kalerkantho


কলম্বো ডায়েরি

ড্রাগনের ডাকে জাগছে সিংহ!

সামীউর রহমান, কলম্বো থেকে   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ড্রাগনের ডাকে জাগছে সিংহ!

কলম্বোয় পা রেখেছি এক সপ্তাহ হয়ে গেল। থাকছি ওয়েলাওয়েত্তে এলাকায়, প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম খেত্তারামায়, বাংলাদেশ দল থাকছে কোলোপেটিয়ার মুভ অ্যান্ড পিক হোটেলে আর সিনামন গার্ডেনস এলাকাতেই সিংহলিজ ক্রিকেট ক্লাব, কলম্বো ক্রিকেট ক্লাবসহ আরো অনেক ক্লাবের ঠিকানা, এখানেই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের অফিস। চেনাজানার গণ্ডিটা এতটুকু। প্রথম কিছুদিন অটোরিকশা চালকদের চালাকির খপ্পরে পড়ে এখন চলাচলে উবারই ভরসা। খেলা শেষে মাঝরাতে হোটেলে ফেরার পথে প্রায়ই চোখে পড়ে বেশ হেলমেট মাথায় ওভারঅল পরা চীনা শ্রমিকদের পেছনে বসিয়ে ছুটে চলা কোনো না কোনো পিকআপ ট্রাক। কাল সকালেই কলম্বো ক্রিকেট ক্লাব থেকে হোটেলে ফিরতেই দেখি চীনা মহিলাদের বিশাল একটা দল এসে চেক ইন করছেন। ব্যাপারটা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে খানিকটা আলাপ করে জানলাম, শ্রীলঙ্কায় ক্রমেই বাড়ছে চীনের বিনিয়োগ। সেই সঙ্গে বাড়ছে চীনা পর্যটকের সংখ্যাও।

কলম্বোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ গল ফেস। ভারত মহাসাগরের দিকে মুখ করে এখানে দাঁড়ালে দেখা যায় সুনীল সাগরের ফেনিল জল কিভাবে ধুয়ে দিচ্ছে শ্রীলঙ্কার উপকূল। এখানেই এত দিন একক রাজত্ব ছিল পাঁচ তারকা হোটেল ‘তাজ সমুদ্র’র, বিত্তশালী বিদেশি পর্যটকদের প্রথম পছন্দ ছিল ভারতীয় ব্যবস্থাপনার এই হোটেল। এখানেই থাকছে ভারতীয় দল। গত বছর তাজ সমুদ্রর পাশেই মাথা তুলেছে সাংগ্রিলা হোটেল। তাজ সমুদ্রর পাশে গত বছর থেকে চালু হওয়া হংকংভিত্তিক সাংগ্রিলা হোটেল যেন একটা প্রতীক! লম্বা সময় শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ছিল ভারতের। সম্রাট অশোকের ছেলে মাহিন্দাই প্রথম শ্রীলঙ্কায় আসেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে, সঙ্গে এনেছিলেন পবিত্র বোধিবৃক্ষের শাখা। সেই সুপ্রাচীন সময় থেকেই পক প্রণালির দুই প্রান্তের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু এখন শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও অর্থনীতি দিল্লির চেয়ে অনেক বেশি বেইজিংমুখী।

গল ফেসেই সমুদ্রের ভেতর জায়গা ভরাট করে তৈরি হচ্ছে কলম্বো ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সিটি। যা হবে দুবাই, সিঙ্গাপুরের মতো আরেকটি অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। এই বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে চায়না হারবার কনস্ট্রাকশন কম্পানি আর চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ সংস্থা সিসিসিসি। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল অবিনায়কে কিছুদিন আগে নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, এই নতুন কলম্বোকে তাঁর সরকার গড়ে তুলতে চায় দুবাই, সিঙ্গাপুরের আদলে। নির্মাণযজ্ঞ শেষ হলে ৮৩ হাজার নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে, আসবে বিদেশি বিনিয়োগ।

সামরিক সহায়তাও চীন থেকে পাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। অস্ত্র, যানবাহন আসছে চীন থেকে, সেনা কর্মকর্তাদের পাঠানো হচ্ছে প্রশিক্ষণে। ভারত মহাসাগরে চীনের যে সামরিক বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ‘স্ট্রিং অব পার্লস’, তাতে কলম্বো বড়সড় একটা ‘মুক্তা’। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের স্বপ্নের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর অংশ সাগরপথের অংশ যেটাকে বলা হচ্ছে মেরিটাইম সিল্ক রোড, সেই মানচিত্রেও কলম্বোর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছর চারেক আগে কলম্বোয় চীনা পারমাণবিক ডুবোজাহাজ আসায় বেশ উষ্মাই প্রকাশ করেছিল দিল্লি। তাই গত বছর, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের কাছাকাছি সময়ে আরেকটি চীনা ডুবোজাহাজ কলম্বোয় ভিড়তে চাইলে অনুমতি দেয়নি শ্রীলঙ্কা। এতে বোঝা যায়, দিল্লিকেও চটাতে চাইছে না কলম্বো। তবে মূল হাওয়াটা বেইজিংমুখী।

এ তো গেল কূটনীতির কূটকচালি। সাধারণ চীনা নাগরিকরাও কিন্তু অনেকেই ঘুরতে আসছেন কলম্বোতে। ২০১৫ সালেই এসেছিলেন ১৮ লাখ, পরের বছরের প্রথম সাত মাসেই এসেছিলেন ১৬ লাখ, সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে। এ ছাড়া চীনা ও হংকংয়ের পুঁজিপতিরা বিনিয়োগের জন্যও বাড়ি কিনছেন কলম্বোতে। শহরে বাড়ছে চীনা খাবারের দোকানের সংখ্যা, রাস্তায় টাটা আর মারুতি সুজুকির পাশাপাশি শ্রীলঙ্কাতেই সংযোজিত চীনা গাড়িও দেখা যাচ্ছে বেশ।

চীনা ড্রাগন জাগিয়ে তুলছে সিংহলের সিংহকে। গৃহযুদ্ধের ক্ষত মুছে স্বপ্ন দেখাচ্ছে সমৃদ্ধ আগামীর। এসব দেখে মনের ভেতর জাগে একটাই প্রশ্ন, আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে?


মন্তব্য