kalerkantho


পুনর্জন্মেও ফুটবলারই হতে চাই

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



পুনর্জন্মেও ফুটবলারই হতে চাই

ছবি : মীর ফরিদ

ইদানীং তাঁর সংগঠক পরিচয়টা এত বড় হয়ে গেছে যে অনেকে মনেই রাখেন না একসময় সত্যজিৎ দাস রুপু ছিলেন অসাধারণ এক ফুটবলার। দেশের ফুটবলে প্রথম ‘গোল্ডেন গোল’ তাঁর। কিন্তু আলাদা কীর্তির জন্য নয়, বরং তাঁর ফুটবলের সামগ্রিকতা—বিভিন্ন পজিশনে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে রেখেছিল নিজের প্রজন্মে। সঙ্গে ডিফেন্স ভাঙা পাস দেওয়ার অদ্ভুত ট্রেডমার্ক সৌন্দর্যটা তো ছিলই। এক বিকেলে সেসব সোনালি গল্প শুনতে বসলেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ফুটবলের একটি ‘প্রথম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আপনার নাম। প্রথম ‘গোল্ডেন গোল’ দিয়েছেন আপনি; ১৯৯৫ সালের ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে মোহামেডান-ব্রাদার্স ম্যাচে। মনে আছে?

সত্যজিৎ দাস রুপু : মনে আছে। সেবারই প্রথম আমাদের দেশে চালু হয় এই গোল্ডেন গোলের নিয়ম; অর্থাৎ নকআউট পর্বে ৯০ মিনিট শেষে খেলায় সমতা থাকলে অতিরিক্ত সময়ে যে দল আগে গোল করবে, তারাই বিজয়ী। আমি ওই বছরই মোহামেডানে যাই। ব্রাদার্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালের নির্ধারিত সময় শেষ হয় গোলশূন্য। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেই কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে হেড করে গোল দিই। আমার গোল্ডেন গোলে জিতে ফাইনালে ওঠে মোহামেডান। পরে চ্যাম্পিয়নও হই আমরা।

প্রশ্ন : মোহামেডানে ওই এক মৌসুমই তো খেলেন আপনি?

রুপু : হ্যাঁ।

প্রশ্ন : ‘আবাহনীর রুপু’র কাছে সাক্ষাৎকারের এই শুরুর দিকে দুটি ম্যাচের কথা জানতে চাই। দুটিই মোহামেডানের বিপক্ষে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালের লিগের খেলা দুটি নিশ্চয় ভোলেননি?

রুপু : ’৮৬ সালের বলতে মনুর ওই গোলের ম্যাচের কথা জিজ্ঞেস করছেন তো?

প্রশ্ন : ঠিক তাই। যেখানে প্রথম একাদশে সুযোগ পাননি আপনি!

রুপু : আমাদের সঙ্গে প্রেমলাল, পাকির আলীরা পুরো লিগই খেলেছে। ওই খেলার আগে ভারত থেকে নিয়ে আসা হয় চিমা, মনোরঞ্জন, ভাস্কর গাঙ্গুলিকে। আমি তখন আবাহনীর প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়; লিগের সব ম্যাচে খেলেছি প্রথম একাদশে। কিন্তু বিদেশিদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য আমাকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়। ডিফেন্সে ইউসুফকেও খেলানো হয়নি। পরে আমাকে নামানো হয়; চিমাকে ভালো একটি বল বানিয়েও দিয়েছিলাম। কিন্তু ও গোল করতে পারেনি। আর মনু সেদিন যে গোল দেয়, তা ঢাকার দর্শকরা কোনো দিন ভুলবে না। এই যে কিছুদিন আগে ও মারা গেল, তখনো সবার মুখে মুখে ওই গোলের কথা।

প্রশ্ন : পরের বছর সামির শাকের, করিম মোহাম্মদদের সঙ্গে খেলেছিলেন মোহামেডানের বিপক্ষে। সম্ভবত ডিফেন্সে। পুরনো দিনের অনেকে সেটিকে আপনার খেলা অন্যতম সেরা ম্যাচ বলে মনে করেন। আপনি কী বলবেন?

রুপু : আমি সম্ভবত রাইট ব্যাকে শুরু করেছিলাম। পরে মিডফিল্ডে চলে আসি। সেদিন আসলে পুরো মাঠজুড়েই খেলেছি। বিশ্বকাপ খেলে আসা ওই ফুটবলারদের পাশাপাশি আমার খেলা আলাদা করে নজর কেড়েছে, এখনো কেউ আপনাকে সেই ম্যাচের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে—তার মানে বোধ হয় ভালোই খেলেছিলাম। তবে আপনি আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচর কথা বারবার জিজ্ঞেস করছেন তো! সবচেয়ে তৃপ্তির ম্যাচের কথা কিন্তু এখনো জানতে চাইলেন না!

প্রশ্ন : প্রেমলালের হ্যাটট্রিকে ৪-৪ গোলে ড্রয়ের ম্যাচটির কথা বলছেন কি?

রুপু : হুম। ফেডারেশন কাপের সেই সেমিফাইনালে আমরা ১-২ গোলে পিছিয়ে ছিলাম। মোহামেডানের খেলোয়াড়দের তখন বলতে শুনছি, ‘আজ আবাহনীকে পেয়েছি। ওদের শেষ করে দেব।’ গ্যালারি থেকে সমর্থকদের গালিগালাজ। ঢিল ছোড়া। একসময় তাকিয়ে দেখি, সাইডবেঞ্চে আমাদের কোনো ফুটবলার নেই; ঢিল থেকে বাঁচার জন্য সবাই আড়ালে। ওই খেলায় পরে প্রেমলাল হ্যাটট্রিক করলে ম্যাচ ড্র হয় ৪-৪ গোলে। অতিরিক্ত সময়ে আর কোনো গোল না হলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। মোহামেডানের প্রথম চার পেনাল্টির মধ্যে দুটি মিস; আর আমাদের প্রথম তিন শটেই গোল। চতুর্থ শটটি আমার। এটি গোল করলেই জিতে যাব। কিন্তু এর আগে আরেক কাহিনি। মোহামেডান চতুর্থ শটটি মিস করার পর সব দর্শক মাঠে ঢুকে আসে। কারণ হিসাব ভুল করে সবাই ভাবে, আবাহনী জিতে গেছে। অনেক কষ্টে সবাইকে বুঝিয়ে আবার মাঠের বাইরে পাঠানো হয়। এরপর আমি পেনাল্টিতে গোল করি; দল জিতে যায়। ওই ম্যাচের মতো আনন্দ ফুটবল খেলে কখনো পাইনি।

প্রশ্ন : এই ভালোবাসার শুরুটা জানতে চাই। ফুটবলের সঙ্গে সখ্যের শুরু তো শৈশবেই?

রুপু : আমার জন্ম চট্টগ্রামের পাথরঘাটায়। বাবা রবীন্দ্র নারায়ণ দাস সাধারণ বীমা করপোরেশনে সরকারি চাকরি করতেন। মা মিনতি দাস গৃহিণী। আমরা চার ভাই-বোন। আমার বড় এক ভাই রয়েছেন, ছোট দুই বোন। তখনকার বাংলাদেশের অন্য সব শিশু-কিশোরের মতো ফুটবলটা আমিও খুব পছন্দ করতাম। সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের মাঠ, যেটিকে বলতাম ‘গির্জার মাঠ’—ওখানে খেলতাম ফুটবল। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় অনেক ম্যাচ হতো। আমি সব সময় যেতাম বড়দের সঙ্গে। কখনো-সখনো খেলোয়াড় কম থাকলে সুযোগ পেতাম মাঠে নামার। ঢাকায় একবার বেড়াতে এসে মামার সঙ্গে স্টেডিয়ামে গিয়ে আবাহনী-ভিক্টোরিয়া ম্যাচ দেখি; আবাহনী সম্ভবত ৭-০ গোলে জিতেছিল। এরপর তো বাবার বদলি হওয়ার সুবাদে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় চলে আসি পুরো পরিবার।

প্রশ্ন : তখন আপনার বয়স?

রুপু : ১১-১২ বছর।

প্রশ্ন : এখানে ফুটবলের সঙ্গে সখ্য ঝালিয়ে নেওয়া কিভাবে? স্কুলে?

রুপু : নাহ্, ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাঠে। আমরা ঢাকা এসে থাকা শুরু করি গোপীবাগে। পড়তাম নারিন্দা গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে। ডে শিফটে পড়তাম তো, স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ব্যাগ রেখেই ছুটতাম এলাকার ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাঠে। ওখানে বাবলু ভাই, মহসিন ভাইদের মতো কিংবদন্তিরা খেলেন। তাঁদের পাশাপাশি আমরা ছোটরাও অনুশীলন করি। ফরশাদ বাবু ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে খেলা শুরু আমার।

প্রশ্ন : এখান থেকেই কি পাইওনিয়ারে খেলা?

রুপু : এই সূত্র ধরেই। ওই মাঠে তখন বেশ কয়েকটি ব্যাচ অনুশীলন করত। যদিও ব্রাদার্সের মূল ক্লাবের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ‘জুনিয়র ব্রাদার্স’ নামে এক গ্রুপ ছিল, যেখানে একটু সিনিয়ররা খেলেছেন। ওয়াসিম ভাই ছিলেন ওখানে। আমরা ‘লিটল ব্রাদার্স’। এরপর ১৯৮১ সালে পাইওনিয়ার লিগে গোপীবাগের একটি দল খেলে ‘বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাব’। ওই ক্লাবের পক্ষে ফরশাদ বাবু ভাইয়ের গড়া আমাদের গ্রুপটি খেলে। পাইওনিয়ারে সেই প্রথম খেলা। দলকে তৃতীয় বিভাগে ওঠাই আমরা। পরের বছর তো আমরাই একটি দল কিনে নিলাম।

প্রশ্ন : আমরা বলতে?

রুপু : আমরা বলতে আমাদের ওই গ্রুপটি। আমরা তো বিভিন্ন জায়গায় খ্যাপ খেলতে যেতাম। টাঙ্গাইলে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপে খেলতে গিয়েছি। একবার তো মনে আছে, মাণ্ডায় এক টুর্নামেন্ট খেলে বাসায় ফেরার পর প্রাইভেট টিউটরের কাছে বেতের বাড়িও খেয়েছি। কারণ পরদিন ছিল পরীক্ষা; আর স্যার আমাকে পড়ানোর জন্য এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। যা বলছিলাম, ওই যে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যেতাম, ওখান থেকে পাওয়া টাকা-পয়সা রাখতাম জমিয়ে। তৃতীয় বিভাগে পুরান ঢাকার একটি দল ছিল ‘বিএইচ ওয়েলফেয়ার’। ওরা আর দলটি চালাতে পারছিল না। তখন নিজেদের ওই জমানো টাকার সঙ্গে ফরশাদ বাবু ভাই কিছু টাকা দিয়ে ক্লাবটি কিনে নিই।

প্রশ্ন : কত টাকায়?

রুপু : কত টাকায় তা এখন মনে নেই। সম্ভবত ৩০-৪০ হাজার টাকায়। ওই ক্লাব কিনে পরবর্তী বছর নাম দিই ‘লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব’। নিজেদের ক্লাবেই খেলেছি তৃতীয় বিভাগে। এখনো এই ক্লাব খেলছে দ্বিতীয় বিভাগে। বাবু ভাই পরবর্তী সময়ে ওই ক্লাবের সেক্রেটারি হন। উনি মারা যাওয়ার পর আমি প্রায় ১৪ বছর লিটল ফ্রেন্ডসের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করি। ব্রাদার্সের মাঠের একপাশে দেখবেন ‘লিটল ফ্রেন্ডস’ ক্লাব এখনো আছে। এটিও আমাদের হাতে গড়া।

প্রশ্ন : প্রথম বিভাগে প্রথম খেলেন কোন ক্লাবে?

রুপু : লিটল ফ্রেন্ডসে থাকার সময়ই প্রথম বিভাগের তিন-চারটি ক্লাব থেকে প্রস্তাব পাই। কিন্তু বাবু ভাই আমাকে ছাড়তে চাননি। দুটি কারণে। এত তাড়াতাড়ি প্রথম বিভাগের ক্লাবে মানিয়ে নিতে পারব কি না, এটি একটি ব্যাপার। আবার আমরা দু-তিনজন চলে গেলে ক্লাবের বাকি ২০-২২ জনের মনোবল ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারও ছিল। পরবর্তীকালে যখন আর আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না, তখন আমি, বাদল দাস, গোলরক্ষক মিঠু ও মিস্টার—এই চারজন একসঙ্গে যাই ফরাশগঞ্জে। বাবু ভাইয়ের বোনজামাই বেবী ভাই ওই ক্লাবের দেখাশোনা করতেন। রাম ভাই, রঞ্জনদা এমন কর্মকর্তারাও ছিলেন ফরাশগঞ্জে।

প্রশ্ন : তখন কোন পজিশনে খেলেন?

রুপু : আমি বরাবর মিডফিল্ডার। পরবর্তী সময়ে আবাহনীতে অবশ্য রাইট ব্যাক, লেফট ব্যাকে খেলেছি অনেক ম্যাচ। আবাহনীর জার্সিতে একেবারে প্রথম ম্যাচটিই তো ছিল লেফট ব্যাকে।

প্রশ্ন : মূলত বাঁ পায়ের ফুটবলার আপনি। এটি কি সহজাত?

রুপু : ফুটবলে সহজাত। ছোটবেলা থেকেই কেন জানি না বাঁ পায়েই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলাম। তবে খেলার বাইরে বাকি সব কিছুতে আমি ডানহাতি।

প্রশ্ন : ‘লিটল ফ্রেন্ডস’ তো নিজেদের ক্লাবই ছিল। ওখান থেকে আলাদা করে টাকা নেবেন কী, নিজেদের খেলার টাকা জমিয়ে ওই ক্লাব কিনেছেন বললেন। প্রথম পারিশ্রমিক পান কি ফরাশগঞ্জে?

রুপু : হ্যাঁ। শুরুতে ২৫ হাজার টাকা দেয়। পরে আরো কিছু পাই সম্ভবত। এই ক্লাবে খেলি দুই মৌসুম। এ সময়ই আমার নাম ফুটতে শুরু করে। জাতীয় দলে ডাক পাই ফরাশগঞ্জে খেলার সময়; ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে।

প্রশ্ন : এরপর আবাহনী। ওই ক্লাবে ডাক পান কিভাবে?

রুপু : ১৯৮৫ সালের লিগে আবাহনীর কাছে আমরা হেরে যাই ২-৫ গোলে। ফরাজগঞ্জের হয়ে গোল দুটি করি আমি ও বাদল দাস। আমার বন্ধু এমিলি তখন আবাহনীতে খেলে। ওই ম্যাচের পরদিন আবাহনীর কর্মকর্তারা এমিলিকে পাঠায় আমার কাছে; যেন পরের মৌসুমে আমি আবাহনীতে খেলি। স্বভাবতই আমি খুব খুশি; কিন্তু আনুষ্ঠানিক কোনো কথাবার্তা হয়নি। ওই বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ লাল দল ও বাংলাদেশ সবুজ দল গঠন করা হয় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপের জন্য। আমাকে ডাকা হয় সবুজ দলে। সুন্দরবন হোটেলে উঠি আমরা। ফিনল্যান্ডের এক দলের বিপক্ষে আমাদের প্রথম খেলা। হোটেল থেকে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি; এমন সময় রুমে নক। দরজা খুলে দেখি আবাহনীর কর্মকর্তা হারুন ভাই ও তান্না ভাই। ওনারা রুমে ঢুকে আমাকে দুটি বান্ডিলে এক লাখ টাকা দিয়ে ভাউচারে সই করান। বলেন, ‘তুমি এবার আবাহনীতে খেলবে।’ কোনো কথা বলার সুযোগ দেন না। অবশ্য বলার কিছু ছিলও না। ছোটবেলা থেকে প্রিয় দল আবাহনী; ওখানে খেলার সুযোগ পাওয়াটা বিরাট ব্যাপার।

প্রশ্ন : একটু আগে বলছিলেন যে, আবাহনীর জার্সিতে প্রথম ম্যাচ খেলেন লেফট ব্যাকে। ওই গল্পটি একটু যদি বলেন?

রুপু : আবাহনীর যখন অনুশীলন শুরু হয়, আমি তখন কায়েদে আজম ট্রফি খেলার জন্য পাকিস্তানে। ফেরার এক দিন পরই ফেডারেশন কাপের খেলা। ক্লাবের লেফট ব্যাক তখন জনি ভাই, কিন্তু তিনি ইনজুরিতে। ওই বছর আমার মতোই আবাহনীতে আসে বিজেএমসি থেকে মুকুল। ও লেফট ব্যাকেই খেলত। ম্যাচের আগে কোচ আশরাফ ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি লেফট ব্যাকে খেলতে পারবে?’ বললাম, ‘আমি তো সব সময় মিডফিল্ডেই খেলেছি। আর মুকুল খেলে লেফট ব্যাকে। ওকে দিয়ে শুরু করেন, না পারলে না হয় আমি খেলব।’ তাই হলো। কিন্তু ম্যাচ শুরুর ছয়-সাত মিনিটের মাথায় আশরাফ ভাই আমাকে বললেন, ‘ওয়ার্মআপ শুরু করো।’ মুকুল খুব নার্ভাস ছিল। ম্যাচের ১৫ মিনিটের মধ্যেই ওর বদলি নামি আমি। কেমন খেলেছিলাম, জানি না। তবে ম্যাচ শেষে আবাহনীর সমর্থকরা আমাকে মাঠ থেকে ড্রেসিংরুম পর্যন্ত নিয়ে আসে কাঁধে করে।

প্রশ্ন : আবাহনীর মিডফিল্ডে তখন জায়গা করে নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?

রুপু : খুব কঠিন। ওখানে তখন কারা খেলেন? খোরশেদ বাবুল, আশীষ ভদ্র, মোস্তফা কামাল, এফআই কামালরা। দেশসেরা সব মিডফিল্ডার। তবে নিজের সামর্থ্যের ওপর আমার আস্থা ছিল। ঠিকই একসময় জায়গা করে নিই আবাহনীর মিডফিল্ডে।

প্রশ্ন : আপনার সঙ্গে স্ট্রাইকার শেখ মোহাম্মদ আসলামের দুর্দান্ত বোঝাপড়া ছিল। ক্রসের পাশাপাশি আপনার ডিফেন্সচেরা পাসের কথাও মনে করতে পারেন পুরনো দিনের ফুটবল দর্শকরা। এ জন্য আলাদা কোনো অনুশীলন...

রুপু : অনুশীলনে এমনিতে আমি খুব সিরিয়াস ছিলাম। মাঠের বাইরেও খুব নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতাম। কখনো মদ খাইনি, পান-সিগারেট খাইনি। মিডফিল্ডের সবগুলো পজিশনেই খেলেছি। দলের যখন যা প্রয়োজন হতো। আর ক্লাবে যখন আসলাম, প্রেমলালের মতো ফরোয়ার্ড থাকে, তখন কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। ওদের সঙ্গে আমার বোঝাপড়া সত্যি খুব ভালো ছিল। মিডফিল্ডে আশীষ ভদ্রের সঙ্গেও। পরবর্তী সময়ে রুমির সঙ্গে আমার বোঝাপড়া হয় দুর্দান্ত। আবাহনীর সমর্থকরা তো মজা করে এমনও বলতেন, আমি আর রুমি শালা-দুলাভাই। আমি দুলাভাই, রুমি শালা। বল পেলেই আমি নাকি রুমিকে খুঁজতাম; রুমি বল পেলে খুঁজত আমাকে। আর যে ফাইনাল পাসের কথা বললেন, এর জন্য অনেক অনুশীলন করেছি সত্য। পাশাপাশি এটিকে ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতাও বলতে পারেন।

প্রশ্ন : পরবর্তী সময়ে আবাহনীর অধিনায়কও হয়েছেন আপনি?

রুপু : হ্যাঁ। আমার অধিনায়কত্বে আবাহনী পাঁচটি শিরোপা জিতেছে। সেবার শুরুতে দলের অধিনায়ক ছিলেন এফআই কামাল। মৌসুমের একেবারে শুরুর দিকে উনি কাস্টমসে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার পর থেকে নেতৃত্ব দিই আমি। ১৯৮৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৯১ পর্যন্ত টেনেছিল ওই মৌসুম। সেবার আমরা লিগ চ্যাম্পিয়ন হই। মিরপুর স্টেডিয়ামে ইনডিপেনডেন্ট কাপের শিরোপা জিতি। ঢাকার আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স ও কলকাতার ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান-মোহামেডান নিয়ে আয়োজিত বিটিসি ক্লাব কাব জিতি। ফেনীতে আজমেরি বেগম গোল্ডকাপে কলকাতার মোহনবাগানকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হই। ভারতে গিয়ে জিতি নাগজি ট্রফি। সবগুলোতেই আমি অধিনায়ক।

প্রশ্ন : পরবর্তীতে আপনি আবাহনী ছেড়ে দেন। কেন?

রুপু : (পাশে বসা আবাহনীর পুরনো দিনের এক কর্মকর্তাকে দেখিয়ে) কেন ছেড়েছি তা ওনারা ভালো বলতে পারবেন।

প্রশ্ন : আপনার মুখ থেকেই শুনি।

রুপু : অত গভীরে গিয়ে এখন আর বলতে চাই না। শুধু বলি, ওই সময় ক্লাবের কাছ থেকে যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, তা পাইনি। দলবদলের আগে থেকেই অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত, কিন্তু আমার সঙ্গে তেমনভাবে কেউ কথা বলেননি। একটা পর্যায়ে আমাকে ও ওয়াসিমকে একরকম বাধ্য হয়ে আবাহনী ছাড়তে হয়। পরে শুনেছি, আবাহনীর কিছু ফুটবলারের কারণেই আমার আবাহনীতে থাকা হয়নি। যেহেতু আগের আড়াই বছর সহ-অধিনায়ক থেকে আবাহনীর অধিনায়ক ছিলাম, ওইবারও আমার অধিনায়ক হওয়ার কথা। এক-দুজন ফুটবলার তা মানতে পারেননি। ওরা দল পাকিয়ে আমাকে আবাহনী ছাড়তে বাধ্য করেছে।

প্রশ্ন : তাঁদের নাম বলা যাবে?

রুপু : থাকুক। নামটা না হয় উহ্যই রাখলাম।

প্রশ্ন : কোন ক্লাবে গেলেন এরপর?

রুপু : ব্রাদার্সে। ওখানে দুই মৌসুম খেলার পর মোহামেডানে। এই ক্লাব আমাকে আগেও নিতে চেয়েছিল। আমার বাবার অফিসে ব্রিফকেস-ভর্তি টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। কর্নেল মালেক তখন ঢাকার মেয়র; আবার একই সঙ্গে মোহামেডানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান; ব্রাদার্স ক্লাবেরও চেয়ারম্যান। আমি গোপীবাগে থাকতাম তো, কর্নেল মালেক ব্রাদার্সের কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি রুপুকে আমার সামনে এনে দিতে পারো, ব্রাদার্সকে বাড়তি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেব।’ তখন ঢাকায় সিটি করপোরেশনের তিনটি নতুন মার্কেট হচ্ছিল—নিউমার্কেট, গুলশান এক নম্বর ও দুই নম্বরের মার্কেট। এমন খবরও কর্নেল মালেক পাঠান, ‘রুপুকে বলো, এই তিন মার্কেটের মধ্যে কোনটিতে ওর দোকান লাগবে—আমি কাগজপত্র পাঠিয়ে দেব।’ আমার জানা মতে, কায়সার হামিদ ও কানন গুলশান এক নম্বরের ডিসিসি মার্কেটে দুটি দোকান নেয় আমাকে দেওয়া ওই প্রস্তাবের কথা শুনে। কিন্তু আবাহনীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে মোহামেডানে যাইনি।

প্রশ্ন : পরে গেলেন কেন?

রুপু : সেবারও আমার আবাহনীতে যাওয়ার কথা। ১৯৯৫ সালে সাফ ফুটবলের পরপরই ছিল দলবদল। আমি সেবার বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আগেই আবাহনীর সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে যায়। কিন্তু যে সমস্যার কারণে আবাহনী ছাড়তে হয়েছিল, ওই সমস্যাটা তখনো ছিল। সাফ ফুটবল খেলে ফিরে আসার পর বিমানবন্দর থেকে মোহামেডানের কর্মকর্তা সালাম মুর্শেদী ভাই আমাকে হাত ধরে টেনে গাড়িতে ওঠান। আবাহনীর কর্মকর্তারা কিছু বলেননি। এভাবেই আমার মোহামেডানে যাওয়া।

প্রশ্ন : শেষ খেলেছেন কোন ক্লাবে?

রুপু : মুক্তিযোদ্ধায়। এখানে একটি দুঃখের কথা বলি। আমি আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স তিনটি বড় দলে খেলেছি। মুক্তিযোদ্ধায় যখন যাই, ওরাও বড় দল। কিন্তু আমার স্বপ্নের ক্লাব আবাহনী। এই ক্লাবের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলে অবসর নিতে চেয়েছিলাম। তা পারিনি। যে ফুটবলার কিংবা ফুটবলাররা আমাকে আগে আবাহনী ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন, তাঁরাই আমাকে আবাহনীতে খেলে অবসর নিতে দেয়নি। ১৯৯৯ সালে মুক্তিযোদ্ধার হয়ে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচে অবসর নিই আনুষ্ঠানিকভাবে।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের কথা একটু শুনতে চাই। বাংলাদেশ দলের ১০ নম্বর জার্সি নিয়েও আপনি সম্ভবত খেলেছেন?

রুপু : মনে হয় না। আমি সব সময় ৭ নম্বর জার্সিতে খেলেছি; কোনো কোনো সময় ৬ নম্বর জার্সিও দিয়েছে। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সি পরে কখনো খেলেছি বলে তো মনে পড়ে না।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের হয়ে স্মরণীয় কিছু ম্যাচের কথা যদি বলেন?

রুপু : ১৯৮৯ প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ লাল দলের হয়ে খেলেছি। এটি খুব স্মরণীয়। আর ব্যর্থতা বলতে সাফে কখনো চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। অথচ আমাদের দলগুলো খুব ভালো ছিল। ১৯৯৩ সাফে দুর্ভাগ্যের কারণে পারিনি। মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচে আট-নয় গোলেও জিততে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি। কায়সার হামিদ তো পেনাল্টিও মিস করলেন। আর ১৯৯৫ সালে কলম্বোতে সাফ ফুটবলে আমি ছিলাম দলের অধিনায়ক। সেবার সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যাই। তখন গোল্ডেন গোলের নিয়ম। অতিরিক্ত সময়ে আমাদের স্ট্রাইকার মিজান হেড করে ভারতের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে পর্যন্ত। আমরা তো গোল বলে উল্লাস শুরু করে দিয়েছিলাম প্রায়। কিন্তু ওদের এক ডিফেন্ডার টাচলাইনের দিক থেকে দৌড়ে গিয়ে গোল বাঁচিয়ে দেয়। পরে আমরা হেরে যাই।

প্রশ্ন : স্মরণীয় কিছু গোলের কথা শুনতে চাই।

রুপু : আবাহনীর জার্সিতে ৪৩ সেকেন্ডের মাথায় একটি গোলের কথা মনে আছে। রহমতগঞ্জের বিপক্ষে। সেদিন আমার পজিশন রাইট ব্যাক। সেন্টার করার জন্য মাঝখানে আসলাম ও আশীষ। রেফারির বাঁশি বেজে উঠতেই তো একজন আরেকজনকে পাস দেওয়ার কথা। কিন্তু আশীষ দেখলেন, রহমতগঞ্জের রাইট ব্যাক নিজের পজিশন থেকে একটু ওপরে। উনি আসলামকে পাস না দিয়ে বল উড়িয়ে মারলেন সেদিকে। বাঁ-দিক দিয়ে দৌড়ে গিয়ে তা ধরেন প্রেমলাল। ওদের রাইট ব্যাক তখন পেছাচ্ছে। প্রেমলাল তাকে বডিডজে এড়িয়ে বল মারেন পেনাল্টি এরিয়ায়। আমি তো রাইটব্যাক কিন্তু আশীষ ওভাবে পাস দেওয়ায় দৌড় শুরু করি। প্রেমলাল বল ধরতেই কোনাকুনি চলে যাই মাঝামাঝি জায়গায়। প্রেমলালের ক্রস ওদের এক ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে আমার কাছে আসতেই বক্সের মাথা থেকে শট। গোল। আশীষ, প্রেমলাল, রহমতগঞ্জের ডিফেন্ডার—এই তিন টাচের পর চতুর্থ টাচেই আমার গোল। এই গোলটি খুব মনে আছে।

প্রশ্ন : অন্য কোনো গোল?

রুপু : গোল্ডেন গোলের কথা শুরুতেই বলেছি। আর মোহামেডানের বিপক্ষে ৪-৪ গোলে ড্র ম্যাচে টাইব্রেকারের গোলটির কথাও বলেছি।

প্রশ্ন : সমসাময়িক ফুটবলারদের মধ্যে সেরা গোলরক্ষক, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকার বলবেন কাকে কাকে?

রুপু : গোলরক্ষকদের মধ্যে সেরা নিঃসন্দেহে মহসিন। সেরা ডিফেন্ডার কায়সার হামিদ। মুন্নাও ভালো, তবে কায়সার সেরা। মিডফিল্ডার হিসেবে সেরা আশীষ ভদ্র। সাব্বিরও খুব ভালো; এত দক্ষ ফুটবলার খুব একটা দেখা যায়নি। আর স্ট্রাইকার আসলাম। আর সব মিলিয়ে আমার সময়ে খেলা বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার ওয়াসিম।

প্রশ্ন : কেন?

রুপু : প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেওয়ার জন্যই তিনি সেরা। বলের ওপর দখল ছিল অবিশ্বাস্য। ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে একক প্রচেষ্টায় গোল করতে পারতেন অথবা গোল তৈরি করে দিতে পারতেন। আমার প্রজন্মে এমন ফুটবলার দেখিনি।

প্রশ্ন : বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে সেরা?

রুপু : আমার কাছে এক নম্বর সামির শাকের। ঠিক পরপরই করিম মোহাম্মদ ও নালজেগার। আর দলকে দীর্ঘদিন সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে থাকবেন পাকির আলী। বিদেশি হিসেবে আবাহনী দলকে ও যে সার্ভিস দিয়েছে, তা অতুলনীয়।

প্রশ্ন : কোচ হিসেবে এগিয়ে রাখবেন কাকে?

রুপু : কোচদের মধ্যে তো যিনি সবচেয়ে সফল, তাঁকেই সেরা বলা হয়। এখানে আমার অবস্থান ভিন্ন। জাতীয় দলে যাঁর হাত ধরে সাফ গেমসে সবচেয়ে বাজে ফল এসেছে, তাঁকেই আমার কাছে সেরা মনে হয়েছে।

প্রশ্ন : ওল্ডরিখ সোয়াব?

রুপু : হ্যাঁ। ১৯৯৩ সাফে উনি আমাদের কোচ ছিলেন। দুই মাসের প্রশিক্ষণে উনি এক ট্রেনিং দুইবার করাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা পারিনি।

প্রশ্ন : ফুটবল ছাড়ার পরও ফুটবলের সঙ্গে রয়েছেন। আবাহনীর কর্মকর্তা হিসেবে শুরুটা কিভাবে?

রুপু : মজার ব্যাপার হলো, আমাকে যাঁরা আবাহনীতে থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন, কর্মকর্তা হিসেবে আমার হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাঁদেরই পরবর্তী সময়ে বিদায় নিতে হয়েছে। ২০০২ সালে আবাহনীর চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ সাহেব সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন আমাকে। ২০০৩ সালের শেষ দিকে করা হয় ক্লাবের ম্যানেজার। এখনো তাই আছি।

প্রশ্ন : বাফুফের সদস্য হিসেবেও তো রয়েছেন অনেক দিন?

রুপু : ২০০৮ সালে নির্বাচন করি প্রথম। পরের দুটি নির্বাচনও করি। প্রতিবার জিতেছি।

প্রশ্ন : আপনাদের সময়ে ফুটবলের সামগ্রিক অধঃপতন হয়েছে। সেটি জনপ্রিয়তা, দক্ষতা সব দিক দিয়েই। এটি কতটা কষ্ট দেয়?

রুপু : দেখুন, ফুটবল উন্নয়নের দায়িত্ব শুধু বাফুফের নয়। সবারই দায়িত্ব রয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ফুটবল এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন : সেই সম্ভব তো হচ্ছে না, বরং দিন দিন ফুটবল পিছিয়ে পড়ছে। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১৯৭ নম্বরে চলে গেছে বাংলাদেশ। বাফুফের সদস্য হিসেবে দায়বদ্ধতার জায়গাটি নিয়ে জানতে চাইছি?

রুপু : র‌্যাংকিং নিয়ে একটি ভুল ধারণা অনেকের রয়েছে। না খেললে র‌্যাংকিংয়ে তো পেছাবই। আমরা প্রায় দেড় বছর জাতীয় দলকে খেলাতে পারিনি। কারণ আমরা ভুটানের কাছে হেরে গেছি। আর আগে মানুষের বিনোদনের মাধ্যম বলতে ছিল শুধু ফুটবল। ৮টা থেকে শুরু হয়ে ২টায় অফিস শেষ—এরপর সবাই মাঠে আসত। এখন তো সময়টা পাল্টে গেছে। ক্রিকেট রয়েছে, বিনোদনের আরো নানা উপকরণ রয়েছে...

প্রশ্ন : এসব সবাই জানে। কিন্তু বাফুফের দায়িত্ব তো সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকেই ফুটবলের উন্নয়নের জন্য কাজ করা। এখানে নিজের দায়বদ্ধতার উত্তরটা আপনার কাছ থেকে পেলাম না। যা-ই হোক, শেষ দিকে একটু পরিবার নিয়ে জানতে চাই। বিয়ে করেছেন কবে?

রুপু : ১৯৯৫ সালে। স্ত্রীর নাম শান্তা। আমাদের একটিই ছেলে তন্ময়। ‘এ’ লেভেল শেষ করেছে; কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার জন্য কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাবে কিছুদিনের মধ্যে। আমার বাবা-মার কথা আগেই বলেছি। বাবা রবীন্দ্র নারায়ণ দাস সাধারণ বীমা থেকে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে ভলান্টিয়ার রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার পর পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। বাবা এখনো আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। মা মিনতি দাস ২০১০ সালে মারা যান। আমার বড় ভাই বিশ্বজিৎ দাস ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার ম্যানেজার। ছোট দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এক বোন ইন্দিরা দাস স্বামীর সঙ্গে হংকংয়ে থাকে। আর সবচেয়ে ছোট বোন সুবর্ণা দাস ওর পরিবার নিয়ে থাকে গুলশানে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

রুপু : আমি খুবই সন্তুষ্ট। ফুটবল খেলার কারণে আমাকে অনেকে চেনেন। কোথাও গেলে চেয়ার ছেড়ে দেন। এই খেলার কারণে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছি। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে! আর আমার জীবনটা তো ফুটবলকেন্দ্রিকই। এই জীবন নিয়ে তাই তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। একটা অতৃপ্তি বলতে পারেন, এখনো মনে হয় যদি আরো কিছুদিন ফুটবল খেলতে পারতাম! পুনর্জন্ম বলে কিছু আছে কি না, জানি না। যদি পুনর্জন্ম হয়, তাহলে চাইব আমি যেন আবার ফুটবলার হয়েই জন্মাই। ফুটবলে যে দক্ষতা ছিল, স্রষ্টা যেন তার চেয়ে একটু বেশি দক্ষতা দিয়ে আমাকে পাঠান। যেন আরেকটু বেশি সময় ফুটবল খেলতে পারি।


মন্তব্য