kalerkantho


এই মুশফিক অনেক বিবর্ণ

নোমান মোহাম্মদ   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এই মুশফিক অনেক বিবর্ণ

বাংলাদেশ ক্রিকেটাকাশে তখনো তারকাকুলে বৃহস্পতি মোহাম্মদ আশরাফুল। তাঁর অনন্তকাল পরমায়ুর ইনিংসগুলোর চর্চা চলে প্রতিনিয়ত। কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ক্ল্যাপস্টিক ইনিংস, কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিপ্লব, গায়ানায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রাজসিকতা, চট্টগ্রামে ভারতের বিপক্ষে সৌন্দর্য ছড়ানো ইনিংসগুলোর গল্প বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনে সৌরভ ছড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। গুনগুনিয়ে উড়ে বেড়ায়।

কিন্তু জাতীয় দলের তখনকার কোচ জেমি সিডন্সের কাছে যেই না কেউ আশরাফুল-বন্দনা শুরু করেন, ওই অস্ট্রেলিয়ান থামিয়ে দেন একটিমাত্র প্রশ্নে—ওর গড় কত?

রেকর্ড-পরিসংখ্যানের বড্ড ভক্ত ছিলেন সিডন্স। তবে তা চন্দিকা হাতুরাসিংহের মতো নয়। নির্বাচক কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির পর সাবেক এই কোচের ওই পরিসংখ্যানপ্রিয়তার প্রমাণ বহুবার পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্দরমহল। নিজ যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য ল্যাপটপে যে থরে থরে থাকত রেকর্ডের ডালি! তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠার তাই সাধ্যি কী!

তো সেই হাতুরাসিংহে যখন পরিসংখ্যানের দোহাই দিয়ে টি-টোয়েন্টি থেকে মুশফিকুর রহিমকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন, তা অযৌক্তিক ছিল কতটা? রেকর্ড বই যে সাক্ষ্য দিচ্ছে, কুড়ি-বিশের ফরম্যাটে তাঁর গড় মাত্র ১৬.৮৪! হাতুরাসিংহে যুগ পরবর্তী টি-টোয়েন্টি জমানায় এখন তাই নিজেকে নতুন করে প্রমাণের ভীষণ দায় মুশফিকের।

এমনিতে ওই প্রবাদটি কে না জানেন— ‘মিথ্যা তিন প্রকার। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান।’ ক্রিকেটেও তা প্রযোজ্য অনেক সময়। কোনো সেঞ্চুরির চেয়ে একটি ছক্কাই অনেক সময় মহার্ঘ হয়ে ওঠে। পাঁচ উইকেটের চেয়ে একটি ব্রেক থ্রু হয় ম্যাচের মোড় ঘোরানো প্রভাবক। তবে মোটা দাগে পরিসংখ্যানকে উপেক্ষার উপায়ও তো নেই। বিশেষত ৬১ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মুশফিকের মোট রান যখন হাজার হয় না; গড় পড়ে থাকে ১৬.৮৪-তে; পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংসের সংখ্যা মোটে এক!

বাংলাদেশের সেরা দুই ব্যাটসম্যানে তামিম ইকবালের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দি যিনি, এমন পরিসংখ্যান তো তাঁর প্রতিভার প্রতিফলক নয় কিছুতেই।

২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। মুশফিক ছিলেন তাতে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এই ফরম্যাটে সাকুল্যে যে ৬৯টি ম্যাচ খেলেছে, এর মধ্যে শুধু আটটিতে ছিলেন না তিনি। ৬১ ম্যাচের ৫৩ ইনিংসে ব্যাট হাতে যান ক্রিজে। মোট রান মোটে ৭৪১। ৯ বার অপরাজিত থাকায় গড় ১৬.৮৪, নইলে তা নামত আরো নিচে। একমাত্র ফিফটি ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায়। চার নম্বরে নেমে ২৯ বলে ৫০ করেন সাত চার ও এক ছক্কায়।

ওই একবারই। এ ছাড়া আর কখনো পঞ্চাশ করতে পারেননি মুশফিক। বদলে যাওয়া ক্রিকেটে এখন তো অবশ্য টি-টোয়েন্টিতে ‘থার্টি’ও বড় স্কোর! মুশফিকের ব্যাটে তা-ও ওই ফিফটির বাইরে মাত্র চারবার। এর মধ্যে একটিই কেবল সত্যিকার ম্যাচ জেতানো ইনিংস। ২০১১-র অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ছয় নম্বরে নেমে ২৬ বলে অপরাজিত ৪১ রান করে দলকে জেতান রুদ্ধশ্বাস প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর। মাত্র এক বল বাকি থাকতে।

এই দু-একটি ব্যতিক্রম কেবল যেন নিয়মকে প্রমাণ করার জন্য। সে নিয়মটা কী? টি-টোয়েন্টিতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ মুশফিক। ৫৩ ইনিংসের মধ্যে ২৩ বারই তিনি আটকে যান এক অঙ্কে। শতকরা হিসেবে যা ৪৩.৩৯; যে পরিসংখ্যান রীতিমতো আঁতকে তোলার মতো। ১০ থেকে ২০-এর ভেতরে আটকা আরো ১৭টি ইনিংস; যা ৩২.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ, কুড়ি-বিশের ক্যারিয়ারে ৫৩ ইনিংসের মধ্যে ৪০ বারই মুশফিক পেরোতে পারেন না ২০ রান। যা ৭৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। প্রতি চার ইনিংসের মধ্যে তিনবারই যদি ২০-এর নিচে থেমে যায় দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান, দল তাহলে ভালো করবে কিভাবে!

মুশফিকের জন্য আজ থেকে শুরু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ তাই অন্য রকম চ্যালেঞ্জের উপলক্ষ। কিন্তু ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে হতচ্ছাড়া ইনজুরি যে আবার পিছু নিয়েছে! কবজির সেই ব্যথার কারণে তাঁর আজকের ম্যাচ খেলা নিয়েও রয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা। তবে তা ম্যাচ থেকে ছিটকে ফেলার মতো নয় বলেই খবর।

চন্দিকা হাতুরাসিংহে অবশ্য মুশফিককে ছুড়েই ফেলতে চেয়েছিলেন টি-টোয়েন্টি থেকে। তাঁর পক্ষে ছিল পরিসংখ্যান। আর মুশফিকের পক্ষে রয়েছে প্রতিভা। এবং তিন প্রকার মিথ্যার সেই প্রবাদ। আজ প্রতিপক্ষের ডাগআউটে থাকা হাতুরাসিংহেকে তা দেখিয়ে দেওয়ার দায় মুশফিকের।

আশরাফুলের গড় নিয়ে সিডন্স যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুন না কেন, তাঁর ওই হিরণ্ময় ইনিংসগুলোকে অস্বীকারের জো নেই। মুশফিকের টি-টোয়েন্টি ভাণ্ডারে তো কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওই ইনিংসটি ছাড়া আর কিছুই নেই। আজ শূন্য থেকে শুরুর চ্যালেঞ্জ তাই মুশফিকুর রহিমের।

আর কী আশ্চর্য, সেই শুরুটা কিনা হাতুরাসিংহের দলের বিপক্ষেই!


মন্তব্য