kalerkantho


ফুলে ফুলে অমূল্য রত্নের খোঁজে

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ফুলে ফুলে অমূল্য রত্নের খোঁজে

বার্সেলোনা থেকে দিন দুয়েক আগেই দলেবলে মস্কো এসে পৌঁছেছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইনদের জন্য একটি ফুল নিয়ে অপেক্ষায় ছিল রাশিয়া।

কৃষ্ণ সাগর সেচা শহর সোচিতে নেইমাররা পা রাখেন পরশু। ব্রাজিলিয়ানদের স্বাগত জানানো হয়েছে তিন ফুলে।

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালও এসে পড়েছে রাশিয়ায়; কাল। নিজেদের বেস ক্যাম্প ক্রাসনোদারে ঘাঁটি গেড়েছে তারা। এর আগে অভ্যর্থনা পেয়েছে পাঁচ ফুলে।

থোমাস মুলারের জার্মানি চলে এসেছে; তাদের জন্য বরাদ্দ সাত ফুল। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার স্পেনের জন্য ৯, পল পগবার ফ্রান্সের জন্য ১১, হ্যারি কেনের ইংল্যান্ডের জন্য ১৩...। দল এসেছে, আসছে। ফুলের তোড়ায় সংখ্যার হেরফের হতে পারে; তবে কোনোভাবেই তা জোড় সংখ্যা নয়। রাশিয়ায় কাউকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য, উপহার দেওয়ার জন্য, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিজোড় সংখ্যার ফুল দেওয়াই যে দস্তুর!

জোড় সংখ্যার ফুল বরাদ্দ শুধু একটি জায়গায়। কারো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য!

ইতিহাসে রাজার নাম পাওয়া যায় প্রতি পৃষ্ঠায়; প্রজার নাম কোথাও না। বিশ্বকাপ ফুটবলে এই ফেভারিট দলগুলো এসেছে সেই রাজত্বের মুকুট চার বছরের জন্য নিজেদের অধিকারে নেওয়ার জন্য। ফুটবলের অমরত্বের পেয়ালায় চুমুক দেওয়ার জন্য। কোন দল পারবে না? কে হয়ে উঠবেন সমকাল পেরিয়ে মহাকালের মহানায়ক? সময় ছাড়া এর উত্তর এখন নেই কারো কাছে।

তবে সমকালের হিসাবে ধরলে দাবিটা সবচেয়ে বেশি মেসির। ক্লাব ফুটবলে হেন শিরোপা নেই, যা জেতেননি। ব্যক্তিগত এমন কোনো শিরোপা নেই, যা পাননি। ব্যালন ডি’অর জিতেছেন পাঁচ পাঁচবার। এর সবই বার্সেলোনার জার্সিতে জাদুকরী ফুটবলের সৌজন্যে। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো শিরোপা যে জিততে পারেননি! লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের আসর কোপা আমেরিকার ফাইনালে দলকে তুলেছেন তিনবার; প্রতিবার রানার্স-আপ। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও দৌড়টা ওই ফাইনাল পর্যন্ত। সেবার জার্মানির মারিও গোেজর অতিরিক্ত সময়ের গোলে হৃদয় ভাঙে মেসি ও আর্জেন্টিনার। এবার?

মেসির বয়স হয়ে গেছে ৩১ বছর। আগামী বিশ্বকাপ আসতে আসতে সেরা সময় পেছনে ফেলে আসবেন নিশ্চিতভাবে। বিশ্বকাপ জেতার শেষ সুযোগ তাই এবারই। যদিও এর প্রস্তুতিটা ভালো হয়নি আর্জেন্টিনার। ইনজুরির কারণে সের্হিয়ো রোমেরো ও মানুয়েল লানসিনির বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে। ওদিকে বিতর্কের মুখে বাতিল করতে হয়েছে ইসরায়েলের বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ। মস্কোতেই তাই শেষ সময়ের প্রস্তুতি সারতে হবে হোর্হে সাম্পাওলির দলকে। ১৬ জুন এখানকার লুঝনিকি স্টেডিয়ামে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে মেসির দলের বিশ্বকাপ অভিযান।

মস্কোতে কাল আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে যত সমর্থক দেখা গেছে, ব্রাজিলের জার্সিতে তত নয়। হয়তো পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের প্রথম ম্যাচ এখানে নয় বলে। রোস্তভে ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শিরোপা পুনরুদ্ধারের লড়াই শুরু হবে নেইমারের দলের। দলের প্রাণভোমরার যুদ্ধটা অবশ্য আরো পুরনো। নিজেদের মাঠে গেল বিশ্বকাপে ইনজুরিতে পড়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। খেলতে পারেননি তাই সেমিফাইনাল। নেইমারের জন্য হাহাকারেই কিনা জার্মানির বিপক্ষে সেই সেমিতে ১-৭ গোলে হারের লজ্জা সেলেসাওদের।

এবারও তিনি ফেব্রুয়ারিতে পড়েন বড়সড় ইনজুরিতে। বিশ্বকাপ খেলাই সংশয়ের মুখে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে নিজের প্রস্তুতির জানান দিয়েছেন নেইমার জোরেশোরে। দুর্দান্ত দুটো গোল করে। ম্যাচ দুটো জিতেছে লিওনার্দো বাক্কি তিতের ব্রাজিলও। দারুণ ছন্দে দলটি। কার্লোস দুঙ্গার কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্রাজিলকে কক্ষপথে ফিরিয়েছেন তিতে। কিন্তু তিনি কি আর জানেন না, বিশ্বকাপ জিততে না পারলে আর কোনো কিছুরই মূল্য থাকবে না!

রোনালদোর পর্তুগালকে গোনার মধ্যে ধরছে না তেমন কেউ। সেটি তো ২০১৬ ইউরোতেও কেউ ধরেনি। কিন্তু ঠিকই ওই শিরোপা জিতেছে তারা। দলে যখন একজন রোনালদো থাকেন, তখন অসম্ভব বলে কিছু নেই আসলে। মেসির মতো তিনিও পাঁচ বছর গ্রহের সেরা খেলোয়াড়ের মুকট জিতেছেন। বিশ্বকাপ জিতে অমরত্বের হাতছানি তাঁর সামনেও।

জার্মানির চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। টানা দুইবারের শিরোপা জয়। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের ব্রাজিল ছাড়া যা পারেনি কোনো দল। অবশ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ জমানায় টানা দুইবার তো ট্রফি জিততে পারছিল না কোনো ক্লাবই; সেখানে রিয়াল মাদ্রিদ কিনা কিছুদিন আগে জিতল টানা তিনবার! জার্মানির জন্যও তাই বিশ্বকাপ ধরে রাখা অসম্ভব কী! বিশেষত গত বছর যখন একেবারে দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে বিশ্বকাপের মহড়ার টুর্নামেন্ট কনফেডারেশন কাপ জিতেছে!

স্পেনের চ্যালেঞ্জও আছে নিজেদের মতো। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো জয়ে ভিন্ন রকম হ্যাটট্রিকে সর্বকালের সেরা দলগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল তারা। সেই দলটি কিনা গেল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে বাদ! এবার তাই স্পেনের সামনে শিরোপার সঙ্গে সম্মান পুনরুদ্ধারেরও সুযোগ।

ফুটবলারদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতিভাবান দল সম্ভবত ফ্রান্স। কিন্তু অমন দল নিয়েও তো গেল ইউরোর ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হেরে যায় তারা! আর ফ্রান্স দলে গৃহবিবাদের আশঙ্কাও থাকে সব সময়। ২০১০ বিশ্বকাপের ওই তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে গেছে কে!

বাকি দলগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডের সম্ভাবনা নিয়ে উচ্চকিত নয়, এমনকি সে দেশের গণমাধ্যমও। ডার্ক হর্স হিসেবে বেলজিয়ামকে ধরা হচ্ছে বটে; তাই বলে শিরোপা জয়! উরুগুয়ে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও তারা নেই হিসাবের মধ্যে। বাকি দলগুলোর মধ্যে কারো লক্ষ্য নক আউট পর্বে উত্তরণ; কারো বা আরেকটু দূর। তাদের জন্য বিশ্বকাপ শিরোপা ওই দূরের বাতিঘর।

মস্কোর ঘণ্টার মতো বিশ্বকাপ ঘণ্টাও বেজে উঠল বলে! কালই শুরু হয়ে যাবে মাঠের লড়াই। তার আগে রাশিয়ায় ১, ৩, ৫, ৭ কিংবা ১০১, ২০৩, ৩০৫, ৪০৭ সংখ্যার ফুলের তোড়ায় স্বাগত জানানো হয়েছে, হচ্ছে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৩২ দলকে। কিন্তু আগামী এক মাসে এ দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সমবেদনামাখা জোড় সংখ্যার ফুলেই বিদায় নিতে হবে ৩১ দলকে। ২, ৪, ৬, ৮ কিংবা ১০২, ২০৪, ৩০৬, ৪০৮ ফুলে। যে তালিকায় স্বাগতিক রাশিয়াও থাকবে নিশ্চিতভাবে। একটিমাত্র দলই শুধু ১৫ জুলাই অভ্যর্থনা পাবে বিজোড় সংখ্যার ফুলের তোড়ায়।

অমূল্য রত্নের মর্যাদা পেয়ে যাওয়া বিশ্বকাপের ওই সোনালি ট্রফি জিততে পারবে যে দল। হয় নেইমারের ব্রাজিল অথবা মেসির আর্জেন্টিনা কিংবা রোনালদোর পর্তুগাল। জার্মানি বা ফ্রান্স বা স্পেন বা ইংল্যান্ড।

অভ্যর্থনার মতো বিদায়ী সংবর্ধনা বিজোড় ফুলে করার চ্যালেঞ্জই বিশ্বকাপের ফেভারিটদের।


মন্তব্য