নিয়ে রহস্যটা থেকেই গেল।


মন্তব্য