kalerkantho


যে রাতে জেগে থাকে পিটার্সবার্গ

নোমান মোহাম্মদ, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



যে রাতে জেগে থাকে পিটার্সবার্গ

মানুষ আর মানুষ। চারদিকে পিঁপড়ার সারির মতো দল বেঁধে ছুটছে সবাই। পরশু রাতে তো সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ ছিল না। থাকলেও এত মানুষের ধারণক্ষমতা নেই পৃথিবীর কোনো স্টেডিয়ামে। সবাই তাহলে যাচ্ছে কোথায়?

যাচ্ছে ‘স্কারলেট সেইলস’ উৎসবে। শহরের এ বছরের স্কুল পাস করা ছাত্রছাত্রীদের সমাবর্তন বলা যেতে পারে এটিকে। তবে তা কি আর শুধু সীমিত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে! ফিবছর জুুনের এই রাতে পুরো শহরই ভেঙে পড়ে সিটি সেন্টারে। নেভা নদীর তীরে। রক্তলাল ওই পালতোলা জাহাজের ভেসে যাওয়া দেখার জন্য। ওই চোখ ধাঁধানো আতশবাজি উপভোগের জন্য।

পরশু রাতে সেন্ট পিটার্সবার্গে ছিল এ বছরের ‘স্কারলেট সেইলস’ উৎসব। বছরের এ সময়টায় রাত তো আর সেভাবে হয় না এ শহরে; দিনের আলো থিতিয়ে সন্ধ্যার নীলচে মায়াবী আলো থাকে ঘণ্টা দুই-তিনেকের জন্য। এ সময়টা পরিচিত ‘হোয়াইট নাইটস’ হিসেবে। সেই সাদা রাতে টকটকে লাল পালের জাহাজের নেভা নদীতে ভেসে যাওয়ার উৎসব যেন আর শুধু সেন্ট পিটার্সবার্গের থাকে না। হয়ে যায় পুরো পৃথিবীর। বিশ্বকাপ উপলক্ষে নানা দেশ থেকে আসা অতিথিরা যে পরশু রাতে মিশে গিয়েছিলেন ওই জনারণ্যে!

সংখ্যা? চোখের দেখায় তো চারদিকে পিলপিলে মানব-দল দেখেছি। ইন্টারনেটের পরিসংখ্যান জানায়, এই উৎসবে প্রতিবছর ১০-১৫ লাখ লোক জড়ো হয়। কোনো কোনো বছর নাকি তা ২৫-৩০ লাখ পর্যন্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ আমাদের মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামপূর্ণ দর্শকসংখ্যার ৪০, ৮০ কিংবা ১২০ গুণ দর্শনার্থী একসঙ্গে উপভোগ করেন এই ‘স্কারলেট সেইলস’। ভাবা যায়!

রুশ ভাষার জনপ্রিয় লেখক আলেক্সান্দার গ্রিন। তাঁর রূপকথার গল্প ‘স্কারলেট সেইলস’-এর অনুকরণে সেন্ট পিটার্সবার্গে এ উৎসবের শুরু ১৯৬৮ সালের জুনে। শহরের স্কুলগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রবেশ করে নতুন জীবনে। সেই তারুণ্য উদ্যাপনের জন্য স্বপ্ন ও আশার জয়গানের মন্ত্র নিয়ে ৫০ বছর আগে শুরু এ উৎসবের। প্রথমবারই দারুণ হিট। ২৫ হাজার স্কুল গ্র্যাজুয়েটরা অংশ নেয় তাতে। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে ‘হোয়াইট নাইটস’ উৎসবের চূড়ান্ত মঞ্চ।

কিন্তু বেশ কয়েক বছর চলার পর ১৯৭৯ সালে এ উৎসব স্থগিত হয়ে যায়। আবার চালু ২০০৫ থেকে। প্রতিবছরই এখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে; বাড়ছে জনপ্রিয়তা। রাশিয়ার অন্যতম সেরা উৎসবই এখন এই ‘স্কারলেট সেইলস’। সেরা ইউরোপিয়ান ইভেন্টেও অনায়াসে চলে আসে যার নাম।

পরশু রাত ৯টার দিকে উৎসবকেন্দ্রের দিকে যেতে যেতেই দেখি ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। সিটি সেন্টারের দিভোরর্তসোভায়া স্কয়ারে হচ্ছে উদ্দাম কনসার্ট। গানগুলোতে সবার সমস্বরে গলা মেলাতে শুনে বুঝি যে, সেগুলো হিট গান। কিন্তু ওই রুশ ভাষার কী ছাই বুঝি! উৎসবের প্রথম প্রস্ত ওই কনসার্টে। আর মূল উৎসব শুরু হতে হতে রাত ১২টা ৪০ মিনিট। নেভা নদীর পারে তখন লাখ লাখ লোক। সেতুতে পা রাখার জায়গা নেই। রাস্তার পাশে রাখা এক কাভার্ড ভ্যানের ছাদে উঠতে গিয়ে তা হুড়মুড়িয়ে ভেঙেই তো পড়ে গেল জনাপঞ্চাশেক মানুষ।

ঠিক ১২টা ৪০ মিনিটে লাউডস্পিকারে বেজে ওঠে অর্কেস্ট্রা। রুশ ভাষায় গানের কথায় ‘লেনিনগ্রাদ’ শব্দটাই বুঝতে পারলাম; সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের পুরনো নাম তা। আর সুরের গাম্ভীর্য ও মাধুর্যে বোঝা গেল, শহরের জয়গান করা হচ্ছে সেখানে। একই সঙ্গে আকাশ আলো করে শুরু আতশবাজি। গানের সঙ্গে, সুরের সঙ্গে মিল রেখে চোখ ধাঁধানো আয়োজন। এত রঙিন, এত বর্ণিল যে হতে পারে আতশবাজি, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

গান চলছে, আলোয় রঙিন হচ্ছে আকাশ—এরই মধ্যে লাল রঙের পালতোলা জাহাজ চলতে শুরু করে নেভা নদীতে। তা দেখার জন্যই সবার আগ্রহ। কী রাজসিক ভঙ্গিতেই না তা উড়তে থাকে সেন্ট পিটার্সবার্গের হাওয়ায়! কী অপূর্ব এক ছাপ রেখে যায় লাখো মানুষের মনোজগতে! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জার্সি পরা কত তরুণ-তরুণীও সে উৎসবে শামিল। রাশিয়ার পতাকা হাতেও অনেকে। নেভা নদীর পাশের ওই রাস্তায় ইয়া বড় এক প্লাস্টিকের ফুটবলও দেখলাম উড়ে বেড়াচ্ছে হাত থেকে হাতে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সঙ্গে স্কারলেট সেইলস উৎসবের বন্ধুতাও যেন হয়ে যায় তাতে!

 



মন্তব্য