kalerkantho


তবু ম্যারাডোনা থাকেন সবার ওপরে

নোমান মোহাম্মদ মস্কো থেকে   

১৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



তবু ম্যারাডোনা থাকেন সবার ওপরে

আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড ম্যাচ। স্পার্তাক মস্কো স্টেডিয়াম। সিট পড়েছে নিচ থেকে পঞ্চম সারিতে; অর্থাৎ ২০ হাত দূরত্বেই মাঠ। ম্যাচ শুরুর আগে ওয়ার্মআপ করতে নামছেন যখন দুই দলের ফুটবলাররা, তুমুল উল্লাসে তাঁদের স্বাগত জানান ৪৪ হাজার দর্শক। আর যখন জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানো হয় লিওনেল মেসির নাম ও ছবি—চিল চিৎকারে কান পাতা দায়।

কিন্তু কী আশ্চর্য, মিনিট কয়েক পর যে চিৎকার উঠল আরো জোরে! আক্ষরিক অর্থেই তা গগনবিদারী; যেন কংক্রিটের কাঠামোর ওপর উপুড় হয়ে থাকা নীলাকাশ ভেঙে পড়বে এক্ষুনি। কেন? মেসির চেয়েও জোর চিৎকারে দর্শকরা স্বাগত জানাচ্ছেন কাকে? আর কাকে, ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে! ভিআইপি গ্যালারির খোলা বারান্দার মতো জায়গায় তিনি এসে দাঁড়াতেই যে সবার দৃষ্টি চলে গেছে সেদিকে। এমনকি মেসিকে ছাপিয়েও!

পরনে কালো প্যান্ট, গায়ে গাঢ় নীল রঙের সোয়েটার, যার বুকের দিকে ফুটবলের ছবি। হাতা খানিকটা গোটানো বলে দুই হাতের ট্যাটু উঁকি দিচ্ছে। বাঁ হাতে কালো বেল্টের ঘড়িও। আর এমন একটি সানগ্লাস পরে আছেন তিনি, যা বাচ্চাদের আবদার মেটানোর জন্য হয়তো কিনে দেয় মা-বাবা। কমলা ফ্রেম, গোলাপি কাচ। সে রংও আবার বদলায় সূর্যের আলোয়। দুই হাত ওপরে তুলে দর্শকের অভিবাদন নেন তিনি। এরপর চিৎকার ‘ভামোস আর্হেন্টিনা’। ম্যারাডোনার সঙ্গে তাল মেলায় গোটা গ্যালারি।

এর পর থেকেই দর্শকদের এক জ্বালা। মাঠের ফুটবলে মেসিকে দেখবেন নাকি গ্যালারিতে ম্যারাডোনাকে! কোনোটির আকর্ষণই যে কম নয়! আমাদের বসার জায়গা থেকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ওপরে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। আর্জেন্টিনা গোল দেওয়ার পর পারলে ম্যারাডোনা লাফিয়ে নিচে নেমে যান; গোল খাবার পর বসে থাকেন ঝিম মেরে। পেনাল্টির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় নিজেই দুহাতে চারকোনা বাক্স এঁকে আবেদন জানান ভিএআর প্রযুক্তির। আবার মেসি পেনাল্টি মিস করলে শূন্যে লাথি ছুড়ে প্রকাশ করেন নিজের ক্রোধ। ধূমপানমুক্ত স্টেডিয়ামের ধারও কি ধারেন ম্যারাডোনা! ঠিকই তাঁর ঠোঁটে জ্বলতে দেখা যায় প্রিয় হাভানা সিগার!

এই করতে করতে কি মস্কোতে খেলোয়াড় হিসেবে নিজের সর্বশেষ সফরটি মনে পড়ছিল না ম্যারাডোনার? নাপোলির সঙ্গে তাঁর যে অমর প্রেম, সেটির বিচ্ছেদের বোতামে চূড়ান্ত চাপ পড়েছিল যে এই শহরেই! ২৮ বছর আগে!

নাপোলিকে সিরি ‘এ’ জিতিয়েছেন দুইবার। উয়েফা কাপ, ইতালিয়ান কাপ, ইতালিয়ান সুপার কাপও। গড়পড়তা এক ক্লাব ম্যারাডোনার জাদুর স্পর্শে হয়ে ওঠে পরাশক্তি। নেপলসের ঈশ্বরের মর্যাদা পেয়ে যান। ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা-ইতালি মুখোমুখি হয় সেই নাপোলির ঘরের মাঠ স্তাদিও সান পাওলোতে, ম্যারাডোনার আহ্বান ছিল তাঁর দেশকে সমর্থনের। তাই কি হয়! নিজ দেশ ইতালি ছেড়ে আর্জেন্টিনাকে কিভাবে সমর্থন করবে দর্শকরা! সে ম্যাচ জিতে ‘আলবিসেলেস্তে’রা ফাইনালে গেলে নায়ক থেকে রাতারাতি খলনায়ক হয়ে যান ম্যারাডোনা। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে তাই দুয়োধ্বনি পর্যন্ত শুনতে হয়েছে তাঁকে। শিরোপা হারানোর পর ম্যারাডোনার কান্নাতেও গলেনি ইতালিয়ানদের হৃদয়।

এই ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আত্মবিধ্বংসী খেলায় মেতে ওঠেন ফুটবল জাদুকর। যার বড় সাক্ষী এই মস্কো। ১৯৯০-৯১ মৌসুমের ইউরোপিয়ান কাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি হয় নাপোলি-স্পার্তাক মস্কো। নিজেদের মাঠের প্রথম লেগে গোলশূন্য ড্র ইতালিয়ান ক্লাবটির। ৭ নভেম্বর দ্বিতীয় লেগ। কিন্তু ম্যারাডোনা বলে বসেন, ‘আমি দলের সঙ্গে মস্কো যেতে চাই না।’ ক্লাবের পরিচালক লুসিয়ানো মগ্গিও জানিয়ে দেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে যাবে না, সে খেলবে না।’ তাতে কি ম্যারাডোনাকে আটকানো যায়! নেপলসের পোসিলিপো এলাকায় ওই আর্জেন্টাইনের অ্যাপার্টমেন্টে যান কয়েক সতীর্থ বোঝানোর জন্য; যেন সোমবার সকালে সবার সঙ্গে মস্কো যান তিনি। দেখাই পাননি ম্যারাডোনার। জানিয়ে দেওয়া হয়, তিনি ঘুমাচ্ছেন। সে ঘুমের সঙ্গে যে কোকেনের সম্পর্ক রয়েছে, সেটি জানা যাবে আরো অনেক পরে।

৩০ মিলিয়ন লিরায় প্রাইভেট জেট ভাড়া করে মঙ্গলবার রাতে মস্কো পৌঁছান ম্যারাডোনা। সঙ্গী বাল্যবান্ধবী ক্লাউদিয়া ভিলাফেন ও এজেন্ট মার্কোস ফ্রাঞ্চি। হোটেলে শীতল অভ্যর্থনা পান মগ্গি ও কোচ আলবের্তো বিগনের কাছ থেকে। ম্যারাডোনার তাতে কি! ওই রাতেই বেরিয়ে পড়েন মস্কো শহরটা দেখবেন বলে।

চলে যান রেড স্কয়ারে। সেটি বন্ধ। কিন্তু ম্যারাডোনা তো ম্যারাডোনাই। ঠিকই পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করে ফেলেন। ঘুরে দেখেন ভ্লাদিমির লেনিনের সমাধি। মস্কোভা নদীর পারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা। স্পার্তাকের বিপক্ষে ম্যাচ শুরু হতে ১২ ঘণ্টা তখন বাকি মোটে।

তত দিনে ম্যারাডোনার ওপর তিতিবিরক্ত নাপোলি ক্লাব। ব্যবস্থা তাই না নিলেই নয়! লেনিন স্টেডিয়াম নামে পরিচিত এখনকার লুঝনিকিতে ছিল ম্যাচটি। সেখানে ম্যারাডোনাকে ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া হয়নি; দেয় ১৬ নম্বর। প্রথম একাদশেও রাখেননি কোচ। ৬৩ মিনিটে জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলার বদলি হিসেবে নামেন। কিন্তু গোল করা বা করাতে পারেননি। গোলশূন্য দ্বিতীয় লেগ শেষে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে।

সেখানে দলের চতুর্থ শটে ম্যারাডোনা গোল করেছেন বটে। তবে তৃতীয় শটে মিস করেন মার্কো বারেনি; যাঁর গোলে মাস ছয়েক আগে সিরি ‘এ’ জিতেছিল নাপোলি। ওদিকে স্পার্তাক নিজেদের পাঁচ শটেই গোল করে। ইউরোপিয়ান কাপ থেকে ছিটকে যায় নাপোলি। ক্লাব পরিচালক মগ্গি হুঁশিয়ারি দেন, ‘ম্যারাডোনাকে এই ভুলের মূল্য দিতে হবে।’ আর ম্যারডোনার প্রতিক্রিয়া ম্যারাডোনার মতোই, ‘আমি তো আমার পেনাল্টি থেকে গোল করেছি।’

কিন্তু মস্কোর ওই রাতেই আসলে নাপোলি সিদ্ধান্ত দেয়, ম্যারাডোনার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কটা আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব না। মগ্গি ও নাপোলি প্রেসিডেন্ট কোরাদো ফেরলাইনো আদালতে পর্যন্ত নেন  ম্যারাডোনার প্রাইভেট কম্পানিকে আয়সংক্রান্ত ব্যাপারে। এর চার মাস পরই তো বারি ক্লাবের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের পর মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন ম্যারাডোনা। নাপোলিকে তখন তিনি পাশে পাননি। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মধুময় প্রেমের সম্পর্কগুলোর একটির বিচ্ছেদ হয়ে যায় তিক্ততায়।

তাতে কি! মানুষের ভালোবাসার রাজা তো এখনো ম্যারাডোনা। সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলের সঙ্গে তাঁর টক্কর হতে পারে; হালফিলের লিওনেল মেসি ফুটবলীয় দক্ষতা-ধারাবাহিকতায় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন কিন্তু আমজনতার ভালোবাসার রাজ্যের সম্রাট তিনিই। তাঁর অলৌকিক ফুটবলে; তাঁর মানবীয় সব ভুলেও।

আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড ম্যাচে ম্যারাডোনার প্রতি মানুষের ভালোবাসার বাঁধনহারা প্রকাশ দেখে তা নিশ্চিত হওয়া গেল আবার। আরো একবার!



মন্তব্য