kalerkantho


অনুপ্রেরণার নাম রাজ্জাক-তুষার

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অনুপ্রেরণার নাম রাজ্জাক-তুষার

ক্রীড়া প্রতিবেদক : তিরিশেই সত্যিকারের কফিনে শুইয়ে দেওয়া হয় এ দেশের ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-২০ টুর্নামেন্টের রমরমা বাজারে তরুণরাও দীর্ঘ পরিসরের ঘরোয়া আসরে নামতে আলসেমি করেন। সেখানে মধ্য তিরিশের আব্দুর রাজ্জাক কিংবা তুষার ইমরানের অভীষ্ট লক্ষ্য কী? প্রথমজন প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫০০ উইকেট নিয়েছেন সদ্য সমাপ্ত বিসিএলের দ্বিতীয় রাউন্ডে। আর আট, নয় করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের দশ হাজারি ক্লাবেরও ‘উদ্যোক্তা’ তুষার।

আন্তর্জাতিক ড্রেসিংরুম এখনো শেয়ার না করলেও এবারের জাতীয় লিগেই খুলনা বিভাগের হয়ে একসঙ্গে এই দুজনের সঙ্গে খেলেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। এই প্রজন্মের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সঙ্গীদের পার্থক্যও পরিষ্কার জেনেছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক, ‘প্যাশন। খেলাটার প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা না থাকলে এই বয়সে এভাবে খেলে যাওয়া সম্ভব না। খুলনায় তুষারকে দেখেছি, ম্যাচের দিন ওয়ার্ম আপ সকাল সাড়ে ৮টায়। কিন্তু ও এসে তৈরি ৮টায়ই। এই বয়সেও তারা ক্রিকেটের প্রতি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ। যে ডেডিকেশন নিয়ে ওরা খেলে যাচ্ছে, তা বাকি সবার অনুসরণ করা উচিত। আমাদের মানসিকতা হলো, সাকিব-তামিম-মুশফিকরা কী বলছে, সেটা ফলো করা। কিন্তু আমি মনে করি ওদের (রাজ্জাক-তুষার) কাছ থেকে এসে এখানে (আন্তর্জাতিক পর্যায়ে) এসে খেলা।’

কিন্তু কে আর অনুসরণ করে ২০১৮ সালের রাজ্জাক-তুষারদের। সেদিন বিসিএলে এক দিনের খেলা দেখে এসে জনৈক তরুণের ওপর চরম বিরক্ত এক নির্বাচক। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করাতেই কিনা সে ম্যাচে এলোপাতাড়ি ব্যাট চালিয়ে আউট হয়ে গেছেন ওই তরুণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চৌহদ্দিতে থাকা আরেক পেস বোলার এক রাউন্ড খেলেই বিশ্রাম নিয়ে নিয়েছেন! সেখানে অবিরাম বোলিং করে যাচ্ছেন আব্দুর রাজ্জাক, তবে পারেন কারণ তিনি স্পিনার। তবু ১৭ বছরে ৩০ হাজারেরও বেশি বল তিনি করেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরো ১০ হাজার এবং লিস্ট ‘এ’তে প্রায় ১৩ হাজার। আর এ যুগের তরুণ এক সেঞ্চুরিতে যদি আত্মতৃপ্তিতে ভুগে থাকেন, তাহলে তাঁর জেনে নেওয়া ভালো যে, ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজ্জাকেরও এক বছরের সিনিয়র তুষারের সেঞ্চুরি এখন ২৫টি। একটি সেঞ্চুরি তাঁর ক্ষুধা বাড়িয়েছে শতগুণ। সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আর এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটা জাতীয় নির্বাচকদের নজরে থাকা কোনো অভিজ্ঞ কিংবা তরুণ নয়, তুষার ইমরানের।

কিন্তু একজন তুষার কিংবা রাজ্জাকের চেয়ে এক-দুটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেললেই খুলে যায় ফ্যান পেজ। সেখানে আব্দুর রাজ্জাক আর তুষার ইমরানের ল্যান্ডমার্ক সমাদর পায় সামান্যই। শুনে গুমরে ওঠেন মাশরাফি, অভিযোগের ছররা গুলি ছোড়েন তিনি, ‘প্লেয়ারদের কাছ থেকে বলেন, অবশ্যই পাচ্ছে। আমরা একটু আগে বাসে করে আসার সময়ও তাদের কথা বলছিলাম। তুষার ১০ হাজার রান করেছে, রাজ্জাক ৫০০ উইকেট নিয়েছে; তাদের যে সম্মানটা মন থেকে দেওয়া দরকার, খেলোয়াড়দের দিক থেকে দেওয়া হচ্ছে। তাদের সঙ্গে কথা বললেই আমার বিশ্বাস আপনারা এটা পরিষ্কার হবেন। আর আপনাদেরও (মিডিয়া) কিছুটা দায়িত্ব তো থাকেই।’

এটা ঠিক যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটসূচির ব্যস্ততায় ঘরোয়া ক্রিকেট অতটা জায়গা পায় না সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু ক্রিকেটের এই স্তরে সবচেয়ে বেশি নজরদারি দরকার ক্রিকেট বোর্ডের। ক্রিকেট প্রশাসন কতটা আগ্রহী তুষার আর রাজ্জাকের অর্জনকে সম্মান জানাতে? গতকাল পর্যন্তও সেরকম কোনো উদ্যোগের কথা শোনা যায়নি। যদিও ঘরোয়া ক্রিকেটই আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরির ক্ষেত্র। সেই ক্ষেত্র থেকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তুলে আনেন নির্বাচকরা। তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেতে কিংবা ফিরতে উন্মুখ খেলোয়াড়ের চোখ খুঁজে ফিরে নির্বাচকদের। কিন্তু তুষারের মন্তব্য যদি সত্যি হয়, তবে তা খুবই দুঃখজনক, ‘নির্বাচকরা মাঠে এসে খেলা দেখেন না, কিন্তু একটা ধারণা (স্কোরকার্ড দেখে) তো ঠিকই পান।’ সেই ধারণার সূত্র ধরে অন্তত ‘এ’ দল কিংবা ‘এইচপি’তে খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পরীক্ষা দিতে চান প্রায় এক দশক আগে শেষ টেস্ট খেলা তুষার।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আশার কথা আর সরাসরি বলেন না আব্দুর রাজ্জাক। একদা ওয়ানডেতে বাংলাদেশের শীর্ষ এই বোলারের চাওয়ায় পৌরুষের সঙ্গে মিশে চাপা অভিমানও, ‘আমি বীরের মতো খেলেই চলে যাব।’

একদিন তো যাবেনই, তবে চিরদিন থেকে যাবে তাঁদের কীর্তি। এখন যদি আব্দুর রাজ্জাক আর তুষার ইমরানের কীর্তির দিকে তাকিয়ে অনুপ্রাণিত হন আগামীর তারকারা।


মন্তব্য