kalerkantho


জিম্বাবুয়ে ও মিরপুরের ধূসর আউটফিল্ড

সাইদুজ্জামান   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জিম্বাবুয়ে ও মিরপুরের ধূসর আউটফিল্ড

দেশটির অলিম্পিকে সোনাজয়ী সাঁতারু আছে, গলফে বেশ সুনাম, আর সব দেশের মতো ফুটবল তো রক্তজুড়ে। তবু ক্রিকেটটাই জিম্বাবুয়ের ‘স্পোর্টিং লাভ স্টোরি’। কিন্তু ক্রমাগত প্রতারণা আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে সেই প্রেমকাহিনি এখন নিছকই কল্পকথা। একদা মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের আউটফিল্ডও সবুজ ছিল বললে যেমনটা শোনায় আর কি!

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট অনেক দিন ধরেই বেতন-ভাতা নিয়ে বিদ্রোহ, ভুল নীতি আর দুর্নীতিতে জর্জরিত। তাতে অধঃপতিত হিথ স্ট্রিকের জিম্বাবুয়েকে এখন ছিন্নভিন্ন করে মাশরাফি বিন মর্তুজার বাংলাদেশ। অথচ খুব বেশি আগে নয়, এই শতাব্দীর গোড়াতেও জিম্বাবুয়ের কাছে বাংলাদেশের হারটাই ছিল নিয়ম।

মাশরাফির সেই জিম্বাবুয়েকে দেখার সুযোগ হয়নি সেভাবে। ২০০৩ সালে ব্রায়ান মার্ফির নেতৃত্বে যে জিম্বাবুয়ে দল বাংলাদেশে এসেছিল, সেটি দেখেছে পূর্ণ গতির নড়াইল এক্সপ্রেসকে। তবে তত দিনে বেতন-ভাতা নিয়ে বিগ্রহ শুরু হয়ে গেছে জিম্বাবুয়েতে। কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতির ধাক্কায় ফোকাসটাই যেন নড়ে গেছে ক্রিকেটারদের।

তারও আগে, ২০০১ সালে নিজেদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে আফ্রিকা মহাদেশের ওপ্রান্তে গিয়েছিল বাংলাদেশ। আমিনুল ইসলামের গায়ে তখনো অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরির সৌরভ। অথচ হিথ স্ট্রিক, অ্যান্ডি ব্লিগনট, ব্রায়ান মার্ফিদের সামনে প্রবল চাপে পিষ্ট বাংলাদেশের ‘চার্লস ব্যানারম্যান’। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকে কেন্দ্র করে হাই প্রোফাইল ব্যাটিং অর্ডারের কথা না বললেও চলছে। তো সেই সময়ের শৌখিন ধূমপায়ী আকরাম খান প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালেও ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে বারবার আড়াল খুঁজেছেন। তত্কালীন প্রতিভাবান বলে স্বীকৃত আল শাহরিয়ার বুঝে পাচ্ছেন না কেন ব্যাটে-বলে হচ্ছে না! হাবিবুল বাশারের কেশবিন্যাস অবিন্যস্ত হওয়ার শুরু ওই সফরেই! এর মাঝে ‘ক্যারিং ব্যাট থ্রু দ্য ইনিংস’ খেলে নন্দিত জাভেদ ওমর ১৯৯৯ বিশ্বকাপের টিকিট হারিয়েছেন এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ঘরের মাঠে ধীরগতির একটি ইনিংস খেলে! মঞ্জুরুল ইসলামের ইনিংসে ৬ উইকেট প্রাপ্তিও ইতিহাসে লেখা আছে। তবে তাঁর চেয়েও বেশি মর্যাদা পেয়েছিল মোহাম্মদ শরিফের একটি ডেলিভারি। হারারের আলেকজান্দ্রিয়া গ্রাউন্ডে এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে তরুণ এই বাংলাদেশি পেসারের বল বেরিয়ে যাচ্ছে ভেবে ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হয়েছিলেন অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল। টেস্টে প্রায় তিন হাজার আর ওয়ানডেতে পাঁচ হাজার রানের মালিককে ওভাবে হতবুুদ্ধি বানানোর কৃতিত্ব জিম্বাবুইয়ানদের কাছে তারকা মর্যাদা পাইয়ে দিয়েছিল শরিফকে।

প্রায় দেড় যুগ পর সেই জিম্বাবুয়ে কাল মিরপুরে ধরাশায়ী। প্রত্যাশিত বলেই প্রথম ওভারে দুই উইকেট তুলে নিয়েও দর্শকদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করতে পারেননি সাকিব আল হাসান। ৩০তম ওভারেও স্লিপ কর্ডন রেখে বোলিং করিয়েছেন মাশরাফি। জিম্বাবুয়ে ইনিংসের আদ্যন্ত বৃত্তের ভেতরের ফিল্ডাররা ক্রমাগত নিঃশ্বাস ফেলে গেছেন জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের ঘাড়ে।

ড্রেসিংরুমে বসে দেখা এই ফ্রেমগুলো স্ট্রিককে আর পীড়া দেওয়ার কথা নয়। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের শীর্ষ থেকে অধঃপাতে যাওয়ার পুরোটাই তো ঘটেছে তাঁর চোখের সামনে। এই বাংলাদেশ ২০০৪ সালে জয়ের পর কি উদ্বাহু নৃত্যই না করেছিল হারারেতে। তখনো অধিনায়ক স্ট্রিক। সেই যে শুরু, এরপর যত দিন গেছে ততই উল্টো যাত্রায় দূরত্ব বেড়েছে দুই দলের। বলার অপেক্ষা রাখে না এগিয়েছে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে জিম্বাবুয়ে। একদা জিম্বাবুয়ের কারণে বিশ্বকাপের টিকিটের আশা ছেড়ে দিয়েই আইসিসি ট্রফি খেলতে যেত বাংলাদেশ। আর এ যুগে র‍্যাংকিংয়ের কঠিন লড়াইয়ে বাংলাদেশ সরাসরি বিশ্বকাপে আর জিম্বাবুয়ের ভাগ্য ঝুলে থাকে বাছাই পর্বে।

অদূর ভবিষ্যতেও এ দুরবস্থা থেকে জিম্বাবুয়ের পরিত্রাণের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দেশে ক্রিকেট প্রসারের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটসহ বিবিধ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইউনিয়ন। কিন্তু হারারের মাঠ আর হারানো দিনের রং ফিরে পায়নি। কর্তারা নাকে খত দিয়ে ডেভ হটন আর অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলের মতো সাবেকদের টেকনিক্যাল পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু ঘুণে ধরা সিস্টেম তাঁরাও সারাতে পারেননি। মনে আছে, ২০০১ সালের হারারে স্পোর্টস ক্লাব গ্রাউন্ডের উইকেট, আউটফিল্ড এমনকি সারিবদ্ধ প্র্যাকটিস উইকেট দেখে চোখ কপালে উঠেছিল বাংলাদেশ দলের। পরের দুইবারের সফরে সেই গোছানো হারারে স্পোর্টস ক্লাব গ্রাউন্ড ক্রমশই ধূসর হতে দেখেছি। সবশেষ ২০১৩ সালের জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে দেখি চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা। প্র্যাকটিস উইকেটের যাচ্ছেতাই অবস্থা। মূল উইকেট যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বের দিকে হাঁটছে। আর হারারের পুরনো কিউরেটর মনঃকষ্টে হটনের একাডেমির উইকেট নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো পার করছেন। বরার্ট মুগাবের প্রাসাদঘেঁষা জাকার‌্যান্ডা ঘেরা হারারে মাঠের সেই সবুজাভ ভাবটাও কেমন রং হারাতে শুরু করেছে।

এই রংবদল যেন দেশটির ক্রিকেট অধোগতিরই রূপক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা আত্মতৃপ্তি বোধ করতেই পারেন যে, মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটের আউটফিল্ড রং হারালেও মাঠের ক্রিকেটে বেশ বাড়বাড়ন্ত। একদার জিম্বাবুয়েকে এখন বলে-কয়ে উড়িয়ে দেন মাশরাফিরা। তবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে ছেড়ে দিয়ে মিরপুরে পাতা ক্রিকেটের ‘দ্বিতীয় সংসারে’র অবস্থা মোটেও সুবিধার নয়। আইসিসি থেকে দুটি ডিমেরিট পয়েন্ট পাওয়াতেই কিনা আরো ঝরা পাতার চেহারা নিয়েছে মিরপুরের আউটফিল্ড। মাশরাফি-সাকিবদের রমরমা ক্রিকেট দাপটের মাঝেও তাই ফেসবুকে শোক উথলে উঠেছে অনেকের। ২০১১ আর ২০১৮-র দুটি ছবি পোস্ট করেছেন অনেকেই। দুটিই মিরপুর স্টেডিয়ামের এরিয়াল ভিউ। প্রথমটি সবুজ গালিচা আর দ্বিতীয়টি ধূসর কোনো পুরাকীর্তি যেন! ‘হোম অব ক্রিকেট’ মর্যাদার সঙ্গে যা বড্ড বেমানান।

কার নির্বুদ্ধিতা কিংবা কার অদক্ষতায় এমনটা হলো, সেই উইচহান্টিং এখন আর না করাই ভালো। বরং সেই সবুজাভ ফিরিয়ে আনার চেষ্টাটা অন্তত হোক। নইলে আরো কাউকে জরিমানা করা যাবে হয়তো, তবে ‘দেশীয় ক্রিকেট মক্কা’র মানরক্ষা হবে না মোটেও! 


মন্তব্য