kalerkantho


বাংলার মাটিতে সাঁতারে কেউ আমাকে হারাতে পারেনি

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



বাংলার মাটিতে সাঁতারে কেউ আমাকে হারাতে পারেনি

ছবি : মীর ফরিদ

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাফল্যের বিস্তৃতিতে বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদই সম্ভবত তাঁর ধারে-কাছে আসেন না। এখন রাজনীতির মারপ্যাঁচে মো. মোশাররফ হোসেন খান থাকেন সুদূর মার্কিন মুলুকে। দেশে এলেন অনেক বছর পর। নোমান মোহাম্মদ গিয়ে হাজির হলেন তাঁর কাছে। সিন্দুক থেকে বেরোল বীরত্বের উপচানো গল্প।

প্রশ্ন : কথোপকথন শুরু করতে চাই আপনার অবিশ্বাস্য এক অর্জনের গল্পে। শুনেছি, বাংলাদেশে সাঁতারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আপনি কখনো দ্বিতীয় হননি। প্রতিবার প্রথম; প্রতিটিতে স্বর্ণপদক। এটি কি সত্যি?

মো. মোশাররফ হোসেন খান : সত্যি। বাংলার মাটিতে আমাকে সাঁতারে কেউ কখনো হারাতে পারেনি। প্রতিবার আমি স্বর্ণপদক জিতেছি। প্রতিটি ইভেন্টে।

প্রশ্ন : অথচ আপনার ক্যারিয়ার তো দু-এক বছরের নয়!

মোশাররফ : নাহ্, দীর্ঘ ক্যারিয়ার। স্বাধীনতার পর থেকে হিসাব করলেও ১৬-১৭ বছরের। ১৯৭২ সালে শুরু, শেষ সাঁতরেছি ১৯৮৮ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে।

প্রশ্ন : এই প্রায় দেড় যুগে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ঠিক কতটি পদক জিতেছেন, মনে আছে?

মোশাররফ : খুব মনে আছে। ৯৬টি। ১৯৭২ সালে প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে চার ইভেন্টে অংশ নিই। এরপর প্রতিবার অন্তত আট ইভেন্টে।

প্রশ্ন : এক প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ পদক পেয়েছেন কটি?

মোশাররফ : ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশ গেমস হয়। সেখানে ১০ ইভেন্টে নাম দিই; প্রতিটিতে জিতি স্বর্ণপদক। আর প্রতিটিই নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়ে। আসলে জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে ইভেন্টই থাকত ১৫টি। আমি যখন যে দলের হয়ে খেলেছি, ওদের একটাই দাবি—অন্তত আটটি স্বর্ণ এনে দাও। ১৫-র মধ্যে আট স্বর্ণ পেলেই তো ওই দল চ্যাম্পিয়ন। আমি তাই আটটি ইভেন্টেই সাধারণত লড়তাম। বলতাম, ‘আট স্বর্ণ আমার, বাকি সাতটি ভাগ করে নাও পুরো বাংলাদেশ।’

প্রশ্ন : রেকর্ড গড়েছেন কয়বার?

মোশাররফ : আমার রেকর্ড আমিই ভাঙতাম বারবার। ১৯৮৮ সালে শেষ যেবার প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার করি, সেদিনও নতুন রেকর্ড গড়েছি। সব মিলিয়ে এই ৯৬ পদকের মধ্যে নতুন জাতীয় রেকর্ড ৬৪ বার।

প্রশ্ন : ’৯৬-তে আটকে যাওয়ার পর একটু কি খারাপ লাগে? আর চারটি স্বর্ণপদক জিতলেই তো সেঞ্চুরি হয়ে যেত...

মোশাররফ : এক হিসাবে কিন্তু সেঞ্চুরি হয়েছে। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই ১৯৬৯ সালে। ওই বছরই পূর্ব পাকিস্তানের ১৫তম জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিই প্রথম। চার ইভেন্টে নাম দিয়ে প্রতিটিতে হই প্রথম। ১০০ মিটার বাটারফ্লাই, ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক ও ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে ও ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল। এর মধ্যে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে পুরো পাকিস্তানের নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়ে জিতি স্বর্ণপদক। ওই শেষ দিনে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুলে এসেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসান। নেভির সাদা অফিশিয়াল পোশাক পরে এসেছিলেন। রেকর্ড গড়ার ঘোষণা যখন দেওয়া হয়, উনি ভিআইপি গ্যালারি থেকে হেঁটে ওই পোশাকে আমাকে ভিজে গায়ে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। নিজের গা ভিজিয়ে ফেলেন। যুদ্ধের আগে ওই একবারই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়। এই চারটি স্বর্ণপদক যোগ করলে পদকের সেঞ্চুরি কিন্তু হয়ে যায়। অবশ্য স্বাধীন বাংলাদেশেই সেটি করতে পারতাম; যদি ১৯৭৫ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আমাকে সাঁতরাতে দেওয়া হতো। বঙ্গবন্ধুকে তো সপরিবারে মেরে ফেলা হয় আগস্টে। সেপ্টেম্বরেই ছিল আমাদের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। তখন মার্শাল ল, ওখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে চ্যাম্পিয়ন করাতেই হবে। সে কারণে ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আমার দল বিটিএমসির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। সেবার সাঁতরাতে দিলে স্বাধীন দেশে আমার স্বর্ণপদকের সেঞ্চুরি হয়ে যেত।

প্রশ্ন : এ তো বলছেন ঘরোয়া সাফল্যের কথা। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাঁতারে বাংলাদেশকে অনেক পদক এনে দিয়েছেন আপনি...

মোশাররফ : সংখ্যাও মনে আছে, ৪৪টি স্বর্ণপদক। এর বাইরে রৌপ্য, ব্রোঞ্জপদক আছে। সেগুলো গোনায় নাই-বা ধরলাম।

প্রশ্ন : কোন কোন প্রতিযোগিতায়?

মোশাররফ : সাফ গেমসে আছে। সাফ শুরুর আগে আঞ্চলিক সাঁতার প্রতিযোগিতা হতো। বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ত্রিদেশীয় মিট হতো শ্রীলঙ্কায়। এসব জায়গায় স্বর্ণ পেয়েছি প্রচুর। পাকিস্তানে কায়েদে আজম আন্তর্জাতিক আমন্ত্রণমূলক সাঁতার প্রতিযোগিতায় জিতেছি। কলকাতা থেকে একবারে ছয় স্বর্ণপদক নিয়ে এসেছি। আসলে এ অঞ্চলে সাঁতারুরা আমাকে ব্লকে দেখলেই স্বর্ণপদক নিয়ে আর ভাবত না। ওরা চিন্তা করত রৌপ্য পাওয়া যায় কি না। এ কথাটি আমি জোর দিয়েই বলছি।

প্রশ্ন : তাহলে ১৯৮৪ সালে প্রথম সাফে কোনো স্বর্ণপদক পাননি কেন?

মোশাররফ : এটি খুব দুঃখজনক ব্যাপার। আমার সর্বনাশটি হয়ে যায় আসলে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে যেতে না পারাটাই...

প্রশ্ন : অলিম্পিকের সঙ্গে সাফের সম্পর্ক কী?

মোশাররফ : সম্পর্ক আছে। সেই অলিম্পিকে বাংলাদেশ থেকে শুরুতে ছয়জনের যাওয়ার কথা ছিল। ইন্টারভিউ বোর্ড করে সবাইকে ডেকে রীতিমতো পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেখানে ২০ নম্বরের মধ্যে আমি পাই ১৯। দ্বিতীয় হয় সাইদুর রব; ১১ নম্বর পেয়ে। ১০ নম্বর পেয়ে সাইদুর রহমান ডন তৃতীয়। আমি তো যাবই লস অ্যাঞ্জেলেসে। এর মধ্যে হংকংয়ে যাই তিন মাসের ট্রেনিংয়ে। ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে দেখা হকির কিংবদন্তি ইব্রাহিম সাবের ভাইয়ের সঙ্গে। উনি ব্যাংকক যাচ্ছিলেন। আমাকে বললেন, ‘মোশাররফ, আপনার তো অলিম্পিক যাওয়া হচ্ছে না।’ আমি বলি, ‘কী বলেন! কেন?’ উনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাবে মাত্র এক ক্রীড়াবিদ। জেনারেল ওয়াহেদ ম্যানেজার হয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ডনকে।’ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে গিয়ে কথা বলে শুনি ঘটনা সত্যি। পরে জেনেছি এ দুজন কেমন আত্মীয় হন, একই গ্রামে বাড়ি—সে কারণে আমাকে বাদ দিয়ে ডনকে অলিম্পিকে নেওয়া হয়। মনটা এত খারাপ হয়ে যায়! তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তে সাঁতার থেকে অবসরের ঘোষণা দিই।

প্রশ্ন : ’৮৪ সাফ গেমসের তখন বাকি কত দিন?

মোশাররফ : চার মাস। এই চার মাসে এক দিনও পানিতে নামিনি। সাঁতার ফেডারেশন থেকে খুঁজেছে, সাংবাদিকরা খুঁজেছেন—আমি কাউকে ধরা দিই না। রাগ-দুঃখ-অভিমানে একেবারে মুন্সীগঞ্জে চলে যাই।

প্রশ্ন : ওই রাগ-দুঃখ-অভিমান ভাঙে কিভাবে?

মোশাররফ : গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহফুজ সাহেব তখন সাঁতার ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ওদিকে আমি যে বিটিএমসিতে চাকরি করি, ওখানকার বস। উনি সাফ শুরুর সপ্তাহ দুয়েক আগে আমাকে ধরে বলেন, ‘নেপালে তোমাকে যেতেই হবে।’ এরপর আমাকে ডাকেন সাঁতার ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট আসাফউদ্দৌলা সাহেব। ওনাকে আমি বাবার মতোই শ্রদ্ধা করি। এই দুজনকে ‘না’ করতে পারি না; কিন্তু পানিতেও আমি নামি না। পরে নেপালে যখন চলেই গেলাম, এরপর সেখানে গিয়ে অনুশীলন শুরু করি আবার। আগের চার মাসে এক দিনও পানিতে নামিনি, সেখানে নেপাল সাফ গেমসে ছয় ইভেন্ট করে ছয়টিতে রৌপ্যপদক পাওয়া মন্দ কী! যদি অনুশীলন করতাম, তাহলে এই ছয়টিতেই স্বর্ণপদক থাকত।

প্রশ্ন : ১৯৮৫ সালে ঢাকা সাফ গেমসে অবশ্য স্বর্ণে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। ঘরের মাঠে স্বাগতিক বাংলাদেশ মোট স্বর্ণপদক জেতে ৯টি; এর মধ্যে আপনারই পাঁচটি। আগের আসরের অপ্রাপ্তি ঘুচিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জটা কি ছিল সেবার?

মোশাররফ : এটি একটি কারণ। আরেক কারণ এরশাদ সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন। উনার সঙ্গে আগে থেকেই আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তাঁর বাসায় অনেকবার গিয়েছি। ১৯৭৭ সালে শ্রীলঙ্কায় এক মিটে চারটি স্বর্ণপদক জেতার পর উনি টেলিগ্রাম পাঠান, ‘ওয়েল ডান মোশাররফ, দ্য নেশন ইজ প্রাউড অব ইউ।’ তিনি তখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান। আর ১৯৮৫ সালে তো দেশের প্রেসিডেন্টই। আমাকে ‘তুই’ করে বলতেন। ওই সাফের আগে আমাকে ডাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘মোশাররফ, জাতি তোর দিকে তাকিয়ে আছে। তুই জাতিকে কিছু দে; জাতিও তোকে ফেরত দেবে।’

প্রশ্ন : এতে উজ্জীবিত হন খুব?

মোশাররফ : খুবই। আমি এরশাদ সাহেবের কাছ থেকে বাসায় ফিরে বড় একটি ট্রাংকে সব কাপড়চোপড় ভরে আরেক বন্ধুর বাসায় তা রেখে আসি। যাতে কোথাও কোনো দাওয়াতে যেতে না হয়। সাফ শুরুর আগের ওই চার মাসে আমার পোশাক বলতে ছিল কেবল সুইমিংপুলে যাওয়া-আসার ট্র্যাকসুট। সাঁতার-বিশ্রাম, বিশ্রাম-সাঁতার এই ছিল রুটিন। কারণ দেশের প্রেসিডেন্টকে আমি কথা দিয়েছি। সাফে তা রাখতে পারি। ১০০ মিটার বাটারফ্লাই, ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে, ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে এবং ৪ গুণিতক ১০০ মিটার মিডলে রিলেতে জিতি স্বর্ণপদক। সঙ্গে ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক ও ২০০ মিটার বাটারফ্লাইতে রৌপ্য।

প্রশ্ন : আপনি কথা রেখেছেন; হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁর কথা রেখেছিলেন?

মোশাররফ : রেখেছিলেন। সাফ গেমসের পরের বছরই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক পাই। এটি তো তাও চার-পাঁচ মাস পরের ঘটনা। আর সাফ গেমস শেষ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই এরশাদ সাহেব আমাকে ডাকেন। খুব প্রশংসা করেন আর বলেন, ‘তুই দ্রুত এনএসসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা কর।’ দেখা করলাম। উনি একটি ম্যাপ বের করে বলেন, ‘মোশাররফ, এই কয়েকটি দোকানের মধ্যে কোনটি তোমার পছন্দ?’ সেটি ছিল আউটার স্টেডিয়ামের ম্যাপ। ওখানে দোকান বরাদ্দ হচ্ছিল। আমাকে এক টাকার বিনিময়ে একটি দোকান দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বারিধারায় আমাকে একটি প্লটও দেন এরশাদ সাহেব। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে সে বরাদ্দ বাতিল করে। এ জন্য আমি বলি, এরশাদ সাহেব অন্যদের ক্ষেত্রে যেমনই হোক, ক্রীড়াবিদদের জন্য খুব ভালো ছিলেন।

প্রশ্ন : নিজ দেশের সাফে আপনিই ছিলেন হিরো। পুরো দেশ তখন নিশ্চয়ই আপনাকে নিয়ে মেতে ছিল?

মোশাররফ : অবশ্যই। মানুষের ভালোবাসা তো পেয়েছিই, সাংবাদিকদেরও। ইত্তেফাকের সাংবাদিক বদি ভাই, দৈনিক বাংলার জামান ভাই কত কিছু লিখেছেন! বিশেষত জামান ভাইয়ের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সাফের পর উনি শিরোনাম করেছিলেন ‘৫ স্বর্ণ, ২ রৌপ্য, ৭ পদক—শাবাশ মোশাররফ, জাতি তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’ এর আগে ১৯৭৭ সালে প্রথম বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদ হিসেবে যখন বিদেশ থেকে স্বর্ণপদক জিতি শ্রীলঙ্কায়, তখনকার একটি ঘটনাও পরে শুনেছি। জামান ভাই চেয়েছিলেন আমার খবরটি প্রথম পৃষ্ঠায় দিতে। কিন্তু অফিস থেকে বলা হচ্ছিল, ওখানে দেবে না। তখন জামান ভাই নিজের পদত্যাগপত্র লিখে বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশের প্রথম পদক জয়ের খবর যদি প্রথম পৃষ্ঠায় না যায়, তাহলে আমি সাংবাদিকতাই করব না।’ ওনার জন্যই পরে খবরটি যায় প্রথম পৃষ্ঠায়।

প্রশ্ন : এবার একটু আপনার ‘সাঁতারের প্রথম পৃষ্ঠা’য় একটু যেতে চাই। সাঁতারে আগ্রহ হলো কিভাবে?

মোশাররফ : আমার জন্ম মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের ধামারন গ্রামে। বাবা আব্দুল বারী খানের ছিল কাপড়ের ব্যবসা। মা মালেকা বারী মধু সংসার দেখভাল করতেন। আমরা ৫ ভাই, ৫ বোন। আমি ৬ নম্বর। গ্রামের ছেলেদের যা হয় আর কি, সাঁতারটা শেখা হয়ে যায় ছোটবেলাতেই। কার কাছে শিখেছি, তা মনে নেই। তবে মনে আছে, প্রথম প্রতিযোগিতা করি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়।

প্রশ্ন : দ্বিতীয় শ্রেণিতে!

মোশাররফ : হ্যাঁ। গ্রামে নৌকাবাইচ হবে আর হবে ‘এক মাইল সাঁতার’। দূরত্বটা এক মাইল বলে নামটা এমন। তখন আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন আব্দুস সোবহান শিকদার স্যার। উনি নিজে স্কুল জীবনে ব্যাকস্ট্রোক সাঁতারে পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি এক মাইল সাঁতারে আমার নাম দিয়ে দিলেন। এরপর বাড়ির পুকুরে শুরু করালেন প্র্যাকটিস। যতটা সময় প্রাইভেট পড়াতেন, তার চেয়ে বেশি সময় সাঁতার অনুশীলন করাতেন তিনি।

প্রশ্ন : প্রাইভেট শিক্ষক সাঁতার শেখাচ্ছেন—ব্যাপারটি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মেনে নেওয়া একটু কঠিন ছিল না?

মোশাররফ : আমার বাবার কিন্তু উল্টো উত্সাহ ছিল। কারণ উনি নিজে ছিলেন ক্রীড়াবিদ। তারুণ্যে কলকাতায় সাঁতার কেটেছেন, ওয়াটার পোলো লিগে খেলেছেন; কাবাডি খেলে বেড়াতেন পুরো দেশে। ১৯২০ সালে নিখিল ভারতের লং জাম্প প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিলেন বলেও আমাকে বলেছেন। খেলাধুলা তাই পরিবারেই ছিল। আর দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ওই এক মাইল সাঁতারে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের হারিয়ে যখন প্রথম হয়ে গেলাম, তখন আমাকে আর পায় কে!

প্রশ্ন : পুরস্কার কী দিয়েছিল, মনে আছে?

মোশাররফ : শিল্ড। সেটি উচ্চতায় প্রায় আমার সমান। পুরস্কার দিচ্ছিলেন আমাদের মুন্সীগঞ্জের এসডিও; পরে যে নির্বাচন কমিশনার হয়েছেন আবু হেনা সাহেব, উনি। শিল্ড তুলে দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো একদম সাপের মতো সাঁতার কাটলে; পানিও টের পেল না।’

প্রশ্ন : এরপর?

মোশাররফ : এরপর সাঁতারটা ভালোবেসে ফেললাম। বজ যোগিনী জয়কালী হাই স্কুলে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান আন্ত স্কুল সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন হই আমি। এটি ১৯৬৮ সালের কথা। ফাইনালে অতিথি ছিলেন সব্যসাচী ক্রীড়াবিদ কাজী আবদুল আলিম। ১০ ইভেন্টের স্বর্ণপদকজয়ীর জন্য ১০টি কাপ এবং একটি বড় কাপ চ্যাম্পিয়নদের চ্যাম্পিয়নের জন্য। প্রথম পুরস্কার নেওয়ার জন্য যখন মঞ্চে যাই আলীম ভাই আমাকে বললেন, ‘মোশাররফ, এক কাজ কর। বারবার আসার দরকার নেই। ওখানে যে ১০টি ট্রফি আছে এবং একটি বড় ট্রফি—সব নিয়ে নাও একবারে। ওই সবই তোমার।’

প্রশ্ন : ছোটবেলায় অন্য কোনো খেলা খেলেননি?

মোশাররফ : পোলভোল্টে পূর্ব পাকিস্তানের আন্ত স্কুলে দ্বিতীয় হয়েছি। ১৫০০ মিটার দৌড়াতাম; খুব একটা ভালো করতে পারিনি অবশ্য। শর্টপুট-ডিসকাস ভালো করতাম। আবার স্কুল দলে ফুটবলও খেলেছি; গোলরক্ষক ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনার অন্য ভাইয়েরা কি খেলাধুলার সঙ্গে ছিলেন?

মোশাররফ : হ্যাঁ, আমরা চার ভাই একসঙ্গে রিলেতে সাঁতরেছি পর্যন্ত। আন্ত মিল প্রতিযোগিতায়। সেখানেও প্রথম হই। আমার ছোট দুই ভাই অনেক আন্তর্জাতিক মিটেও সাঁতরেছে।

প্রশ্ন : শুরুর দিকে বলেছিলেন যে, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে শেষ যেবার পানিতে নামেন, সেবারও নতুন রেকর্ড করেছিলেন। তখন তাহলে অবসর নিলেন কেন?

মোশাররফ : বয়স হয়েছিল তো! ১৯৮৪ সালে প্রথম সাফে আমি যখন সাঁতরাই, তখন আমার বয়স ৩২ বছর। ৩৩ বছর বয়সে দেশের সাফ গেমসে পাঁচ স্বর্ণপদক জিতেছি। ৩৫ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালে কলকাতা সাফ গেমসে আবার তিনটি রৌপ্য জিতি। এত বয়সে সাঁতার কাটা খুব কঠিন। তার ওপর তখন ঠিক করি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেব। আমি অল্প দূরত্বের সাঁতারু; ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার জন্য লম্বা দূরত্বের সাঁতারের প্রস্তুতি নিতে হবে। সব মিলিয়েই অবসর নিয়ে ফেলি।

প্রশ্ন : ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ভাবনা মাথায় আসে কেন?

মোশাররফ : এটি সব সাঁতারুরই স্বপ্ন। আমার স্বপ্নটি বেশি করে ছিল, কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে আর কেউ তা করেনি। আমাদের ব্রজেন দাশ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন কয়েকবার; আবদুল মালেকও পাড়ি দেন ১৯৬৩ সালে। কিন্তু তাঁদের রেকর্ডে দেশের নাম কিন্তু পাকিস্তানই লেখা; পূর্ব পাকিস্তান। ওখানে বাংলাদেশের নাম তোলার জেদ ছিল।

প্রশ্ন : যেটি বলছিলেন যে, আপনি তো স্বল্প দূরত্বের সাঁতারু। ওই জেদ পূরণের কাজটি নিশ্চয়ই সহজ হয়নি?

মোশাররফ : মোটেই না। প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে প্রথম লম্বা দূরত্বের সাঁতার করি এরশাদ সাহেবের সময়। সদরঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া হয়ে নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল—অন্তত ৫০ মাইলের কম নয়। দেশে এমন সাঁতার সেবারই প্রথম। সদরঘাটে এরশাদ সাহেব সাঁতার শুরু করে দেন। তখন আমার গায়ে খুব জ্বর। উনি আমার সঙ্গে হাত মেলাতে গিয়ে বলেন, ‘তোর গা এত গরম কেন? জ্বর নাকি?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ স্যার। কিন্তু পানিতে নামলে জ্বর চলে যাবে।’ ঠিকই আমি প্রথম হই। গুলশান লেকে ২২ মাইলের আরেক সাঁতারেও প্রথম হই। তখন নিজের মধ্যে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা আরো পোক্ত হয়।

প্রশ্ন : ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতিটা ছিল কেমন?

মোশাররফ : আমি ছিলাম সোনারগাঁ হোটেলের হেলথ ক্লাবের আজীবন সদস্য। নতুন হোটেল হয়েছে, সেখানে সাঁতার কাটতে যেতাম। দেশের বড় ব্যবসায়ী, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নায়ক-নায়িকারা সাঁতার কাটতে যেতেন সোনারগাঁওয়ে। বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান সাহেব যেতেন। নির্মাণ ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার কে জেড ইসলাম সাহেব যেতেন। নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে শাবানা, অলিভিয়া, বুলবুল, আলমগীররা। ওখানে একদিন কে জেড ইসলাম সাহেব আমাকে বললেন, ‘মোশাররফ, তুমি তো সাঁতারে অনেক কিছু করলে। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছ না কেন?’ আমি বললাম, ‘স্যার, অনেক টাকা লাগবে।’ উনি কিন্তু একসময় আমার বস ছিলেন। আমি যখন বিটিএমসিতে, উনি তখন ওখানকার ফিন্যান্স ডিরেক্টর। কে জেড ইসলাম সাহেব আবার জানতে চান, ‘কত টাকা লাগবে?’ আমি বলি, ‘পাঁচ লাখ তো লাগবেই।’ উনি বলেন, ‘তুমি প্রস্তুতি নাও, আমি পাঁচ লাখ টাকা দেব।’

প্রশ্ন : এরপর?

মোশাররফ : এরপর আমি বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনে যোগাযোগ করি। ওরা ‘চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন ইংল্যান্ড’-এর সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান করে আমার জন্য অনুমতি নিয়ে আসে। আসাফউদ্দৌলা সাহেব ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে আমার জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেন। তা নিয়ে আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে ইংল্যান্ড চলে যাই। ওখানে গিয়ে কে জেড ইসলাম সাহেবের পরামর্শমতো লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করে তাঁকে জানাই। পরদিনই আমার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকার সমপরিমাণ পাউন্ড জমা হয়ে যায়।

প্রশ্ন : ইংল্যান্ডে যাওয়ার কত দিন পর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিলেন?

মোশাররফ : আড়াই মাস পর। ওই যে বললাম, কে জেড ইসলাম সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ এবং সরকারের দেড় লাখ— মোট সাড়ে ছয় লাখ টাকা লাগবে কেন? কারণ ওখানে গিয়ে আমাকে তিন মাসের জন্য বাড়ি ভাড়া করতে হবে। একজন ম্যানেজার লাগবে। একজন ট্রেনার লাগবে, যে কিনা আমাকে সাড়ে ২২ মাইলের এই সাঁতারের প্রশিক্ষণ দেবে। প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে অনুশীলন করতাম; সাঁতরাতাম অন্তত ২৪ কিলোমিটার অর্থাৎ পুরো চ্যানেলের অর্ধেকের মতো। এর মধ্যে প্রথম দিনটি আমি কখনো ভুলব না।

প্রশ্ন : কেন?

মোশাররফ : পানি যে কী ঠাণ্ডা ছিল রে ভাই! আমি নেমেই উঠে আসতে চেয়েছিলাম। ট্রেনার কোরি আমাকে নিয়ে গেল। ওখানে অর্চনা পাতিল নামে এক ভারতীয় মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। ওর সঙ্গেই নামি পানিতে। কিন্তু হাঁটু পর্যন্ত পানি নেমেই উঠে আসতে চাই ঠাণ্ডার কারণে। মনে হচ্ছিল আমার পা জমে বরফ হয়ে গেছে; এখন তা কেটে ফেললেও টের পাব না। আমার স্ত্রী ছিল ওখানে, ও বলে, ‘ভারতের ওই ছোট মেয়েটা পারছে, তুমি পারবে না কেন?’ ট্রেনার কোরিও উত্সাহ দিল। আমি পানিতে নেমে অর্চনার সঙ্গে ৪৫ মিনিট সাঁতার কাটলাম। এরপর উঠে আসার সময় দেখি ওপরে থাকা সবাই হাততালি দিচ্ছে। কোরি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি অসাধারণ করেছ। কারণ প্রথম দিন কেউ এখানে পাঁচ-ছয় মিনিটের বেশি পানিতে থাকতে পারে না।’ আমি বলি, ‘তাহলে অর্চনা কিভাবে করল?’ কোরি বলে, ‘ও দুই মাস ধরে অনুশীলন করছে। তবু ৪৫ মিনিটের বেশি পানিতে থাকতে পারে না। আর তুমি কিনা প্রথম দিনই ৪৫ মিনিট থাকলে!’

প্রশ্ন : আড়াই মাস পর আপনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিলেন?

মোশাররফ : আমি আরো আগেই প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিচ্ছিল না। কারণ আমার ওজন কম। এত সময় পানিতে থাকতে হলে ওজন আরো বাড়াতে হবে, শরীরে চর্বি বাড়াতে হবে, যা ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করবে। পরে আমার রুটিনটা ছিল খুব মজার। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আট ঘণ্টা সাঁতার, আট ঘণ্টা ঘুম আর বাকি আট ঘণ্টা খাওয়া। আর সত্যি সত্যি যেদিন ১০ ঘণ্টা ১৬ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিলাম, কী যে ভালো লেগেছিল! এখন থেকে তাহলে ওই চ্যানেল পাড়ি দেওয়াদের মধ্যে বাংলাদেশের নামও থাকবে। এখন পর্যন্ত একমাত্র আমার সৌজন্যেই ওখানে বাংলাদেশের নাম আছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনার চেয়ে ভালো সাঁতারু কাউকে দেখেছেন?

মোশাররফ : আসবে; সামনে নিশ্চয়ই আসবে। কিন্তু রেকর্ডবই দেখলে বুঝবেন, আমার চেয়ে ভালো সাঁতারু এখন পর্যন্ত কেউ আসেনি। এখানে একটি মজার কথা বলি। এখন দেশের খুবই বড় পর্যায়ে থাকা একজন ব্যক্তির সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। এটি অনেক আগের কথা; উনি তখন সম্ভবত জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার। উনি আমাকে মজা করে বলেন, ‘অ্যাই মোশাররফ, তুমি কি মনে করো, তুমি বাংলাদেশের সেরা সাঁতারু? তোমার চেয়ে বড় সাঁতারু কেউ নেই? পাকিস্তান আমলে ১৪ আগস্টে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিকলীতে হাওরে সাঁতার হতো। সেখানে আমি বহু বছর প্রথম হয়েছি। তোমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ও কিন্তু তাই তোমার চেয়ে বড় সাঁতারু।’

প্রশ্ন : বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ?

মোশাররফ : (হাসি) হ্যাঁ। খুব মজা করে কথা বলেন উনি। ভীষণ রসিক।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাঁতারে আপনি অবিসংবাদিত রাজা ছিলেন। এক সাফে পাঁচটি স্বর্ণপদক পেয়েছেন। যদি বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পেতেন, তাহলে আরো অনেক দূর যেতে পারতেন বলে মনে করেন কি না? ধরুন অলিম্পিক পর্যায়ে?

মোশাররফ : সাফে আমার সাফল্য বুড়ো বয়সে। ৩২-৩৩-৩৪ বছর বয়স সাঁতারের জন্য অনেক বেশি। ১৯৭৯ সালে প্রথম এশিয়ান সাঁতারে তিনটি রৌপ্য পাই আমি। আমার মান বেশ ভালো ছিল। আসলে আমার তরুণ বয়সে যদি ভালো প্রশিক্ষণ পেতাম, তাহলে যেকোনো কিছু সম্ভব ছিল। ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে রাশিয়া থেকে এক সাঁতার কোচ এসেছিলেন। উনি আমার স্ট্রোক দেখে বলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে রাশিয়া চলো। তোমাকে আমি অলিম্পিকে পদক পাইয়ে দেব।’ তা কি আর যাওয়া যায়! তবে ওই তরুণ বয়সে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পেলে আমার অলিম্পিক পদক পাওয়া অসম্ভব ছিল বলে মনে করি না। তবে এখানে আমার ট্রেনার আবদুল কাদির ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। উনি ১৯৭২ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত পুরোটা সময় আমার ট্রেনার ছিলেন। সাঁতারে যা কিছু অর্জন, তাতে তাঁর অনেক বড় অবদান। আমার মা-বাবার পর তাঁকেই আমি সবচেয়ে বেশি মানি।

প্রশ্ন : এত এত পদক জিতছেন, দেশে আপনার ভক্তও ছিল নিশ্চয়ই অনেক?

মোশাররফ : বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তখন দুজনই তারকা। ফুটবলের সালাউদ্দিন আর সাঁতারের মোশাররফ।

প্রশ্ন : ভক্তদের কোনো মজার ঘটনা মনে আছে?

মোশাররফ : অনেক। তখন তো আর ই-মেইল ছিল না; ভক্তরা চিঠি লিখত। বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে, ক্লাবে, সাঁতার ফেডারেশনে এবং যাঁরা আমার বাড়ির ঠিকানা জানত সেখানেও আমার নামে চিঠি আসত। সপ্তাহে এক শ, দুই শ, পাঁচ শ চিঠিও আসত। বেশির ভাগ চিঠি তো মেয়েরাই পাঠাত। ভারতে একবার সাঁতার প্রতিযোগিতায় যাই; ফিরে এসে এসব জায়গার চিঠি একসঙ্গে করে বসি তিন বন্ধু। তখন বন্ধুরা মিলে ঠিক করি, আমরা তিনজন তিনটি চিঠি ওঠাব। আমি যাঁর নাম ওঠাব, তাঁর সঙ্গে দেখা করব। সেটি দেশের যে জায়গাতেই হোক অথবা যদি কলকাতাতেও হয়। কলকাতা থেকেও চিঠি আসত। আর অন্য দুই বন্ধুও এরপর চিঠি তুলবে। যাঁর নাম উঠবে, চিঠির মাধ্যমে ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে আমার নাম দিয়ে। মানে সাঁতারু মোশাররফ সেজে।

প্রশ্ন : তাই করেছিলেন?

মোশাররফ : হ্যাঁ। দুই বন্ধুর একজন তো অনেক দিন চিঠি চালাচালি করেছিল, রীতিমতো প্রেম হয়ে যায়। মিনি-রূপা-গোপা তিন বোনের নাম থাকলেও চিঠিটি লিখেছিল রূপা; কলকাতা থেকে। আরেক বন্ধুর চিঠি ওঠে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এক মেয়ের। আর আমার তোলা চিঠি ছিল কুমিল্লার এক বড় সরকারি অফিসারের মেয়ের। এর কিছুদিন পরই কুমিল্লায় আমার সংবর্ধনা ছিল। ওখানে গিয়ে ওই মেয়ের ঠিকানা ধরে খুঁজি সাঁতারু অরুণ নন্দীর কাছে। উনি বলেন, ‘এই ঠিকানা তো সরকারের বড় অফিসারের। পদমর্যাদায় ডিসির পর যিনি।’ ওই বাসায় যাই। ওই অফিসার ভদ্রলোক তখন বাসায় ছিলেন না। তাঁর স্ত্রীকে পরিচয় দিতেই খুব অভ্যর্থনা জানান। তিন মেয়েকে চিত্কার করে ডাকেন। ওই মহিলা নিজের মেজ মেয়েকে দেখিয়ে বলেন, ‘দেখুন, ও আপনার কেমন ভক্ত। নিজের রুমের চারদিকে সব তোমার পেপার কাটিং।’ সত্যি দেখি তাই; দেয়ালে একটুও ফাঁকা নেই। সব আমার ছবি; আমার পেপার কাটিং। বুঝতে পারছেন তো, কেমন জনপ্রিয় ছিলাম আমি।

প্রশ্ন : আপনি বিয়ে করেন কবে?

মোশাররফ : আমি বিয়ে করেছি ১৯৮১ সালে। আমার স্ত্রীর নাম আনিলা মোশাররফ। ও ব্যাডমিন্টন খেলত, হার্ডলস করত, রিলে করত। প্রেম করেই বিয়ে। তখন আমাদের নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়েছে। আমি তখন এয়ারফোর্সে; ফ্লাইং অফিসার ছিলাম। আমাদের দুজনের ছবি নিয়ে পত্রিকায় হেডিং হয়েছে, ‘পাইলট কি সাঁতার সামলাবে নাকি ষোড়শী সামলাবে?’ বোঝেন অবস্থা! পরে তো আমাদের বিয়ে হয়। আমার দুটো মেয়ে—মুশায়রা মোশাররফ কেকা, শায়রা মোশাররফ কুহু। ওদের বিয়ে আমেরিকায় হয়েছে; ওখানেই সেটলড।

প্রশ্ন : সাঁতার ছাড়ার পর তো সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন?

মোশাররফ : হ্যাঁ, ১২ বছর সে দায়িত্বে ছিলাম। এরপর ২০০২ সালে আমেরিকা চলে যাই। চলে যেতে একরকম বাধ্য হই।

প্রশ্ন : কেন?

মোশাররফ : ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিংপুল আমি টেন্ডার করে লিজ নিয়েছিলাম। ওখানে বাচ্চাদের সাঁতার শেখাচ্ছিলাম। আর ওপরে বানালাম ‘সাঁতার জাদুঘর’। ওখানে আমার সব পদক; সব সার্টিফিকেট রাখিয়ে রাখি। শত শত বাচ্চারা প্রতিদিন আসত সেখানে। ওরা দেখত; উজ্জীবিত হতো। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ অনুষ্ঠানের ডক্টর এনামুল হক সাহেব ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক। উনি আমাকে চিঠি দিলেন যে, আমার সাঁতার জাদুঘরের সব কিছু জাতীয় জাদুঘরে নিতে চান। ওখানে একটি কর্নার করবেন। আমি তখন রাজি হইনি। বলেছি, ‘স্যার, আমি সাঁতার জাদুঘর করলাম এত শখ করে। আপনার জাতীয় জাদুঘরে দিব সব; তবে আরো কিছুদিন পর।’ এখন মনে হয়, কী ভুলটাই না করেছি!

প্রশ্ন : ভুল কেন?

মোশাররফ : কারণ ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা এসে আমার সাঁতার জাদুঘর লুট করে। সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। আমার কোনো পদক আর নেই; কোনো সার্টিফিকেট নেই। আমার কয়েকটি ট্রাংক বোঝাই পেপারকাটিং ছিল; সব পুড়িয়ে দেয়। ভারতের এক প্রতিযোগিতার পুরস্কারে সোনার হরিণ পাই; পাকিস্তানে এক সংবর্ধনায় মুন্নু গ্রুপ দেয় সোনার প্লেট। সব কিছু ওখানে ছিল। যা লুট করে নিয়েছে। এত কিছু করার কারণ আমি আওয়ামী লীগ সমর্থন করি। এটাই আমার অপরাধ! ১৯৯৬ সালে আমি ‘জনতার মঞ্চে’ যোগ দিয়েছিলাম। সেবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতার পর ভালোই ছিলাম। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনে আমি টিকতে পারিনি। এমনকি আমাকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্তও হয়। বাংলাদেশ নেভির প্রধান নুরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। উনি সব শুনে আমার পাসপোর্ট নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে মতিঝিল গিয়ে টিকিট কাটলেন। আমাকে প্লেনের ভেতর বসিয়ে পরে বিদায় নিলেন। আমেরিকায় আমার সব ভাইরা থাকে; রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় রয়েছেন অন্তত দেড় শ। তবু আমি দেশে ছিলাম। কিন্তু তখন দেশে থাকলে জেলে যেতে হতো বলে এক দিনের নোটিশে আমেরিকা চলে যাই। স্ত্রী-সন্তানরা ওখানে আগে থেকে থাকায় ভিসা তো আগে থেকেই নেওয়া ছিল। এত বছর আমেরিকায় আছি, কিন্তু এখনো দেশের কথা খুব মনে হয়।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার সন্তুষ্টি কতটা?

মোশাররফ : আমি খুব তৃপ্ত। সাঁতারে কত কত পদক পেয়েছি, তা আপনাকে বলেছিই। ১৯৭৭ সালে পাই জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে স্বাধীনতা পদক। বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির পুরস্কার পাই ১৯৭৪ ও ১৯৮৫। ১৯৮৫ সাফ গেমসের পর ‘বেস্ট স্পোর্টসম্যান অব সাউথ এশিয়া’ পুরস্কার পাই সাফের সব দেশের সাংবাদিকদের বিবেচনায়। এসব তৃপ্তির তুলনা নেই। সাঁতারের জন্য পৃথিবীর ৭১টি দেশে গিয়েছি। এ কম কথা? আমার বাবাও ছিলেন খুব তৃপ্ত মানুষ। উনি আমাকে বলতেন, ‘বাবা, আমার সন্তানরা এত ভালো আছে সবাই, আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি?’ আমার জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়েও বাবার মতোই মনে হয়—আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি?


মন্তব্য