kalerkantho


ষোড়শ সংশোধনী রায়ের চলমান বিতর্ক

এ এম এম শওকত আলী

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ষোড়শ সংশোধনী রায়ের চলমান বিতর্ক

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আপিল বিভাগ বহাল ঘোষণার পর চূড়ান্ত রায় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্ক এখনো চলছে। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় যে অলঙ্ঘনীয় সে বিষয় সংবিধানেই বলা আছে। দীর্ঘ এ রায়ে অতীতের সংবিধান সংশোধন, সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন মহলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত। এ বিতর্কে একদিকে ক্ষোভ, অন্যদিকে সন্তুষ্টি প্রকাশের বিষয়টি দৃশ্যমান। অনেকে আবার বিষয়টি সংবেদনশীল হিসেবে মনে করে কোনো মন্তব্য করেননি। এ মামলার মূল বিষয় উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা। জানা যায়, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে এ ক্ষমতা চতুর্থ সংশোধনী বলে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাবান করা হয়। ওই সময়ে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রদ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। অনেকের মতে, এ ব্যবস্থাও ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।

কিন্তু এ নিয়ে তখন কোনো মামলা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা বহাল থাকে। ১৯৮২ সালে আবার সামরিক শাসন শুরু হয়। তবে এই দুই আমলেই বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রথা বহাল থাকে। সামরিক শাসনের দুই আমলেই রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামোর আওতায় সংসদীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের সর্বদলীয় গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সংসদীয় ও বহুদলীয় রাজনৈতিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

রায় নিয়ে দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাসীন দলের এক  সাবেক আইনমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এ রায়ে কিছু রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে, যা মূল বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এর বিপক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক মন্তব্য করেছেন যে অন্যান্য বিচারকও রায়ের মূল বিষয় সম্পর্কে একমত ছিলেন। নির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে বলা হয়েছে যে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সামরিক আইনে প্রণীত বিষয়ে ২০১১ সালে বৈধতা দিয়েছে। আলোচ্য আইনমন্ত্রী পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর জানামতে, একজন বিচারক বাদে অন্য সবাই পৃথক রায় দিয়েছেন। প্রতিবেদকের পাল্টা যুক্তি ছিল, এ সত্ত্বেও ২০১১ সালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে সংবিধানের অপরিবর্তনীয় মৌলিক কাঠামো বলে অন্য বিচারকরাও মত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো একটি বেঞ্চ একাধিক বিচারক নিয়ে গঠিত হলেও মূল বিষয়বস্তু নিয়ে পৃথক রায় লেখার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে একমত হলেই আলাদা রায়ের বিষয়টিও অপ্রাসঙ্গিক হয়। তবে সাক্ষাৎকারে সাবেক আইনমন্ত্রী অন্য বিষয়ও বলেছেন, যা ইতিবাচক। তাঁর মতে, বিচার বিভাগের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান কাম্য নয়।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এ ধরনের ইতিবাচক মন্তব্যকে সমর্থন করে না। সাংঘর্ষিক অবস্থানের পক্ষে সর্বপ্রথমে মত দিয়েছেন একজন সিনিয়র মন্ত্রী। প্রকাশিত খবরে দেখা যায় যে সংসদ বারবার ষোড়শ সংশোধনী বহাল রাখবে। অবশ্য দলের পক্ষে বলা হয়েছে যে এটা তাঁর ব্যক্তিগত মত। দলীয় মত কি, তা গত মঙ্গলবার পর্যন্ত জানা যায়নি। যা জানা গেছে তা হলো, গত সোমবার নিয়মিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে অন্তত এক ডজন সিনিয়র মন্ত্রী প্রদত্ত রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মন্ত্রীদের সমালোচনায় কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যা ৮ আগস্ট প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়। এক. ষোড়শ সংশোধনী ১৯৭২ সালে প্রণীত মূল সংশোধনীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিধায় একে বিলুপ্ত ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের নেই। দুই. উচ্চ আদালত রায়ে কিছু অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করেছেন, যা আপত্তিকর। তিন. কিছু রাজনৈতিক মন্তব্যও করা হয়েছে। সরকারপ্রধান শেষ পর্যন্ত রায়ের অপ্রাসঙ্গিক ও অসংগতিপূর্ণ বিষয়াবলি জনসমক্ষে তুলে ধরার কথা বলেন। এ ছাড়া জানা যায় যে আইনমন্ত্রী এ বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করবেন। অর্থাৎ বিতর্ক এখানেই শেষ হবে না। কিন্তু সমাধান কী—সেটাই হচ্ছে মুখ্য প্রশ্ন। মন্ত্রিসভার অনির্দিষ্ট আলোচনায় রিভিউ আবেদনও করার পরামর্শ এসেছে। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা না গেলেও ধারণা করা যায়, সরকারের নীতিনির্ধারকরা যখন রায়টি নিয়ে তীব্র আপত্তি প্রকাশ করেছেন, তখন রিভিউ আবেদনও করা হবে। উল্লেখ্য, আলোচ্য রায়ের শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও সাংবাদিকদের বলা হয়েছিল, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে ফিরে যেতে এ রায় বড় বাধা। আর মন্ত্রীরা বলছেন, ষোড়শ সংশোধনী রদ করার ক্ষমতা উচ্চ আদালতের নেই। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে ফিরে যাওয়ার দাবি কিছু বিশিষ্টজনও অতীতে করেছিলেন। কিন্তু সরকার তা গ্রহণ করেনি। এমনকি সামরিক শাসনামলের সময়ের কিছু সংশোধনী এখনো সংবিধানে অক্ষুণ্ন রয়েছে। এ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের কোনো মন্তব্য নেই।

মন্ত্রিসভার আলোচনায় রায়ের দুর্বলতা ও অসংগতির বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ষোড়শ সংশোধনী অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে যেসব যুক্তি দিয়েছেন, তা কোনোটাই আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এক. রাষ্ট্রের পক্ষে বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের বিধায় উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য একই ব্যবস্থা হওয়া উচিত। এর বিপরীতে আদালতের যুক্তি ছিল, এসব পদধারীকে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত করেন। এ কারণেই তাঁরা সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। দুই. রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতি, যিনি সংসদ অপসারণ করতে ক্ষমতাবান। এ যুক্তিতেই উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য অনুরূপ সাংবিধানিক নিয়ম হওয়া উচিত। এ সম্পর্কে একজন বিচারকের পাল্টা যুক্তি ছিল, এ ধরনের যুক্তি প্রতারণামূলক (Fallacious)। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম ও দ্বিতীয় যুক্তি একই ধরনের। তিন. যে পঞ্চদশ সংশোধনী বলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, ওই সময়ের আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটাক্ষপূর্ণ কিছু মন্তব্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা করেন। এ বিষয়ে আদালতের মন্তব্য ছিল এ ধরনের যুক্তি উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য দুঃখজনক। অতিশয় বেদনাদায়ক ও অপমানজনক (Disparaging)। এ ছাড়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের আইনগত ভিত্তিও নির্দিষ্টভাবে আদালত উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে আদালত সংবিধানের ২২, ৯৪(৪), ১১৬এ ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বহাল রাখলে আইনের শাসন বিলুপ্ত হবে। আইনের শাসনই সংবিধানের মূল কাঠামোর অংশ। এসব সাংবিধানিক অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে আদালত বলেন, সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষেত্রে সংবিধানে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেনি।

গত শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন মহলের ও বিশিষ্ট ব্যক্তির আলোচ্য রায় ও পরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে বলা কয়েকটি বিষয় দৃশ্যমান ছিল। এক. রায় নিয়ে রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করা সঠিক নয়। দুই. আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সমর্থনযোগ্য নয়। তিন. কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদের প্রতিক্রিয়া কাম্য নয়। চার. রায়ের চূড়ান্ত আদেশের চেয়ে প্রধান বিচারপতির কিছু পর্যবেক্ষণই ক্ষমতাসীন দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পাঁচ. অপ্রাসঙ্গিক ও আপত্তিজনক মন্তব্য এক্সপাঞ্জ করার সুযোগ এখনো রয়েছে। ছয়. সরকারের মুখপাত্র হিসেবে আইনমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে নয়; বরং আইনি পথেই মোকাবেলার যে কথা বলেছেন, সেটাই কাম্য।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য