kalerkantho


বার্সেলোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট!

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বার্সেলোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট!

কলম্বো থেকে প্রতিনিধি : আচরণ ও ক্ষমতার চর্চার কথা বললে, চন্দিকা হাতুরাসিংহের সঙ্গে তুলনা চলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বর্তমান কোচ হোসে মরিনহোর। দুজনেরই নিজ নিজ দলে একচ্ছত্র আধিপত্য, ড্রেসিংরুমে তাঁদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হাতুরাসিংহে আর বার্সেলোনার কোচ এর্নেস্তো ভালভের্দেকে করেছে অনেক কাছাকাছি! লিওনেল মেসির দৌড়ের গতি, স্বাস্থ্যের খোঁজখবর, ম্যাচে গোলসংখ্যা—এসব বিশ্লেষণ করতে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করেন ভালভের্দে, সেই একই সফটওয়্যার ব্যবহার করেই কুশল পেরেরার ব্যাটিং, থিসারা পেরেরার বোলিংয়ের খোঁজখবর রাখেন হাতুরাসিংহে। বার্সেলোনা ক্লাবের ব্যবহার করা এ প্রযুক্তিটাই অনেক অর্থ খরচ করে কিনে এনে ব্যবহার করছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি), যেটির তত্ত্বাবধান করছেন বব উলমারের একসময়ের শিষ্য এবং ইংল্যান্ডের সাবেক কাউন্টি ক্রিকেটার সাইমন উইলস।

সিনামন গার্ডেনস রোডে এসএলসির কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে বোর্ডের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার ‘ব্রেইন সেন্টার’। মজা করে উইলস যেটিকে বলছেন, ‘ক্রিকেট কোচদের ফেসবুক’! নিজেদের উদ্ভাবিত বিশেষ একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে জাতীয় দল, ‘এ’ দল, বয়সভিত্তিক দল, স্কুল দলের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স। সেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভিডিও লাইব্রেরি থেকে কোনো ব্যাটসম্যান বা বোলারের ভিডিও দেখা যায়। জানা যায়, নির্দিষ্ট কোনো শট বা ডেলিভারিতে কারো কোনো দুর্বলতা আছে কি না। তা ছাড়া খেলোয়াড়দের কাজের ভার, শারীরিক ধকল, বিশ্রাম, চোটের অবস্থা, সব কিছু জানতে পারবেন কোচ, নির্বাচকরা এমনকি খেলোয়াড় নিজেও। যাঁর উৎসাহে ও নির্দেশনায় এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করছে এসএলসি, তাঁর নাম সাইমন উইলস। ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টির সাবেক এ ক্রিকেটার একটা সময় ঘনিষ্ঠ ছিলেন প্রয়াত ক্রিকেট কোচ বব উলমারের। ইংল্যান্ডের সাবেক এ ক্রিকেটারই ক্রিকেটে প্রথম প্রযুক্তির ছোঁয়া নিয়ে এসেছিলেন। শুরুতে তাঁকে ‘ল্যাপটপ কোচ’ বলে অনেকে সমালোচনা করলেও পরে অনেককেই নিজের কথা গিলতে বাধ্য করেছিলেন উলমার। সেই উলমারের শিষ্য উইলস আর দক্ষিণ আফ্রিকান ট্রেনার নিক পোথাস, এ দুজন মিলেই কাল জানালেন কী করে কাজে লাগানো হবে ক্রিকেটের এই ফেসবুক।

গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেক কিছুই খুলে বলেননি উইলস, তবে বেশ লম্বা আলাপে যেটা বোঝা গেল; অনেকগুলো প্রগ্রামের সমষ্টি এ সফটওয়্যার। যা আসলে তথ্যগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে কোচ, নির্বাচক, প্রশাসক ও খেলোয়াড়দের সামনেই নিয়ে আসছে। ভিডিও আর্কাইভ অংশে আছে নানা বোলারের ভিডিও ফুটেজ, নানা জায়গায় সম্প্রচারিত হওয়া খেলার ফুটেজ ধরে রাখা হচ্ছে ভিডিও লাইব্রেরিতে। সেখান থেকেই চাহিদামতো মাশরাফির অ্যাকশন বা মুস্তাফিজের কাটার দেখে নেওয়া সম্ভব। চিকিৎসক ও ট্রেনারদের মানদণ্ডের ভিত্তিতে ট্রাফিক সংকেতের মতোই প্রতিটি খেলোয়াড়ের প্রফাইলে থাকবে লাল, হলুদ বা সবুজ সংকেত। লাল মানে খেলার উপযুক্ত নন, হলুদ মানে ইনজুরি থেকে সেরে উঠলেও সেরা মানদণ্ডে নেই আর সবুজ মানে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আর খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থার সার্বক্ষণিক অবস্থা জানতে বিশেষ জিপিএস ট্যাগিং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে এসএলসি, যার মাধ্যমে খেলার সময়ই জানা যাবে ক্রিকেটারের শারীরিক অবস্থা। উইলস জানালেন, ‘একেকজন ক্রিকেটারের ঘাড়ের কাছে আমরা একটা সেন্সর লাগিয়ে দিয়েছি, যেটাকে বলা যায় যান্ত্রিক ছারপোকা। সেই যন্ত্র থেকেই আমরা একজন খেলোয়াড় মাঠে কতটা দৌড়াল, তার সর্বোচ্চ গতি কত, তার হৃৎস্পন্দন কত ছিল, দেহের তাপমাত্রা কত ছিল, কখন সে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স করেছে, কতটা অনুশীলন করেছে আর কতটা বিশ্রাম দরকার দেহের; সব বের করা সম্ভব।’

এ যেন ক্রিকেট কম, ব্যবসার হিসাব-নিকাশ! কোথায় দাম বাড়ছে, কোথায় কমছে, কোথায় শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি আর কোথায় দাম পড়তির দিকে—এসবের হদিস। উইলস নিজেও একসময় মানলেন, এই খুঁটিনাটি তথ্যগুলো আসলে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য, ‘আমরা অজুহাত না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে চাই। কোচ জানবেন কোন খেলোয়াড়টির সামর্থ্য কেমন, নির্বাচকরা দেখবেন কার পারফরম্যান্স কেমন। তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। উইলস কাজ করছেন প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। শ্রীলঙ্কা দলে কিছুদিন আগেই যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে। তিনি কতটা নির্ভর করেন এই প্রযুক্তির ওপর? তাঁর কাছে সংখ্যা আগে না ইন্দ্রিয়? এমন প্রশ্নের জবাবে উইলস বললেন, ‘একদমই যে দেখেন না সেটাও নয়, আবার সব সময় যে দেখেন, তাও নয়। ধরাবাঁধা কিছু নেই।’ উইলসকে একটা ‘কেস স্টাডি’ জিজ্ঞেস করতেই বোঝা গেল শুধু যান্ত্রিক মগজ নয়, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি আসে কোনো ক্রিকেট মস্তিষ্কের কোষ থেকেই, ‘দাশুন মাদুশাঙ্কার কথা জানতে চাইছিলেন তো! হাতুরা আমাদের কাছে ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারে এমন বোলারের তালিকা চেয়ে পাঠান। আমরাও ডাটা বেইজ খুঁজে ২০-২২ জনের একটা তালিকা তাঁকে পাঠাই। তাদের তিনি বোলিং করার জন্য নেটে ডাকেন, বোলিং পর্যবেক্ষণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মাদুশাঙ্কাকে জাতীয় দলের জন্য বেছে নেন। ব্যাপারটা এভাবে কাজ করে। ধরুন কোচ এখন একজন লেট মিডল অর্ডার বাঁহাতি ব্যাটসম্যান চাইছেন, যার স্ট্রাইক রেট ১০০-এর ওপরে। আমরা ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স কম্পিউটারে পর্যালোচনা করে সেই সব ব্যাটসম্যানের নাম কোচ ও নির্বাচকদের কাছে পাঠিয়ে দেব।’

এ প্রযুক্তির মারপ্যাঁচে প্রতিভা হারিয়ে যাবে না তো! মুত্তিয়া মুরালিধরন, লাসিথ মালিঙ্গাদের মতো ক্রিকেটারদের ছোটবেলায় অ্যাকশন বদলে দিলে আজ কি তাঁরা এই পর্যায়ে আসতে পারতেন? উইলসের উত্তর, ‘আমরা জুনিয়র কোচদের বলে দিয়েছি, স্বাভাবিক বিকাশের পথটা যেন বন্ধ না হয়। আমরা শুধু প্রতিভাদের সঠিক পথটা দেখাতে চাই।’ মেসির গায়ে লাগানো জিপিএস ট্র্যাকার দিয়ে তাঁর দৌড়ের গতি, মাঠে কতটা দৌড়ালেন এসব তো জানছেন ভেলভের্দে। কিন্তু কোন জাদুতে অল্প জায়গায় বলটাকে পায়ে পোষা বিড়ালের মতো লাগিয়ে পাঁচ-ছয়জনকে কাটিয়ে বেরিয়ে যান, সেই রহস্যের ব্যাখ্যা পৃথিবীর কোনো কম্পিউটারের কাছেই নেই। এসব গুচ্ছের সফটওয়্যার ছাড়াই তো দুটো বিশ্বকাপ (৫০ ওভার ও টি-টোয়েন্টি) জিতেছে শ্রীলঙ্কা। দেখা যাক, বার্সেলোনার প্রযুক্তি তাদের কোন উচ্চতায় নিয়ে যায়!


মন্তব্য