kalerkantho


স্বপ্নের ফাইনালে ওঠার পর

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



স্বপ্নের ফাইনালে ওঠার পর

আড্রিয়াটিক সাগরের পারে, মাত্র ২১ হাজার বর্গমাইলের ছোট দেশ ক্রোয়েশিয়া। জনসংখ্যা ৪১ লাখের কিছু বেশি। চার বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যুগোস্লাভিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি, যুদ্ধের ক্ষত এখনো অনেকেরই মনে দগদগে। সেই দেশটাই কিনা পৌঁছে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে! প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে যাওয়ার পরের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন কোচ, ফুটবলার, সাবেক ফুটবলার, অন্য খেলার তারকারা এবং প্রেসিডেন্টও।

 

ইভান পেরিসিচ

২০ বছর আগে, ১৯৯৮ সালে আমার গ্রাম ওমিসে বসে জার্সি গায়ে দিয়ে আমি ক্রোয়েশিয়ার খেলা দেখছিলাম। একদিন বিশ্বকাপে আমিও একটা গুরুত্বপূর্ণ গোল দেব, তখন এমনটা শুধু স্বপ্নেই ভাবতে পেরেছিলাম! আসলে আমরা যে কি বিরাট একটা কৃতিত্ব দেখিয়েছি, সেটা বুঝতে বোধ হয় আমাদের খানিকটা সময় লাগবে। ছোট্ট দেশ ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছে! বিশ্বকাপের আগে কেউ ভাবেইনি যে আমরা এত দূর যেতে পারব, তবে আমাদের মনে বিশ্বাসটা ছিল। ফ্রান্স ১৯৯৮-তে আমাদের হারিয়েছিল, তাই তাদের বিপক্ষে খেলার সময় বাড়তি অনুপ্রেরণা কাজ করবে। আগের দুটি নক আউট ম্যাচের মতোই আমরা এক গোলে পিছিয়ে ছিলাম, কিন্তু আশা হারাইনি। ক্রোয়েশিয়ার মতো ছোট দেশের জন্য বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার গুরুত্বের কথা আমরা সবাই জানি।

জ্লাতকো দালিচ

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে, ক্রোয়েশিয়ার প্রথম তিনটি ম্যাচে আমি দর্শক হিসেবে মাঠে ছিলাম। থুরাম দুটি গোল করল আর আমরা এগিয়ে থাকার পরও ২-১ গোলে হেরে গেলাম, ক্রোয়েশিয়ার সবাই সেই ম্যাচটির কথা মনে রেখেছে। পরের ২০টি বছর ধরে এই একটা বিষয়ই ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। আমাদের খেলোয়াড়রা আজ যা করে দেখিয়েছে তার তুলনা হয় না। ওদের প্রাণশক্তি, মনের জোর, সবই ছিল অপার্থিব। আমি বদলি খেলোয়াড় নামাতে পারছিলাম না, কারণ কেউ মাঠ ছাড়তে রাজি ছিল না। সবাই বলছিল, ‘আমি ঠিক আছি, আমি দৌড়াতে পারব।’ কেউ হাল ছাড়তে চায়নি, কেউ বলেনি আমি অতিরিক্ত সময়ের জন্য তৈরি নই। কেউ ছোটখাটো চোট নিয়ে খেলেছে, কেউ এক পা নিয়ে খেলেছে। দলের এই চরিত্রটাই আমাকে গর্বিত করে তোলে।

মারিও মান্দজুকিচ

শুধু বড় দলগুলোই ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে থেকে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জেতার সাহস দেখায়। গোটা আসরে আমরা আমাদের হৃদয় উজাড় করে দিয়ে খেলেছি। যা ঘটে গেছে, সেটা কোনো রূপকথা নয়। আমরা এমন একটা কৃতিত্ব দেখিয়েছি, যা শুধু গ্রেট ফুটবলাররাই পেরেছেন। আমি নিজের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট, তবে যতক্ষণ আমি দলের সঙ্গে আছি দলের জয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে আমরা ছিলাম সিংহের মতো, ফাইনালেও সিংহের মতোই খেলব।

লুকা মডরিচ

ওরা ক্রোয়েশিয়াকে ছোট করে দেখেই ভুল করেছে। ইংল্যান্ডের সাংবাদিক, টেলিভিশন বিশেষজ্ঞ, মানুষজন এসবই বলাবলি করছিল। আমরা তাদের সব কথা শুনেছি, সব লেখা পড়েছি আর সেখান থেকেই চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা করেছি, ঠিক আছে, এবার দেখা যাবে, কারা ক্লান্ত। তাদের উচিত প্রতিপক্ষের সঙ্গে আরো বিনয়ী আচরণ করা আর সম্মান দেখান। আমরা আবার দেখিয়েছি যে আমরা ক্লান্ত নই। শারীরিক ও মানসিকভাবে খেলাটা আমরাই নিয়ন্ত্রণ করেছি।

মাতেও কোভাচিচ

সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে! সবাই মিলে ফাইনালে। আমরা গর্বিত। ক্রোয়েশিয়া সবার ওপরে।

ইভান রাকিটিচ

গত রাতে (খেলার আগের রাতে) আমার জ্বর ছিল, প্রায় ১০৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা। শক্তি ফিরে পেতে আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম এবং ঝুঁকিটা কাজে লেগেছে। দরকার হলে আমার একটা পা ছাড়াই আমি ফাইনালে খেলব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওরা (ইংল্যান্ড) যেসব ছবি ছড়াচ্ছিল আর যা বলছিল, তাতে মনে হচ্ছিল ওরা ফাইনালে পৌঁছে গেছে। ওরা ওদের কাজ চালিয়ে যাক, রবিবারের ফাইনালে আমরাই খেলব।

দেয়ান লোভরেন

ওরা যেসব কথা বলেছে, এরপর এই জয়টা আরো অসাধারণ মনে হচ্ছে। এরপর আমরা আমাদের আসল চেহারা দেখিয়েছি। মাঝে মাঝে সমালোচনাটা বড় অন্যায্য হয়ে যায়। আমরা ১২০ মিনিট বাড়তি ফুটবল খেলেছি, এর পরও ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের চাইতে আমাদের পা চলেছে বেশি। ব্যবধানটা ছিল মানসিকতায়। আমাদের দেশটা যুদ্ধের মতো অনেক কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছে। তবু আমাদের খেলায় প্রতিভার কোনো অভাব নেই।

গোরান ইভানিসোভিচ

আমরা ইংল্যান্ডকে এই জন্য হারিয়েছি কারণ তারা ভেবেছে যে তারা আগেই ফাইনালে পৌঁছে গেছে। ওটা বাড়ি আসছে, ওরা এরই মধ্যে জিতে গেছে, ওরা ট্রফি নিয়ে বাড়ি আসছে। ওরাই সেরা, ওরাই সবচেয়ে ভালো। তবে একটা জিনিস নিশ্চিত হয়ে গেছে, ওরা অন্তত ট্রফি নিয়ে বাড়ি আসছে না। আমি হয়তো কোনো পানশালায় ইংরেজদের সঙ্গে খেলাটা দেখব আর হাসতে হাসতে বের হব।

সাবেক টেনিস তারকা

জোয়ি ডিডিলুকা

ক্রোয়েশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে অবিশ্বাস্য এক অর্জন। ফুটবলের কথা বাদ দিন, এই মানুষগুলোর দিকে একবার তাকান। এরা একেকজন লড়াকু যোদ্ধা! তিনটি ম্যাচ গেছে অতিরিক্ত সময়ে, সেখান থেকে তারা জয়ী হয়ে এসেছে। আমার জীবনে এমন কিছু আমি দেখিনি। খেলাটার ব্যাপারে বলব, দুই দলই সাবধানী খেলেছে। তবে আরো একবারের মতো আমাদের লড়াকু ফুটবলাররাই জয় ছিনিয়ে এনেছে।

সাবেক গোলরক্ষক

কোলিন্দা কিটারোভিচ

আমরা নৈশভোজ খেতে খেতে খেলা দেখছিলাম। অসাধারণ সময় কেটেছে কারণ আমাদের বেশির ভাগ মিত্র দেশের বন্ধুরা আমাদের সমর্থক বনে গিয়েছিল। এই মহাসম্মেলনটা সফল হলো, রবিবারে কিন্তু আমরাই জিতব।

ক্রোয়েশিয়া প্রেসিডেন্ট



মন্তব্য