kalerkantho


ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব রহস্য

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব রহস্য

হিলদেরালদো বেলিনি, মাউরো রামোস, কার্লোস আলবের্তো, কার্লোস দুঙ্গা ও কাফু। কোনো অন্ত্যমিল খুঁজে পাচ্ছেন? তাঁরা ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। আর কোনো মিল? এই পঞ্চকের চারজনই ডিফেন্ডার; বাকি যে দুঙ্গা তিনিও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। সাম্বার সুরে আক্রমণাত্মক ফুটবলের গান গায় যারা, সেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কোনো অধিনায়কই স্ট্রাইকার নন! কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার! অথবা উইঙ্গার! একটু অবাক না হয়ে উপায় কী!

২০১৮ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের অধিনায়ক যে আরেক ডিফেন্ডার মার্সেলোই ছিলেন, তাতে তাই আবার অবাক হওয়ার কিছু নেই।

অধিনায়কত্ব নিয়ে কোচ লিওনার্দো বাক্কি তিতের দর্শন ভিন্ন। নির্দিষ্ট কোনো অধিনায়ক নেই; একেক ম্যাচে একেকজন পালন করেন সে দায়িত্ব। ২০১৬-র সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর অধীনে ২২ ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। তাতে অধিনায়ক ১৬ জন। মিরান্দা, দানি আলভেস, রেনাতো আগুস্তো, ফিলিপে লুইস, ফের্নান্দিনিয়ো, রবিনহো, নেইমার, থিয়াগো সিলভা, ফিলিপে কৌতিনিয়ো, মার্সেলো, পাউলিনিয়ো, কাসেমিরো, মারকুইনোস, উইলিয়ান, আলিসন, এমনকি গাব্রিয়েল জেসুস পর্যন্ত। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অধিনায়ক ছিলেন এই স্ট্রাইকার; মাত্র ২১ বছর দুই মাস বয়সে। এই শতাব্দীতে ব্রাজিলের সবচেয়ে কম বয়সী অধিনায়ক তিনি।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে অধিনায়ক ছিলেন মার্সেলো। কোস্টারিকার বিপক্ষে তিনিই থাকবেন, সে নিশ্চয়তা নেই। ব্রাজিলে ফোলহা দি কুইনতো ম্যাগাজিনের সাংবাদিক ইউলেনিয়ো হামবের্তো কাল সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে বলছিলেন তাই। আর বরাবরের আক্রমণাত্মক ফুটবলের পূজারি ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অধিনায়ক কেন ডিফেন্ডার হন, সে নিয়েও দারুণ ব্যাখ্যা তাঁর, ‘আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের আমরা দায়িত্ব দিতে পছন্দ করি না। ওরা খেলবে নিজেদের মতো। অনেকটা শিল্পীর মতো। একজন শিল্পীকে কোনো দায়িত্ব দিলে তাঁর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ফরোয়ার্ডরাও ঠিক তাই। এ কারণে ডিফেন্ডারদের অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিই।’

আসলেই তো তাই। বিশ্বকাপের ২১ আসরের মধ্যে সবগুলোতে খেলা একমাত্র দল ব্রাজিল। এর মধ্যে আক্রমণভাগের সত্যিকার ফুটবল শিল্পী মোটে তিনজন—১৯৩০ সালের প্রেগিনিয়া, ১৯৭৮ সালের রিভেলিনো এবং ১৯৮২ সালের সক্রেতিস। ব্যস!

বাকি ১৮ বারের মধ্যে ডিফেন্ডাররা অধিনায়ক ১২ বার—আগুস্তো দা কস্তা (১৯৫০), বেলিনি (১৯৫৮), রামোস (১৯৬২), বেলিনি (১৯৬৬) কার্লোস আলবের্তো (১৯৭০), এদিনহো (১৯৮৬), রিকার্দো গোমেস (১৯৯০), কাফু (২০০২ ও ২০০৬), লুসিও (২০১০), থিয়াগো সিলভা (২০১৪) ও মার্সেলো (২০১৮)। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অধিনায়ক আরো চারবার—জোসে কার্লোস বাউয়ের (১৯৫৪), উইলসন পিয়াসসা (১৯৭৪), দুঙ্গা (১৯৯৪ ও ১৯৯৮)। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ বিশ্বকাপে অধিনায়ক মার্তিম ছিলেন মিডফিল্ডার; পরের বিশ্বকাপে কয়েক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেছেন অবশ্য স্ট্রাইকার লিওনিদাসও। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে পিয়াসসাকে টুর্নামেন্টের মাঝপথে সরিয়ে অধিনায়ক করা হয় সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মারিনিয়ো পেরেসকে। ২০ বছর পরের ঘটনা উল্টো। সেবার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রাই ছিলেন শুরুর অধিনায়ক; পরে সে দায়িত্ব দেওয়া হয় দুঙ্গাকে। আর ১৯৭৮ সালের অধিনায়ক রিভেলিনো সুইডেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই শুধু মাঠে নেমেছিলেন। পরে ইনজুরির সঙ্গে আর কুলিয়ে উঠতে পারেননি। টুর্নামেন্টের বাকি সময় অধিনায়ক ছিলেন গোলরক্ষক লিয়াও।

এবার ব্রাজিল কত দূর যেতে পারবে, কে জানে! পাঁচ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের পাশে কারো নাম উঠবে কি না, সেটির উত্তরও সময়ের কাছে। তবে অমনটা করতে পারলে কিংবদন্তির মর্যাদা পাবেন নিঃসন্দেহে। ওই পঞ্চকের মতো কিংবদন্তি গাথা লেখা হবে তাঁর নামেও।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের অধিনায়ক বেলিনির বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মূর্তি রয়েছে মারাকানায়। প্রথম পাঁচ বিশ্বকাপে উচ্ছ্বাসের অমন প্রকাশ কিন্তু ছিল না। বেলিনি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরই তা প্রথা হয়ে ওঠে। পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন, ফটোগ্রাফারদের ছবি তোলার সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই অমনটা করেছিলেন।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের তো আদুরে নাম থাকে। ১৯৬২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মাউরো রামোসের আদুরে নাম শুনলে ভিরমি খেতে হবে। মার্থা রোচা। ১৯৫৪ সালের মিস ব্রাজিল এবং সে বছরে মিস ইউনিভার্সে রানার্স-আপ এই সুন্দরীর নামে এক ফুটবলারের নাম কেন? কারণ সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে ট্যাকল ও হেড জিততেন রাজসিক সৌন্দর্য দিয়ে; গায়ের জোরে নয়।

১৯৭০ বিশ্বকাপের অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তো ছিলেন রাইট ব্যাক। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে পেলের ব্লাইন্ড পাস থেকে তাঁর ওই অবিশ্বাস্য গোল। সর্বকালের অন্যতম সেরা দলীয় গোল হিসেবে যা সর্বজনস্বীকৃত। ফুটবল যে শিল্প, সম্মিলিত এক শিল্প—তা ওই গোলের মতো বোঝাতে পারে না আর কিছুই। ডিফেন্ডার হিসেবে আলবের্তোর ট্যাকলিং ও গেম রিডিং ক্ষমতা ছিল দুর্দান্ত। পাশাপাশি বল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রিবলিং, প্লে-মেকিং। মাত্র ২১ বছর বয়সে ব্রাজিলের অধিনায়ক হয়েছেন; ২৫ বছর বয়সে সর্বকালের সেরা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে করেছেন চ্যাম্পিয়ন।

১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক দুঙ্গা অবশ্য ব্রাজিলে পূজনীয় নন মোটেও। নেতিবাচক ফুটবলের কারণে তাঁর সময়কাল বরং চিহ্নিত ‘দুঙ্গার যুগ’ হিসেবে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে তাঁর অ্যান্টিসিপেশন ও টাইমিংকে অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। আর ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কাফু তো সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুলব্যাকই। ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ১৪২ ম্যাচ খেলেছেন। বিশ্বকাপ খেলেছেন চারটি; এর মধ্যে টানা তিন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা একমাত্র ফুটবলার। ২০০২ বিশ্বকাপে কিন্তু শুরুতে অধিনায়ক তিনি ছিলেন না। মিডফিল্ডার এমারসন ইনজুরিতে পড়লে কাফুকে দেওয়া হয় দায়িত্ব।

দায়িত্ব! এই শব্দটিই হয়তো ব্রাজিলের অধিনায়কত্বের বেলায় সত্যি; তাঁদের দেশের সাংবাদিকের কথা অনুযায়ী। নইলে বিশ্বকাপে বরাবর কেন ভরসা করা হবে গোল সামলানোর কাজে থাকা ফুটবলারদের ওপর! এবারও ১৫ জুন ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মঞ্চে নিজেকে আগাম এঁকে নিতে পারেন মার্সেলো কিংবা থিয়াগো সিলভা অথবা মিরান্দা।

নেইমার কিছুতেই নন!



মন্তব্য