kalerkantho


ব্রাজিলিয়ানদের ডাকনাম রহস্য

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২২ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ব্রাজিলিয়ানদের ডাকনাম রহস্য

এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তোকে না হয় চিনবেন—পেলে। কিন্তু মানুয়েল ফ্রাঙ্কোস দোস সান্তোসকে? ভ্লাদিমির পাহেইরা? এদভালদো নাসিদিও নেতো? এদুয়ার্দো গড়লসালভেস দে আন্দ্রাদে? মার্কোস ইভানগেলিস্তা দে মোরাইস বা কাফুরিঙ্গা? তাঁরা সবাই কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাকাশের উজ্জ্বল সব নক্ষত্র। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য তাঁদের না চেনাটা প্রায় ‘অপরাধ’!

আত্মদহন কিছুটা কমিয়ে দিই তাহলে। গারিঞ্চা-দিদি-ভাভা-তোস্তাও-কাফুদের তো চিনতে পারছেন নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, ওই কিংবদন্তিদেরই আদুরে নাম ওগুলো। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপাগল জনতার সঙ্গে নামি-নামি খেলোয়াড়দের ভালোবাসার সেতু। অথচ হালফিলে অমন নাম খুঁজে পাওয়াটা কঠিন। নেইমারের কোনো আদুরে নাম ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকরা আতিপাতি করেও মনে করতে পারেননি। হাজু গ্লোবো গণমাধ্যমের সাংবাদিক গুস্তাভো জুপাক বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৩-এর মধ্যে একজনেরই অমন নাম বলতে পারেন, সেটিও আফসোসমাখা সুরে, “থিয়াগো সিলভাকে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমরা বলতাম ‘মনস্ত্রো’; মানে মনস্টার। ডিফেন্সে দানবীয় উপস্থিতির জন্য। কিন্তু ইউরোপে গিয়ে এ নামটি তো ও আর ব্যবহার করে না।”

অথচ এ আদুরে নামের জায়গায় অন্যান্য দেশ থেকে কতই না আলাদা ছিল ব্রাজিল! যার পরতে পরতে ভালোবাসা মাখা। নামকরণের ইতিহাসগুলো কেমন মজারও। পেলের ব্যাপারটিই দেখুন। তাঁর নাম তখন ‘দিকো’। বাবা দোনদিনিয়ো ফুটবলার। খেলেন ভাস্কো দে সাও লোরেনসো ক্লাবে। ছোট্ট দিকোকে নিয়ে অনুশীলনে যান প্রায়ই। ক্লাবের এক গোলরক্ষকের নাম বিলে। দিকোর ইচ্ছা, একদিন তাঁর মতো হওয়ার। যখন গোলবারের নিচে একটি-দুটি শট ঠেকান, নিজেই নিজেকে চিৎকার করে উৎসাহ দেন, ‘দারুণ করছ বিলে’, ‘দুর্দান্ত সেভ বিলে’। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বলেন, ‘আমি ভাস্কোর গোলরক্ষক বিলের মতো হতে চাই।’ কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন উচ্চারণরীতির কারণেই হয়তো-বা দিকোর মুখে ‘বিলে’ শোনায় ‘পিলে’র মতো। ব্যস, আর যায় কোথায়! বন্ধুরা তাঁকে খেপানো শুরু করে এই নামে। রেগেমেগে ছেলেটি তো একজনের মুখে ঘুষিই বসিয়ে দেয়। তাতে লাভ? বন্ধু খেপে যাচ্ছে বুঝতে পেরে দ্বিগুণ উৎসাহে ‘পিলে’ নামে ডাকা শুরু। আরেক দফা বদলে গিয়ে যা থিতু হয় ‘পেলে’তে। আর পরবর্তী সময়ে বিশ্বসেরা ফুটবলার হওয়ায় ‘ও রেই’ বা সম্রাট নামে পরিচিত হন তিনি।

গারিঞ্চার গল্পটি অন্য রকম। আর দশটা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের মতো তিনিও বেড়ে ওঠেন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে পৃথিবীর আলোয় আসা তাঁর। আকারেও বেশ ছোটখাটো। চার বছর বয়সে কোত্থেকে ছোট্ট এক পাখি নিয়ে এলেন বাড়িতে! বোন রোসা তা দেখে বলেন, ‘তুই তো এই ছোট্ট পাখি গারিঞ্চার মতোই রে।’ ডাকা শুরু করেন গারিঞ্চা নামে। বোন কি আর জানতেন পরবর্তীকালে এই নামেই ফুটবল-দুনিয়া কাঁপাবেন তাঁর ভাই! পরবর্তী সময়ে অবশ্য আরো কিছু আদুরে নাম হয় তাঁর। তিনি ছিলেন দর্শকদের ভালোবাসা; যিনি দলের ট্যাকটিকসের ধার ধারেন না, সমর্থকদের আনন্দ দেওয়াকে করেন ব্রত। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বোকা বানানো যাঁর দর্শন। তাই তো ব্রাজিলিয়ানরা ভালোবেসে গারিঞ্চার নাম দেয় ‘আলেগ্রিয়া দো পোভো’ যার বাংলা ‘জনতার আনন্দ’। পোলিওর কারণে তাঁর পা খানিকটা বাঁকা ছিল। সে কারণে গারিঞ্চার আরেক আদুরে নাম ‘আনজো দি পেরনাস তরতাস’ অর্থাৎ ‘বাঁকানো পায়ের দেবদূত’। বিনোদনের ফেরিওয়ালা এই দেবদূত তাঁর ফুটবল দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন—জিনিয়াসরা জন্মায়, তৈরি হয় না।

এমন আরো কত কিংবদন্তি আছেন, যাঁদের জন্মসনদের সঙ্গে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া নাম মিলবে না কিছুতেই। যেমন দিদি। যেমন ভাভা। যেমন তোস্তাও। গড়পড়তা উচ্চতা, কিন্তু বল পায়ে জাদুকরী কারিকুরির কারণে ’৭০ বিশ্বকাপের ওই ফরোয়ার্ড পান ওই আদুরে নাম। ব্রাজিলের ওই সময়ে কম মানের কয়েনের নামে। আবার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মার্কোস ইভানগেলিস্তা দে মার্কোস যখন উইঙ্গার পজিশনে খেলতেন, তখন তাঁর নাম হয়ে যায় কাফুরিঙ্গা, আতলেতিকো মিনেইরোর সাবেক খেলোয়াড়ের নামে। পরে আরেকটু ছোট করে বিখ্যাত কাফু হিসেবে। সাদা চুল ও গায়ের রঙের কারণে রিকার্দো রদ্রিগো দে ব্রিতোকে দেখাতো জার্মানদের মতো। তাই ’৮৬ ও ’৯০ বিশ্বকাপ খেলা এই মিডফিল্ডারের নাম হয় আলেমাও।

ব্রাজিলিয়ানদের নামের আরেক ব্যাপার রয়েছে। নামের শেষে ‘ইনহো’ ও ‘আও’ যোগ করা। সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোনালদোর যখন আবির্ভাব, তখন ব্রাজিলে একই নামের আরেকজন ছিলেন। তাঁর নাম তাই হয়ে যায় ‘রোনালদিনহো’, মানে ‘ছোট্ট রোনালদো’ নামে। পরে আরেক রোনালদো এলে বিশ্বকাপে ১৫ গোল করা স্ট্রাইকার হয়ে যায় শুধুই রোনালদো; আর পরেরজন রোনালদিনহো। ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার জিতেছেন দুজনই। আবার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুই ফেলিপে স্কলারিকে যেমন আদর করে ডাকা হয় ‘ফেলিপাও’ অর্থাৎ ‘বিগ ফিল’।

ব্রাজিলিয়ান সমাজে আদুরে নামে ডাকাটা ভালোবাসার প্রকাশ। দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রাস্তায় ধুলোমাখা যে ছেলেটি বলে লাথি মারছে, তারও আদুরে নাম রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংরেজরা যখন ব্রাজিলে ফুটবল চালু করেন, শুরুতে তাঁরাও ইংরেজদের মতো সারনেম ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু দ্রুতই সে জায়গা নিয়ে নেয় নিকনেম। ১৯১৪ সালে ব্রাজিলের প্রথম অফিশিয়াল ম্যাচের এক ফরোয়ার্ডের আদুরে নাম যেমন ছিল ফরমিগা, পর্তুগিজ যে শব্দের অর্থ ‘পিঁপড়া’।

এখনকার দলে সেটি নেই কেন? হাজু গ্লোবোর গুস্তাভো জুপাক দায় দেন বদলে যাওয়া সময়ে ফুটবলারদের বদলে যাওয়া মানসিকতায়, ‘আমাদের প্রায় খেলোয়াড়ই তো এখন ইউরোপে খেলে। যদি ফিলিপে কৌতিনিয়ো সত্তরের দশকে খেলতেন, তাহলে তাঁর নাম হতো শুধুই কৌতিনহো। রবের্তো ফিরমিনোর তাঁর নাম হতো শুধুই ফিরমিনো। বাকি নাম কেউ জানতও না। এখন যেহেতু ছেলেরা খুব কম বয়সেই ইউরোপে চলে যায়, সে কারণে ইউরোপিয়ান নামের ধরনে পরিচিত হতে চায়। এখন তাই নিকনেম কম, বিগনেম বেশি।’ এতে কি ব্রাজিলের আমজনতার সঙ্গে ফুটবলারদের দূরত্ব বাড়ছে না? গ্লোবো দেলের সাংবাদিক কিরেস হুনোস মেনে নেন তা, ‘আদুরে নাম দেওয়ার আগেই যে ওরা ইউরোপে চলে যাচ্ছে! এতে ওই ফুটবলারদের আগের মতো অত কাছের মানুষ বলে মনে করছে না। জাতীয় দলের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অবশ্যই এ ঐতিহ্য আমরা মিস করি। কিন্তু বদলে যাওয়া সময়ে কী করবেন বলুন! এবারের বিশ্বকাপ জিতলে হয়তো নতুন কোনো নাম পেয়ে যাবে নেইমার-জেসুস-কৌতিনিয়ো।’

বদলে যাওয়া সময়ে ওই সাফল্যের দিকেই তাকিয়ে থাকে তাই ব্রাজিল!

 



মন্তব্য