kalerkantho


মেক্সিকান দেয়ালে আটকাল জার্মান রথ

নোমান মোহাম্মদ, মস্কো থেকে   

১৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মেক্সিকান দেয়ালে আটকাল জার্মান রথ

সবুজ সমুদ্রের বদলে উঠত যদি কালো-লাল-হলুদের ঢেউ, তাহলে নিশ্চিতভাবে সংবাদ শিরোনাম হতো, ‘মস্কো দখল করে নিয়েছে জার্মানি।’

ইতিহাসের কিছু ঘা মোছে না কখনো। যেমনটা রুশদের মন থেকে মুছবে না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি। কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে, কিন্তু নািসদের বর্বরতা ভোলেনি তারা। জার্মানরাও হয়তো কিছুটা কাঁচুমাচু। খানিকটা অপরাধবোধে ভোগে। যে কারণে নিজেরা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া সত্ত্বেও, ইউরোপ এবারের টুর্নামেন্টের আয়োজক হওয়ার পরও রাশিয়াতে তত বেশি জার্মান আসেনি। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ইওয়াখিম ল্যোভের দলের প্রথম ম্যাচের আবহে তাই শুধুই মেক্সিকোর জয়জয়কার। তাদের পতাকায় তিন রং—সবুজ, সাদা, লাল। ফুটবল দলের আদুরে নাম ‘এল ত্রি’ অথবা ‘তিন রং’। কিন্তু মেক্সিকোর ফুটবল জার্সি শুধুই সবুজ। সে জার্সিতে সয়লাব সেদিনের লুঝনিকি। সমর্থকদের অনেকের মাথায় ঐতিহ্যবাহী বাহারি হ্যাট। হাতে বাদ্যযন্ত্র, কণ্ঠে গান। রাজনৈতিক বৈরিতার ইতিহাস থাকলে রুশরা অবশ্যই বলত, ‘মস্কো দখল করে নিয়েছে মেক্সিকো।’

রাশিয়ার রাজনৈতিক দখল নেয়নি তারা, তবে জার্মানিকে হারিয়ে দিয়েছে ঠিকই। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ে বিশ্বকাপকে প্রবল ঝাঁকুনিই দিয়েছে মেক্সিকো। আরেক অভিশপ্ত ইতিহাস যে তাতে তাড়া করার কথা জার্মানিকে।

ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সে ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়া হলো কোচ ইওয়াখিম ল্যোভকে। সর্বশেষ চার বিশ্বকাপের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে তিনটি দলই বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ডে। ১৯৯৮ সালের ট্রফিজয়ী ফ্রান্স পরেরবার গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। ২০০৬ সালের শিরোপাজয়ী ইতালিও চার বছর পর আটকে যায় প্রথম রাউন্ডের গেরোতে। আর ২০১০ ট্রফিজয়ী স্পেনও ২০১৪ সালে। প্রশ্নটি করা হয় ইংরেজিতে। অনুবাদক যন্ত্রে সেটি জার্মান ভাষায় তাঁর কানে যেতেই হেসে ওঠেন জার্মানির কোচ, ‘অন্যদের বেলায় কেন অমন হয়েছে, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, এবার অমন কিছু হবে না। আমরা অবশ্যই নকআউট পর্বে যাব। আর সেখানে কে হবে আমাদের প্রতিপক্ষ, সেটি নিয়েও কোনো মাথাব্যথা নেই।’

শেষ বাক্যটিতে কিছু ‘মাথাব্যথা’র ছায়া অবশ্যই পাওয়া যায়। কারণ জার্মানি যদি ‘এফ’ গ্রুপে রানার্স-আপ হয় আর ‘ই’ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল—তাহলে তো দ্বিতীয় রাউন্ডেই মুখোমুখি হয়ে যাবে এই দুই পরাশক্তি।

তবে প্রথম ম্যাচে যে ফুটবল খেলেছে জার্মানি, তাতে নক আউট পর্ব এখন আক্ষরিক অর্থেই দূরের বাতিঘর। বাছাই পর্বে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে ল্যোভের দল। এরপর খেলা ছয়টি প্রস্তুতি ম্যাচের মধ্যে জিতেছে মাত্র একটিতে। অস্ট্রিয়ার কাছে এমনই এক ম্যাচে হারের পর কোচ নিশ্চিত করেছিলেন বিশ্বকাপে ভিন্ন জার্মানিকে দেখার। কিন্তু তা আর হলো কই! মেক্সিকো তাদের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বুক চিতিয়ে লড়াই করে; চোখে চোখ রেখে যুদ্ধ করে।

লুঝনিকির এই ম্যাচের শুরুটা শ্বাসরুদ্ধকর। আক্রমণ- পাল্টাআক্রমণের। এদিকে মেক্সিকোর হিরভিং লোসানোর প্রচেষ্টা ব্লক করেন জেরোম বোয়াটেং; ওদিকে জার্মানির টিমো ভেরনারের শট একটুর জন্য বেরিয়ে যায় বার ঘেঁষে। নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে থাকেনি মেক্সিকো; বরং প্রেস করেছে প্রবলভাবে। আর জার্মানিকে হতভম্ব করে এগিয়েও যায় ৩৫তম মিনিটে। বুলেট ট্রেনের গতির প্রতিআক্রমণে আন্দ্রেয়াস গুয়ার্দাদোর সঙ্গে দুর্দান্ত ওয়ান-টুতে মাটস হুমেলসকে বোকা বানিয়ে জায়গা পেয়ে যান হাভিয়ের এর্নান্দেস। এরপর বাঁয়ে ফাঁকায় দাঁড়ানো লোসানোকে পাস। পিছিয়ে আসা মেসুত ওয়েজিলকে ভেতরে কাট করে পরাস্ত করেন পিএসভি ফরোয়ার্ড, এরপর দারুণ শটে গোল। স্টেডিয়ামে তখন সবুজের উন্মাতাল ঢেউ।

গ্যালারির ছোট্ট এক অংশ দখল করে থাকা জার্মান তেরঙ্গা পতাকা ওড়ার সুযোগটা এসে যায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। টোনি ক্রোসের ফ্রি-কিক তো জালের ঠিকানায়ই যাচ্ছিল। মেক্সিকোর গোলরক্ষক গিলের্মো ওচোয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হাতের গ্লাভসের সামান্য স্পর্শে তা ফেরত আসে বারে লেগে। কিন্তু এটিকে জার্মানির আগ্রাসনের শুরু মনে করাটা ভুল। দ্বিতীয়ার্ধে তারা চেষ্টা করেছে ঠিক। জোশুয়া কিমিচ, ভেরনাররা গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। কিন্তু এর চেয়ে ঢের বেশি সুযোগ পায় মেক্সিকো। সেগুলো থেকে গোল হয়নি। তবে ১-০ গোলে জেতার পর সেসব নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে মেক্সিকোর!

এরপর লুঝনিকির সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে আসেন লোসানো। প্রায় হাড় জিরজিরে ছোট্ট একটি ছেলে। তিনিই কিনা জার্মান বধের নায়ক! স্প্যানিশ কথাবার্তায় খুশির প্রকাশ। তুলনায় কোচ হুয়ান কার্লোসন অসরিও বেশ পরিমিত, ‘জার্মানিকে হারিয়েছি বলে নিজেদের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বলে ভাবছি না আমরা।’ আর অনেকক্ষণ সবাইকে অপেক্ষায় রেখে সবার শেষে জার্মানির প্রতিনিধি হয়ে এলেন ল্যোভ। ঠিক যেমনটা হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল করে আর কি!

ওখানে সাহসী চেহারা দেখানোর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না জার্মান কোচের। জার্মানদের প্রথাগত আত্মবিশ্বাসও ছিল। কিন্তু সমান্তরালে ভয়ের চোরাস্রোতও কি ছিল না? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুরুতে রাশিয়ার অনেকখানি দখল করে নেওয়ার পরও তো শেষে পরাজয়ের নতিস্বীকার করতে হয়েছিল জার্মানিকে। আর ৭৩ বছর পর বিশ্বকাপ ফুটবলের লড়াইয়ের শুরুর সীমান্তেই তো পরাজয়।

আরো একবার না মাথা নিচু করে রাশিয়া ছাড়তে হয় এডলফ হিটলারের উত্তরসূরিদের!

 



মন্তব্য