kalerkantho


এমবাপ্পেতে পেলের ছায়া!

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



এমবাপ্পেতে পেলের ছায়া!

সুইডেনের রাজা গুস্তাভ হয়তো ধারণা করতে পারেননি, ১৭ বছর বয়সী যে কালো ছেলেটার সঙ্গে তিনি হাত মিলিয়েছেন, ৯০ মিনিট পর তাঁর রাজত্ব সুইডেনের মানচিত্র ছাড়িয়ে গোটা পৃথিবীই দখল করে নেবে! দূর থেকে রাজা মহারাজার দর্শন পাওয়া গেলেই কত লোকে সেই গল্প জীবনভর করে বেড়ায়, তবে সুইডেনের রাজা হয়তো উল্টোটা করেছেন। তিনি হয়তো নানা রাজকীয় ভোজসভায় পাশের অতিথিকে ফিসফিসিয়ে বলেছেন, ‘জানেন, আমি এই হাতে পেলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম!’

বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের নামে মা-বাবা রেখেছিলেন নাম। হয়তো আশা ছিল, ছেলে বড় হয়ে আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দেবে। ‘পেলে’ ডাকনাম পেয়ে যাওয়া এদসন আরান্তেস দে নাসিমেন্তা অবশ্য গোটা বিশ্বকেই তাক লাগিয়েছেন! কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক সূত্র বা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে নয়, ফুটবলটা কত সহজে গোলে পাঠানো যায় সেই প্রতিভা দেখিয়ে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ আসলে পেলের আগমনীমঞ্চ। ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক আর ফাইনালে জোড়া গোল করে চমকে দেয় গোটা বিশ্বকে, বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে ফুটবল রাজ্যের রাজা হতেই তার আগমন। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ যেন পেলের রাজ্য-অভিষেক অনুষ্ঠান। দীর্ঘ ৬০ বছর পর, রাশিয়া বিশ্বকাপে নিজেকে মেলে ধরলেন তেমনি এক সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ তরুণ। ১৯ বছর বয়সী কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে কেন ইউরোপের ক্লাবগুলোর এত আগ্রহ, কেনই বা তাঁকে দলে নিতে চাইলে রাজকোষ খালি করা অর্থের প্রয়োজন, সেসব এত দিন ফরাসি লিগ ওয়ানের দর্শকরা জানতেন। এখন গোটা বিশ্ব জানল, এক যে আছে কিলিয়ান এমবাপ্পে। যে ছুটতে পারে উসাইন বোল্টের গতিতে, বলটাকে এমনভাবে পায়ে নাচায় যেন পোষ মানা বেড়ালছানা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জোড়া গোলে তিনি বিদায় নিশ্চিত করেছিলেন লিওনেল মেসির। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের বিদায়মঞ্চেই নিজের আগমনবার্তা জোরালোভাবে ঘোষণা করা এমবাপ্পের তুলনা চলছে পেলের সঙ্গেই। ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন পেলে, ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিততে হলে আর তো মাত্র একটি ম্যাচই জিততে হবে এমবাপ্পেকে!

৬ ম্যাচে ৪৪৪ মিনিট মাঠে কাটানো এমবাপ্পে একটা গোল করেছেন বাঁ পায়ে, দুটি করেছেন ডান পায়ে। গতিতে এমবাপ্পেকে ধরতে না পেরে ফাউল করেছিলেন মার্কোস রোহো, তাতে পেনাল্টি পেয়ে গোল করেছেন আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান। দুরন্ত গতির এমবাপ্পে তাই প্রতিআক্রমণে সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বিপক্ষের মাথাব্যথার প্রধান কারণ। তাইতো সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল এর সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে এমবাপ্পেকে। অবশ্য ফরাসি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে আলাপে এমবাপ্পে জানিয়েছেন, শিরোপা জেতার বাইরে আর কিছুই তাঁর মাথায় নেই, ‘এই অনুভূতিটা কল্পনারও বাইরের, মনে হচ্ছে স্বপ্নে বাস করছি, স্বপ্নের একটা ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। আমি অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখি, কিন্তু আমিও এতটা ভাবতে পারিনি। তবে যখন কেউ নিজের সঙ্গে প্রতারণা করবে না আর দলের জন্য কাজ করবে, তখন সে পুরস্কার পাবেই। আমি যতক্ষণ দলের কাজে লাগছি, সেটাই আমার জন্য সব কিছু। আমি গোল্ডেন বল বা ব্যালন ডি’অর চাই না, আমি বিশ্বকাপটা চাই।’ হতে পারে, এ সময়ের ব্যালন ডি’অর জয়ীদের সঙ্গে বিশ্বকাপের দূরত্ব দেখেই হয়তো ইচ্ছে করেই ব্যক্তিগত পুরস্কার এড়াতে চাইছেন এমবাপ্পে!

স্কাই স্পোর্টস তাদের বিশ্লেষণে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে এমবাপ্পের এমন জাদুকরী ৯টি মুহূর্তের কথা তুলে এনেছে, যেখান থেকে গোলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বা গোল হতে পারত। তাঁর বাড়ানো বলে জিরদ মিস করেছেন, পাভার্দের শট গোলরক্ষক আটকে দিয়েছেন। ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হলে নিজের নামের পাশে গোল বা অ্যাসিস্ট যোগ করতে পারতেন এমবাপ্পে। তবু অতৃপ্তি নেই কারণ দল যে বিশ্বকাপের ফাইনালে! কোচ দেশমও পঞ্চমুখ এমবাপ্পের প্রশংসায়, ‘সে খুবই বুদ্ধিমান। তবে সে এখনো শিখছে, তার যতই প্রতিভা থাক না কেন শেখা থামানো চলবে না। সে আমাদের জন্য যা করেছে তা অসাধারণ, তবে তাকে আরো উন্নতি করতে হবে।’

পেলের বাবা দোনদিনহো ছিলেন ফুটবলার। এমবাপ্পের বাবা উইলফ্রেড ফুটবল কোচ, মা ফায়জা ছিলেন পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। রক্তেই তাঁর খেলার নেশা। পেলে এবং এমবাপ্পে, দুজনেরই প্রথম কোচ বা শিক্ষক তাঁদের বাবা। দুজনেরই শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যে আর দুজনেই অভিষেক বিশ্বকাপেই দেখিয়েছেন প্রতিভার ঝলক। পেলের রাজ্য-অভিষেক পূর্ণতা পেয়েছিল ব্রাজিলের শিরোপায়, এমবাপ্পের দল ফ্রান্সও তো ফাইনালে। ত্রিভুজের দুই বাহু তো মিলে গেছে, কোণটা কি মিলবে না? গোলডটকম



মন্তব্য